পাকিস্তান-তালেবান সম্পর্ক কি তলানির পথে 

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২২, ২০:১৮

গত বছরের (২০২১) আগস্টে আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল নেয় তালেবান। এতে ইসলামাবাদের অনেকে উল্লাস করেছে। পশ্চিমা সমর্থিত আশরাফ গানির সরকারের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক যে কঠিন হয়ে পড়েছিল, দেশটিতে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর সেই অবস্থার পরিবর্তন হবে বলে অনেকেই আশা করেছিলেন। এরই অংশ হিসেবে অনেকে ভেবেছিলেন দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক মজবুত হবে। আফগানিস্তানে নতুন করে তালেবান সরকার গঠনের পর পাকিস্তানই দেশটির প্রথম সমর্থনকারী ছিল। বিশেষ করে তৎকালীন ইমরান খান সরকার আফগানিস্তান সরকারকে স্বীকৃতি দিতে ও অর্থনৈতিকভাবে সাহায্য করতে বিশ্ব দরবারে আহ্বান জানান। 

তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চলা নানা ঘটনা দেখে মনে হচ্ছে, দেশ দুটির মধ্যে সম্পর্কের পথ যেদিকে যাওয়ার কথা যাচ্ছে, উল্টো পথে। বিশেষ করে, দেশ দুটির মধ্যে সীমান্ত ও আফগান সমর্থিত তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) গোষ্ঠী নিয়ে উত্তেজনা ঊর্ধ্বগতিতে।  
 
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সীমান্ত প্রায় ২ হাজার ৭০০ কিলোমিটারজুড়ে। দেশ দুটির সীমান্ত বিভক্তকারী রেখাকে বলা হয় ডুরান্ড লাইন। এতে পাকিস্তান বেড়া দিচ্ছে বলে নাখোশ তালেবানরা। এ নিয়ে কয়েকবার সংঘর্ষের খবরও পাওয়া গেছে। 

গত বছরের ডিসেম্বরে এবং এই বছরের শুরুতে পাকিস্তান যখন সীমান্তে বেড়া নির্মাণের কাজ করছিল, তা বন্ধ করে দেয় আফগান সীমান্তরক্ষীরা। এ নিয়ে দেশ দুটির মধ্যে প্রকাশ্যে উত্তপ্ত বিবৃতিও দেওয়া হয়।  

আফগানিস্তানের ভারপ্রাপ্ত উপ-সংস্কৃতি ও তথ্যমন্ত্রী জাবিউল্লাহ মুজাহিদ এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ডুরাল্ড লাইন এখনো একটি অমীমাংসিত ইস্যু। এতে বেড়া দেওয়ার ঘটনা একটি জাতির মধ্যে ফাটল সৃষ্টি করে।’   

এই নিয়ে পাকিস্তানের মিলিটারি মুখপাত্র মেজর জেনারেল বাবর ইফতেখার বলেছেন, ‘এই বেড়া দাঁড় করাতে গিয়ে আমাদের শহীদদের রক্ত ঝরছে। এই বেড়া শান্তির জন্য। এটি পুরোপুরি নির্মাণ করা হবে।’ 

গত কয়েক মাস থেকে টিটিপির ‘সন্ত্রাসীরা’ পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা বাড়িয়েছে। ইসলামাবাদ ভিত্তিক পাকিস্তান ইনস্টটিটিউট ফর কনফ্লিক্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (পিআইসিএসএস) রেকর্ড অনুসারে, ২০২১ সালে পাকিস্তানে অন্তত ২৯৪টি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। যা পূর্বের বছরের তুলনার ৫৬ শতাংশ বেশি। এর বেশির ভাগ হামলাই চালিয়েছে টিটিপি। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তালেবানের আফগানিস্তান দখল নেওয়া টিটিপিকে উৎসাহিত ও শক্তিশালী করেছে। আগফানিস্তান থেকে বিদেশি সেনারা চলে যাওয়ার পর টিটিপি এখন সেখানে তাদের কার্যকলাপ মুক্তভাবে পরিচালনা করছে।

চলতি মাসেও পাকিস্তানের নিরাপত্তার বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনা বেশ বেড়েছে। গত ১৪ এপ্রিল উত্তর ওয়াজিরিস্তানে সন্ত্রাসীদের হামলায় ৮ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হন। আরেক হামলায় গত ২১ এপ্রিল পাকিস্তানের ৭ সেনা নিহত হয়। এছাড়া সর্বশেষ, গত ২৩ এপ্রিল হামলায় ৩ পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছে।  

পাকিস্তান সেনা মিডিয়া উইং প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল বাবর ইফতেখার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সন্ত্রাসী হামলায় ৯৭ জন পাকিস্তানি সেনা এবং অফিসার নিহত হন।’  

এর জবাবে গত ১৬ এপ্রিল আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালিয়েছে পাকিস্তানে। এতে অন্তত ৫০ জন নিহত হয়েছে। আফগানিস্তানে শত শত মানুষ বিক্ষোভে বেরিয়ে আসে। পাকিস্তানবিরোধী স্লোগান দিতে থাকে। এই হামলার জেরে দুই দেশই পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি  দিয়েছে। তাই দেশ দুইটির মধ্যে সম্পর্ক আপাতদৃষ্টিতে যে তলানির পথে তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। সূত্র: আল জাজিরা, ডয়েচে ভেলে, আনাদলু।

 

ইত্তেফাক/এসআর