রোববার, ০৩ জুলাই ২০২২, ১৮ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সম্রাট আকবর তানপুরা কাঁধে নিয়ে চললেন তানসেনের গুরুগৃহে 

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২২, ০৭:১৭

সংগীত যথার্থই সম্প্রীতির প্রতীক অথবা বলা যায় মানবতার প্রতীক। সাধারণ অর্থে আমরা জানি, সংগীত মনুষ্যরূপীদের সত্যিকারের মানুষ হতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেজন্যই বলা হয়ে থাকে—যে ব্যক্তি সংগীত ভালোবাসে না, সে মানুষ খুন করতে পারে।

গ্রামবাংলার বহু প্রাচীন ঐতিহ্য লোকসংগীতের কথা আমরা ভুলতে পারি না—যার সুরে, কথায় কৃষক, শ্রমিক, মজুর থেকে শুরু করে কী গ্রামের, কী নগরের লোকজন—সবাই মোহিত হই। যার সুধারসে ধনী-গরিব নির্বিশেষে হই অভিসিঞ্চিত। সেই লোকসংগীতেরই ক্রম পরিশীলনে সৃষ্টি হয়েছে নতুন নতুন সাংগীতিক প্রকারের। পরিশীলিত সংগীতেরই গোত্রভুক্ত উচ্চাঙ্গসংগীত বা শাস্ত্রীয় সংগীত। কী ভাষার দিক থেকে, কী শিল্পীর পরিবেশনার দিক থেকে অথবা গুরু-শিষ্য পরম্পরায় প্রশিক্ষণের দিক থেকে এই সংগীতকে বলা যায় সম্পূর্ণ মানবতাবাদী সংগীত। এই সংগীতের বন্দেশ বা কবিতা অংশে একসময় শুধুমাত্র স্রষ্টার নাম গুণগানই উল্লেখিত হতো। এরপর প্রকৃতি বর্ণনা যুক্ত হয়। আবার কখনো বাদশাহ-সম্রাট বা রাজা-মহারাজার স্ত্ততিমূলক বিষয় সন্নিবেশিত হয়েছে। যা দীর্ঘ সময় ধরে গীত হয়ে আসছে। যেমন, একটি খেয়াল গানের কবিতাংশে ‘আল্লাহ জানে মাওলা জানে’ অন্যটিতে পাওয়া যায় ‘অব মোরে রামরে বিরামরে’। এখানে যেটি বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, একজন হিন্দু গায়ক ‘আল্লাহ জানে মাওলা জানে’ গানের কথাটি গাইছেন যেই ভক্তি এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে, একজন মুসলিম গায়কও একইভাবে গাইছেন ‘অব মোরে রামরে বিরামরে’। এইরকম বহু কবিতাংশ আছে উচ্চাঙ্গসংগীত বা শাস্ত্রীয় সংগীতে যা যুগ যুগ ধরে শিল্পীরা গেয়ে চলেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে।

আমরা যখন দেখি অবিভক্ত ভারতের অগ্রগণ্য শিল্পীদের একজন আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সন্তান সংগীত-সম্রাট উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ পরম মমতায় তালিম দিয়ে তৈরি করলেন তাঁর শিষ্য রবিশংকরকে। (যিনি পরবর্তীকালে বিশ্ববিখ্যাত হয়েছিলেন)। এখানে ধর্মীয় পরিচয় কোনো রকমের বাধার সৃষ্টি করেনি। যে সম্প্রীতির কথা শুরুতেই উল্লেখ করেছিলাম সেই সম্প্রীতি শুধুমাত্র ধর্মীয় সম্প্রীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। উপমহাদেশের এই শাস্ত্রীয় সংগীতের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে সমগ্র বিশ্ব। অর্থাৎ বিশ্ব সম্প্রীতিও এই সংগীতের মাধ্যমে সম্ভব। এটি দেখিয়ে গেছেন উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর পুত্র উস্তাদ আলী আকবর খাঁ এবং জামাতা পণ্ডিত রবিশংকর। যদিও আমরা জানি, সংগীতকে বিশ্বভাষা বলা হয়। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের সংগীত তথা উপমহাদেশীয় সংগীতের যে প্রকারগুলি রয়েছে তার মধ্যে উচ্চাঙ্গসংগীত বা শাস্ত্রীয় সংগীতটাকে সত্যিকার অর্থে অক্লান্ত পরিশ্রম করে বিশ্বভাষায় পরিণত করেছিলেন পণ্ডিত রবিশংকর ও উস্তাদ আলী আকবর খাঁ। আমরা সেই গর্বের সংগীতের উত্তরসূরি।

এই যে আমাদের উচ্চাঙ্গসংগীত, সেটির পরিশীলন ঘটেছে ক্রমাগত। এই সংগীতে আদান-প্রদান হয়েছে সুদীর্ঘ সময় ধরে। আমাদের সংগীতের উপাদান দান করেছি বিশ্বসংগীতের উন্নতিতে। আবার বিশ্বসংগীতের বহু উপাদান আমরা গ্রহণ করেছি আনন্দচিত্তে আমাদের সংগীতের পরিপুষ্টিতে। বর্তমানকালে প্রচলিত উচ্চাঙ্গসংগীতের একটি প্রকারের নাম ‘খেয়াল’। ‘খেয়াল’ গানটি সম্প্রীতির একটা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কারণ, এটি হিন্দু ও মুসলিম গীতরীতির সম্মিলিত প্রয়াস। এছাড়া খেয়াল গান সৃষ্টি নিয়ে একাধিক মতামত থাকলেও একটি মত খুবই প্রচলিত। আর সেই মত হলো, এই খেয়াল গান সৃষ্টিতে পারসিক সংগীতের উপাদানও যুক্ত করেছিলেন সংগীত মনীষী আমীর খসরু।

ইতিহাস পাঠে আমরা জানি, রাজা-বাদশারা এই সংগীতের যথার্থ পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। যার ফলে সৃষ্টি হয়েছে নব নব সংগীতশৈলী। সম্রাট আকবরের সংগীতপ্রীতির কথা আমরা সবাই জানি। তার মধ্যে উদাহরণ হিসেবে একটি ঘটনার উল্লেখ করছি। মহান সংগীত-সাধক তানসেন ছিলেন সম্রাট আকবরের নবরত্নের শ্রেষ্ঠ রত্ন। তিনি ছিলেন ধ্রুপদ গায়ক। একবার আকবরের মনে এক প্রশ্নের উদয় হলো যে, তানসেন এত বড় শিল্পী, তবে তাঁর গুরু আরো কত উচ্চ মার্গের হতে পারে সেটি জানার জন্য তাঁর গান আমায় শুনতেই হবে। জানানো হলো তানসেনকে তাঁর গুরুর কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। এটি শুনে তানসেন জানালেন, তাঁর গুরু হরিদাস স্বামী কারো সামনে সংগীত পরিবেশন করেন না। তিনি শুধুমাত্র স্রষ্টার আরাধনায় গেয়ে থাকেন আর শিষ্যদের তালিম দেওয়ার সময় গেয়ে শোনান। এইবার সম্রাট কোনো উপায় বের করতে বললেন তানসেনকে। তানসেন বললেন, সম্রাট যদি তাঁর পোশাক ছেড়ে তাঁর কাছে সাধারণ পোশাকে যেতে পারেন তবে একটা উপায় বের করা যাবে। সম্রাট আকবর তাতেই রাজি হলেন। তিনি তানসেনের তানপুরা কাঁধে নিয়ে শিষ্যরূপে অরণ্যবাসী স্বামী হরিদাসের আশ্রমে উপস্হিত হন সেই সংগীত শ্রবণের উদ্দেশ্যে।

এখানে যেটি উল্লেখ করবার সেটি হলো, বিষয়টিতে মহান সংগীত সমজদার ও পৃষ্ঠপোষক আকবরের কাছ থেকে শুধুমাত্র সংগীতপ্রীতির সংবাদ নয়, একইসঙ্গে একজন শিল্পীর প্রতি তাঁর যে যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের শিক্ষণীয় বিষয়টিও জানতে পারি।

বর্তমান সময়ে গর্বের এবং সম্প্রীতির এই বিষয়টির প্রতি পৃষ্ঠপোষকতা বিশেষভাবে জরুরি হয়ে পড়েছে। খেয়াল, ঠুমরীর প্রাতঃস্মরণীয় শিল্পীদের নামের তালিকায় আমরা কি ভুলতে পারি উস্তাদ আবদুল করিম খাঁ, উস্তাদ ফৈঁয়াজ খাঁ, উস্তাদ বড়ে গুলাম আলী খাঁ, উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, পণ্ডিত দিলীপ চন্দ্র বেদী, পণ্ডিত ভাস্কর বুয়া বাখলে, পণ্ডিত ওঙ্কারনাথ ঠাকুর, যদু ভট্ট, উস্তাদ আল্লাদিয়া খাঁ, বালগন্ধর্ব, কেসরবাই, মলি­কার্জন মনসুর, গাঙুবাই হাঙ্গল, মোঘুবাই কুর্দিকর, উস্তাদ এনায়েত খাঁ, উস্তাদ নিসার হুসেন খাঁ, কৃষ্ণরাও শংকর পণ্ডিত, ডি ভি পলুস্কর, ভীস্মদেব চট্টোপাধ্যায়, পণ্ডিত শ্রীকৃষ্ণ রতনজনকর, গওহরজান, ধ্র‚বতারা যোশী, তারাবাই, হিরাবাই বরোদেকর, রোশনারা বেগম, উস্তাদ আমীর খাঁ, উস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ, পণ্ডিত রবিশংকর, উস্তাদ আলী আকবর খাঁ, উস্তাদ বিলায়েত খাঁ, পণ্ডিত তারাপদ চক্রবর্তী, পণ্ডিত নিখিল ব্যানার্জি, পণ্ডিত রাধিকা মোহন মৈত্র, উস্তাদ আহমেদজান থেরাকুয়া, উস্তাদ আল্লারাখা, কণ্ঠে মহারাজ, হিরু বাবু, নাটু বাবু, উস্তাদ আমজাদ হোসেন খাঁ প্রমুখ সংগীতজ্ঞের কথা।

এক কথায় বলা যায়, হিন্দু-মুসলিমের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সৃষ্ট এই মহান সংগীতের ইতিহাস, অবদান, সৃষ্টি নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে বড় হয়ে নষ্ট হয়ে যাওয়ার পূর্বে অর্থাত্ ছোট বয়স থেকে। বর্তমান কালের ব্যবহারিক শিক্ষা প্রদানের পাশাপাশি সবার এটাও ভেবে দেখা খুবই জরুরি যে, বর্তমান কোচিং, প্রাইভেট ক্লাসনির্ভর পড়ালেখা থেকে কীভাবে আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে উদ্ধার করা যায়। যাতে করে এই প্রজন্মকে বিদ্যালয়ের পড়ালেখার পাশাপাশি পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার আবশ্যিক উপাদান শিল্প-সংস্কৃতি চর্চায় মনোনিবেশ করবার সুযোগ, পরিবেশ বা সময় কীভাবে করে দেওয়া যায়।

এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, বর্তমান সরকার বিগত মেয়াদে দেশের সবগুলো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীতশিক্ষাকে বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং পাঠ্যপুস্তকে সংগীত বিষয়ক বইও যুক্ত করেছে। কিন্তু বিগত মেয়াদে সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্ত, প্রায় আড়াই হাজার সংগীত-শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়াটি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। আশা করি, নতুন শিক্ষক নিয়োগের সময় সংগীত-শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টিও বাস্তবায়ন করবে বর্তমান সরকার।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক, সংগীত বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যাল

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

বাংলাদেশপ্রেমিক একজন কবি

পুরস্কার ও তিরস্কারময় জীবন

পাশের সিটের মেয়েটি

গ্রেট মাইন্ড থিংক অ্যালাইক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

রামমোহন ও উপমহাদেশে পারস্যচর্চা

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

ইতিহাসের স্মারক

‘বন্ধ কোরো না পাখা’