প্রায় দুই মাসের তীব্র লড়াইয়ের পর ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় গুরুত্বপূর্ণ বন্দর শহর মারিউপোল জয়ের দাবি করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। যদিও মারিউপোলের আযভস্টাল ইস্পাত কারখানার ভেতর থেকে এখনো প্রতিরোধ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে প্রায় ২ হাজার ইউক্রেনীয় সেনা।
এ অবস্হায় পুতিন বলেছেন, শিল্প অঞ্চলে সামরিক অভিযান চালানো অপ্রয়োজনীয়। সেখানে সেনা অভিযান বাতিলের নির্দেশ দিচ্ছি। বরং ঐ এলাকা এমনভাবে অবরুদ্ধ করে রাখা হোক, যেন একটি মাছিও বের হতে না পারে। রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু’কে বৃহস্পতিবার তিনি এই নির্দেশ দিয়েছেন। টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ঐ বৈঠকে পুতিন ইউক্রেনীয় সেনাদের আবারও অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, আত্মসমর্পণ করলে রাশিয়া তাদের সম্মান দেখাবে এবং আহতদের চিকিত্সা সহায়তা দেবে।
মাত্র একদিন আগে ইস্পাত কারখানায় অবরুদ্ধ ইউক্রেনীয় বাহিনীর অধিনায়ক এক ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি ভিডিওটিকে ‘বিশ্বের প্রতি তাদের শেষ বার্তা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। ঐ বার্তায় মেজর সেরহিভ ভলিয়ানা জানান যে, তাদের জরুরি সরবরাহ শেষ হয়ে আসছে ও রুশ সেনারা তাদের চার দিকে ঘিরে ফেলছে। তারা আর মাত্র কয়েক দিন বা কয়েক ঘণ্টা হয়তো টিকে থাকতে পারবেন। তাদের সঙ্গে কিছু বেসামরিক লোকও অবরুদ্ধ রয়েছে বলে জানান।
মারিউপোলের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্হিত এই আযভস্টাল ইস্পাত কারখানাটির আয়তন প্রায় ১০ বর্গ কিলোমিটার, যেটি এখন ইউক্রেনীয় প্রতিরোধের সর্বশেষ ঘাঁটি। এটির পতন ঘটলে পুরো মারিউপোল রুশদের হাতে চলে যাবে। কারখানা এলাকার ভেতর মাটির নিচে বহু টানেল এবং ওয়ার্কশপ আছে, ফলে সেখানে প্রতিরোধ যুদ্ধ চালানোর কিছু সুবিধা আছে। বলা হচ্ছে, এই ইস্পাত কারখানার নিচে লুকিয়ে আছে কার্যত আরেকটি শহর।
পুরো মারিউপোল দখল করতে পারলে রাশিয়া ক্রাইমিয়া অঞ্চলকে রুশ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দখলে থাকা পূর্ব ইউক্রেনের এলাকাগুলোর সঙ্গে যুক্ত করতে পারবে। এর ফলে ইউক্রেনের কৃষ্ণ সাগর উপকূলের ৮০ শতাংশই রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। ইউক্রেন তখন কার্যত বাকি বিশ্ব থেকে আরো বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, সমুদ্র পথে তাদের বাণিজ্য মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে। এটিকে প্রেসিডেন্ট পুতিন একটি বড় বিজয় হিসেবে দেখিয়ে প্রোপাগান্ডা চালাতে পারবেন। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া এ পর্যন্ত একটি মাত্র বড় শহর, খারসন দখল করতে পেরেছে। মারিউপোল দখলকে পুতিন এখন তার দেশের জনগণকে দেখাতে পারবেন যে রাশিয়া যে লক্ষ্য নিয়ে সেখানে গেছে, তা অর্জিত হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ইউক্রেন রুশ হামলা শুরুর পর সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয় হয়েছে এই মারিউপোল শহরে। লাগাতার বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে ৪ লাখ বাসিন্দার শহর এখন প্রায় জনশূন্য। শহরের মেয়রের দাবি, রুশ হামলায় এখন পর্যন্ত ১০ হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে এই শহরে।
সেনাদের সরিয়ে নিতে আলোচনার প্রস্তাব কিয়েভের
মারিউপোলের শেষ ঘাঁটি আযভস্টাল ইস্পাত কারখানায় অবরুদ্ধ ইউক্রেনীয় সেনা ও বেসামরিক লোকদের সরিয়ে নিতে কোনো শর্ত ছাড়াই রাশিয়ার সঙ্গে বিশেষ আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে ইউক্রেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও প্রধান আলোচক মিখাইলো পদোইলাক এক টুইটে বলেছেন, আযভ (ব্যাটেলিয়ন), সামরিক বাহিনী, বেসামরিক, শিশু, বেঁচে থাকা আহতদের বাঁচাতে কোনো শর্ত ছাড়াই বিশেষ পর্যায়ের আলোচনার জন্য ইউক্রেন প্রস্ত্তত। ইউক্রেনের উপ-প্রধানমন্ত্রী আযভস্টাল কারখানা থেকে বেসামরিক মানুষ ও আহত সেনাদের বের হওয়ার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। যদিও রাশিয়ার পক্ষ থেকে এই ব্যাপারে কোনো সাড়া দেওয়া হয়নি।
ন্যাটো ইউক্রেনকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা বন্ধ করলেই যুদ্ধ থামবে: মস্কো
দুই মাস অতিবাহিত হতে চললেও ইউক্রেনে রুশ সামরিক হামলা বন্ধের কোনো আভাস মিলছে না। এর মধ্যেই রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আলেক্সিই পোলিশচুক বলেছেন, ন্যাটো ইউক্রেনের ভূমি ব্যবহার করে রাশিয়াকে হুমকি দেওয়া বন্ধ করলেই যুদ্ধ থামতে পারে। তবে ন্যাটো কীভাবে রাশিয়ার ভূখণ্ডের জন্য হুমকি তৈরি করছে, সে ব্যাপারে তিনি বিস্তারিত কিছুই বলেননি। দনবাস অঞ্চলে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করেছে রাশিয়া। রুশ কর্মকর্তা দাবি করেন, তাদের অভিযান সঠিক পথেই এগোচ্ছে।
‘কুমির’ পুতিনের কারণে ইউক্রেন শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হবে: জনসন
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আলোচনা করা কুমিরের সঙ্গে আলোচনার মতো বলে মন্তব্য করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। তার মতে, পুতিন আলোচনার ক্ষেত্রে আস্হার পরিচয় দেননি, এ কারণে ইউক্রেন নিয়ে যে কোনো শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হতে পারে। জনসন বলেন, আপনার পা কামড়ে ধরে থাকা কুমিরের সঙ্গে আপনি কীভাবে আলোচনা করবেন? ইউক্রেনীয়রা এ রকম কঠিন পরিস্হিতিরই মোকাবিলা করছে। এ অবস্হায় তাদের অস্ত্র সরবরাহ করাটা জরুরি। বৃহস্পতিবার ভারত সফরে যাওয়ার পথে জনসন এ মন্তব্য করেন। ইউক্রেনের যুদ্ধ নিয়ে নিরপেক্ষ অবস্হান থেকে সরে আসার জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে তিনি আহ্বান জানাবেন বলে জানান।
কিয়েভে স্পেন ও ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী, রাশিয়া নিন্দায় জি-২০
গতকাল ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে গেছেন স্পেন ও ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রীরা। তারা ইউক্রেনকে আরো অস্ত্র সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। গতকালই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সঙ্গে তাদের বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। এদিকে বুধবার ওয়াশিংটনে জি-২০ সম্মেলনের একটি অধিবেশন বয়কট করেন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং কানাডার অর্থমন্ত্রীরা। তারা ইউক্রেনে রুশ হামলার তীব্র নিন্দা জানান। অধিবেশন বয়কটের আগে মার্কিন অর্থমন্ত্রী জ্যানেট ইয়েলেন রুশ প্রতিনিধির উপস্হিতির সমালোচনা করেন।

'ইউক্রেনে ব্যর্থ হচ্ছে রাশিয়া'
কমলা হ্যারিস-মার্ক জাকারবার্গসহ ২৯ মার্কিনির ওপর রুশ নিষেধাজ্ঞা