পুরোনো মামলা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তিতে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ঐ নির্দেশনা অনুযায়ী ১০ বছরের অধিক পুরোনো দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলাসমূহ, আপিল ও রিভিশনসমূহ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করা হবে। সুপ্রিম কোর্ট থেকে অধস্তন আদালতের সকল পর্যায়ের বিচারকদের জন্য সম্প্রতি একগুচ্ছ নির্দেশনা দেওয়া হয়।
বিচারাঙ্গনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বছরের পর বছর দেশের আদালতসমূহে মামলার জট বেড়েই চলেছে। নানা উদ্যোগ নেওয়ার পরেও মামলা নিষ্পত্তির হার বাড়লেও কোনোভাবেই জট কমানো সম্ভব হচ্ছে না। সে জন্য দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করে জট কমানোই এই নির্দেশনার উদ্দেশ্য।
তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে বিচারকের প্রচুর সংকট রয়েছে। এই সংকট দূর করা না হলে মামলার জট হ্রাসে যে কোনো উদ্যোগ সফলতার মুখ না-ও দেখতে পারে। সে জন্য দেশের উচ্চ ও নিম্ন আদালতে বিপুলসংখ্যক বিচারক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।
বেশ কয়েক বছর আগে জনসংখ্যার অনুপাতে বিচারকের সংখ্যার একটি চিত্র তুলে ধরেছিল আইন কমিশন। সেই চিত্রে দেখা যায়, বাংলাদেশের ১৬ কোটি জনসংখ্যার বিপরীতে অনুমোদিত বিচারকের পদ রয়েছে ১ হাজার ৬৫৫টি। সে হিসাবে ১ লাখ ৫২ হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে মাত্র ১ জন বিচারক নিয়োজিত আছেন। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৩২ কোটি জনসংখ্যার বিপরীতে ৮৬ হাজার বিচারক রয়েছেন। সেখানে প্রতি ১০ হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে এক জন বিচারক কর্মরত আছেন। ভারতে ১২৫ কোটি জনসংখ্যার বিপরীতে বিচারক ছিলেন ১৫ হাজার ৬০৮ জন; অর্থাত্ প্রতি ৮০ হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে বিচারক এক জন ছিলেন।
তবে ভারত ২০০৮ সালে প্রতি ২০ হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে এক জন বিচারক নিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা স্হির করে এবং ২০১৩ সাল পর্যন্ত সেখানে ৬৭ হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে এক জন বিচারক নিয়োজিত হয়েছেন। আইন কমিশন বলছে, যে কোনো বিবেচনায় দেশে বিচারকের এই সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল। প্রতি বছরই মামলার সংখ্যা বেড়েই চলছে। এই অপ্রতুলসংখ্যক বিচারককেই এই বিশালসংখ্যক মামলার দায়দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। অথচ অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আমাদের দেশে বিচারকের সংখ্যা অনুপাতে মামলা নিষ্পত্তির হার বিশ্বের যে কোনো দেশের তুলনায় সন্েতাষজনক। এই অস্বাভাবিক মামলাজট নিরসনের ব্যাপারে যদি ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয়, তাহলে আমাদের দেশের বিচারব্যবস্হা ভেঙে পড়তে পারে।
চলতি বছরের শুরুতে দেশের ২৩তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। এরপরই মামলাজট নিরসনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখা যায় তাকে। এর মধ্যে দেশের আট বিভাগের অধস্তন আদালতের মামলা নিষ্পত্তি মনিটরিংয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় হাইকোর্টের আট বিচারপতিকে। বিভিন্ন পর্যায়ের অধস্তন আদালতের বিচারকেরা দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করতে গিয়ে যেসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, তা অবহিত করেন মনিটরিং কমিটির বিচারপতিদের।
মনিটরিং কমিটির বিচারপতিরা তখন অধস্তন আদালতের বিচারকদের দ্রুত নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে নির্দেশনা দেন। এছাড়া মাস শেষে প্রধান বিচারপতিকে তারা রিপোর্ট দিয়ে থাকেন। গত জানুয়ারি মাসে এই কমিটি গঠনের পর মার্চ মাসে তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধান বিচারপতি। ঐ বৈঠকের পরই নিম্ন আদালতে বিচারাধীন মামলার জট হ্রাস ও মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা পরিহার তথা দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণে সাত দফা নির্দেশনা প্রদান করেন প্রধান বিচারপতি। এসব নির্দেশনার মধ্যে ১০ বছরের অধিক পুরোনো সব ধরনের মামলা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির পদক্ষেপ উল্লেখযোগ্য।
এছাড়া পারিবারিক, ডিক্রি জারি মোকদ্দমাসমূহ দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনায় আরো বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন দেওয়ানি আদালতে দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন একতরফা মোকদ্দমাসমূহ যথাযথভাবে সমন জারিসহ অন্যান্য আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে এসংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। এছাড়া অধস্তন আদালতের বিচারকদের নির্দিষ্ট সময়ে এজলাসে ওঠা, কর্মঘণ্টা শেষ হওয়ার আগে এজলাস ত্যাগ না করা এবং কর্মঘণ্টার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতের জন্য সচেষ্ট থাকতে বলা হয়েছে।
বিচারাধীন মামলার সংখ্যা নির্ধারণ: দেশের অধস্তন প্রতিটি দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত এবং ট্রাইবু্যনালে বিচারাধীন মামলার প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মামলার নথি গণনাপূর্বক এই সংখ্যা নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে। এছাড়া পুলিশ বা অন্য কোনো তদন্তকারী সংস্হার নিকট তদন্তাধীন মামলার প্রকৃত সংখ্যা পৃথকভাবে নির্ধারণ করে পাঠানোরও নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি।
