ঈদ উৎসবে চাঙাভাব অর্থনীতিতে

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০২২, ১৫:২৬

সামনে ঈদ। সাধারণত আমাদের দেশে বিভিন্ন ধর্মীয়, সামাজিক অনুষ্ঠান এবং উৎসবকে কেন্দ্র করে (যেমন, ঈদ, দুর্গাপূজা, বাংলা নববর্ষ) পেষাক-আশক, খাবারদাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর বাজার বেশ জমজমাট হয়ে উঠে।

উৎসবকে কেন্দ্র করে চাকরিজীবীরা বিশেষ বোনাস-ভাতা পান। ফলে নিজের এবং পরিবার-পরিজনদের জন্য উত্সবকেন্দ্রিক বিশেষ কেনাকাটার ধুম পড়ে যায়। যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী সাধ্যমতো কেনাকাটার জন্য দোকান, মার্কেট, বুটিকস শপ, ফ্যাশন হাউজ, শপিং মলগুলোতে ভিড় জমান। এটা অতীত সময় থেকে চলে আসছে। এই উত্সবকেন্দ্রিক কেনাকাটার ব্যাপারটি যেন ঐতিহ্যের, সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। 

দিনে দিনে আর্থিক সক্ষমতা, ক্রয়সামর্থ্য বেড়ে যাওয়ায় উৎসবকে কেন্দ্র করে বাজারের সম্প্রসারণ ঘটেছে। তবে করোনা মহামারির ভয়াবহ সময় পার করার কারণে গত দুই বছর মানুষ উৎসবে বাজারে গিয়ে নতুন জামাকাপড়, সাজপোশাক কেনাকাটা করতে পারেনি। যার ফলে বিগত দুই বছর উত্সবকেন্দ্রিক বাজার মোটেও জমেনি। লকডাউনের কঠোর বিধিনিষেধের কারণে মার্কেট, শপিং মলের দোকানদার, ব্যবসায়ী তাদের পসরা সাজাতে পারেননি। দোকান খুললেও ক্রেতার অভাবে বিক্রি মোটেও হয়নি। নতুন পেষাক কিংবা অন্যান্য সামগ্রী অবিক্রীত রয়ে গেছে। 

গত দুই বছরে এভাবে চরম লোকসান আর গচ্চা দিতে গিয়ে অনেক ব্যবসায়ী সর্বস্বান্ত হয়েছেন। তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রাম দেখে সবাই সহানুভূতি জানিয়েছেন, বিশেষ আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করার দাবি তুলেছেন। কিন্তু বাস্তবে সেই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা এখনো সম্ভব হয়নি তাদের। তবে এ বছর বাংলা নববর্ষ, মাহে রমজান এবং ঈদ উৎসব খুব কাছাকাছি সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এদিকে করোনা মহামারি পরিস্থিতির বেশ উন্নতি হয়েছে। সবার মধ্যে বিরাজমান সেই আতঙ্ক, ভয়ভাব কেটে গিয়ে স্বস্তি ফিরে এসেছে। যে কারণে এবছর আগের সেই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে উত্সবকেন্দ্রিক বাজার। দোকানে দোকানে, সুপারমার্কেটে, শপিং মলগুলোতে, ফ্যাশন হাউসগুলোতে নতুন নতুন পেষাক, শাড়ি, গয়নার সমারোহ লক্ষ করা যাচ্ছে। এর মধ্যেই ক্রেতার ভিড়ও বেড়েছে।

ঈদকে সামনে রেখে সাধারণত নতুন নতুন পেষাক নিয়ে আসে বাংলাদেশের ফ্যাশন হাউজগুলো। সারা বছরে বিভিন্ন উৎসবকে ঘিরে ব্যবসা চললেও এই সময়টাকে লক্ষ্য করেই চলে তাদের মূল আয়োজন। ভারতীয় ও পাকিস্তানি পোশাকের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে বাংলাদেশের ফ্যাশন হাউজগুলো গত কয়েক দশক সময়ে বেশ অনেকটা এগিয়ে গেছে। বড় বড় উৎসবকে সামনে রেখে ফ্যাশন হাউজগুলো দেশীয় কাপড়ে তৈরি দেশের ডিজাইনারদের তৈরি নতুন নতুন ধরনের নকশার পেষাক নিয়ে আসে সাধারণত। যার মধ্যে স্বকীয়তা থাকে। বাজারের বিকাশের মধ্য দিয়ে একসময়ের ঘরোয়া বা সৌখিন বুটিক হাউজগুলো বর্তমানে রূপ নিয়েছে প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডে। বৈচিত্র্যময় ডিজাইন, নান্দনিকতা আর দেশীয় ভাবধারার এই পোশাকের দিকে সব বয়সি মানুষই ঝুঁকছেন। তাই চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশীয় পোশাকের বাজার দিনে দিনে বিকশিত হয়েছে।

ফ্যাশন হাউজগুলো ফ্যাশনের লক্ষণীয় পরিবর্তনের প্ল্যাটফরম তৈরির লক্ষ্যে নিরন্তর কাজ করে দেশীয় ফ্যাশনের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। গত কয়েক দশকে আমাদের এখানে এক ধরনের সচেতনতাবোধ সৃষ্টি হয়েছে। বিদেশি পেষাক মানে ভালো—এ ধারণা থেকে বেরিয়ে এসেছেন ক্রেতারা। দেশীয় ফ্যাশন হাউজগুলো হাঁটি হাঁটি পা করে আজ যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে তা নিঃসন্দেহে গর্ব করার মতো। তাদের পুরো কর্মকাণ্ডই এখন একটি বিকাশমান শিল্প। তেমন পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক মহামারি করোনার ধাক্কা দেশীয় ফ্যাশন হাউজগুলোকে রীতিমতো চরম বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। 
ঈদকে কেন্দ্র করেই ফ্যাশন খাতের সারা বছরের আয়-ব্যয়ের একটি বড় অংশ নির্ধারণ হয়ে থাকে। লকডাউনে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছিলেন স্থানীয় বাজারের পণ্য উত্পাদকরা। যারা পণ্য বিক্রি করেন তাদের দোকানপাট বন্ধ ছিল। তাই কারখানায় উত্পাদন করলেও তা বাজারে পৌঁছানো যায়নি, বিক্রিও হয়নি। স্থানীয় বাজারে প্রায় শতভাগ কাপড়ের চাহিদা মেটায় দেশের বস্ত্রকলগুলো। এই খাতে কাজ করেন কয়েক লাখ শ্রমিক। সরকার ঘোষিত বিধিনিষেধে দেশি বস্ত্রকলগুলো ভোগান্তিতে পড়েছিল। ঈদের আগে এই সময়েই কাপড়ের সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে। শুধু নরসিংদীসহ সারা দেশের বস্ত্রকলগুলো থেকে কাপড় প্রথমে নরসিংদীর বাবুরহাট, নারায়ণগঞ্জের গাউসিয়া, সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন পাইকারি বাজারে যায়। সেখান থেকে সারা দেশে খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের হাতে পৌঁছায়। ঈদের আগের এই সময়ে পাইকারি বাজারগুলো জমজমাট থাকে। কারখানাগুলো দিনরাত চলে। একই অবস্থা দেশীয় ফ্যাশন শিল্পের। পর পর দুই বছর মহামারির ধাক্কা সামলাতে গিয়ে অনেকটা ছোট হয়ে এসেছে দেশীয় ফ্যাশন শিল্পের পরিসর। গত ২ বছরে ফ্যাশন হাউজের অনেক ছোট আউটলেট বন্ধ হয়েছে, অনেক উদ্যোক্তা পেশা পরিবর্তন করেছেন, কারিগর, কর্মচারীদেরকেও ছাড়তে হয়েছে চাকরি। গত বছরও পহেলা বৈশাখের বাজার যখন নতুন নতুন ডিজাইনের শাড়ি, পাঞ্জাবি, থ্রি-পিস ও কুর্তা দিয়ে সাজানো হয়েছিল, তখনই আসে ‘লকডাউন’। সে সময় লোকসান ও ঋণের বোঝা হালকা করতে ফ্যাশন হাউজগুলোতে চলে কর্মী ছাঁটাই।

এবছর সেটা না থাকার কারণে সবাই পরিবার-পরিজনদের জন্য উত্সবকেন্দ্রিক কেনাকাটায় মেতে উঠেছেন। বাজারে চাহিদা সৃষ্টি হওয়ায় সংশ্লিষ্ট উত্পাদনকারি, পণ্যসামগ্রী সরবরাহকারি, প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মচাঞ্চল্য বেড়ে গেছে ইদানিং। জামাকাপড় পেষাক, শাড়ি প্রস্তুতকারি প্রতিষ্ঠান, কারখানা তাঁতি, বুননশিল্পী সবার মধ্যে কর্মচাঞ্চল্য বিরাজ করছে এখন। ফলে গোটা অর্থনীতিতে নবজাগরণ সৃষ্টি হয়েছে ইতিমধ্যেই। উত্সবকেন্দ্রিক বাজার জমে ওঠার মাধ্যমে গোটা অর্থনীতিতে এক ধরনের চাঙ্গাভাব এসেছে। বর্তমানে অনলাইনেও ঈদের পেষাক বিক্রি হচ্ছে। যেসব বড় প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট ক্রেতাগোষ্ঠী রয়েছে, তারাই অনলাইনে ভালো বিক্রি করতে পারছে। অন্যরা ফেসবুকে বিক্রির চেষ্টা করছে। কিন্তু আমাদের দেশের ক্রেতার বড় অংশই অনলাইনে পেষাক কিনতে ভরসা পান না। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবাই অনুধাবন করতে পেরেছেন, ভবিষ্যতে ব্যবসায় টিকে থাকতে হলে অনলাইনেও জোর দিতে হবে।

ঈদের বাজারে তৈরি পেষাক যথাসময়ে সরবরাহের লক্ষ্যে ছোটখাটো বিভিন্ন রেডিমেড গার্মেন্টস কারখানায় ব্যস্ততা বেড়েছে। রাতদিন তাদের কাজ করতে হচ্ছে। ফলে এ খাতে নতুন গতির সঞ্চার হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। করোনা মহামারির গত দুই বছর পেরিয়ে ঈদ উৎসবে চাঙ্গাভাব ফিরে এসেছে অর্থনীতিতে

ইত্তেফাক/ইআ