শনিবার, ২১ মে ২০২২, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

উপেক্ষিত প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা, নেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও হাসপাতাল 

আপডেট : ০৭ মে ২০২২, ০৯:০১

উপেক্ষিত দেশের ১৫ শতাংশ প্রবীণের স্বাস্থ্যসেবা। তাদের শারীরিক ও মানসিক সমস্যাগুলোকে কেবলই দেখা হয়, বয়সজনিত জটিলতা হিসেবে। ফলে তাদের সমস্যাগুলো কখনো নিরাময় হওয়ার নয় বলে মনে করেন অধিকাংশ পরিবারের সদস্যরা। যে কারণে রুটিনমাফিক পরীক্ষানিরীক্ষাও করানো হয় না অনেক প্রবীণের। তাই প্রবীণদের চিকিৎসায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও হাসপাতাল তৈরির পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। 

তাদের মতে, সমস্যাগুলো আমলে নিয়ে একটু যত্ন সহকারে তাদের কথা শুনতে হবে, চিহ্নিত করতে হবে মানসিক সমস্যাটা কোথায়? তবে যদি প্রবীণদের ‘একাকীত্ব’ ঘোচাতে সহানুভূতি আর কাউন্সেলিং দেওয়া যেত, তাহলে অনেকাংশে তাদের সমস্যাগুলোর সমাধান হয়ে যেত বলে মন্তব্য করেন বিশেষজ্ঞরা।

এছাড়া পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের প্রতি আরো যত্নশীল হওয়া, তাদের আনন্দময় সময় উপহার দেওয়া ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিয়েছেন মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, অল্প বয়সিদের আবেগ বেশি। তারা তুচ্ছ ঘটনাতেই অনেক সময় আত্মহননের পথে বেছে নেয়। কিন্তু পরিণত বয়সিদের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে পঞ্চাশোর্ধ্বদের আত্মহননের ঘটনা সমাজের জন্য বড় সতর্ক সংকেত।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা কয়েকজন প্রবীণ সদস্য। [ছবি: সংগৃহীত]

সম্প্রতি, রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ৭৫ বছর বয়সি আজিজুর রহমান (ছদ্মনাম) পরিবারের প্রতি অভিমান করে বাসা থেকে বের হয়ে যান। তাকে এক দিন এক রাত আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরে একটি পার্কে তাকে পাওয়া যায়। পরিবার থেকে জানা যায়, তিনি বাসায় কোন অতিথি এলেই তার কাছে অভিযোগ করতেন যে, ‘তার খাওয়া-দাওয়া ঠিকমতো হয় না, সে কারণে তিনি দুর্বল হয়ে যাচ্ছেন, চিকিৎসক তাকে বেশি বেশি ভালো খাবার খেতে বলেছেন কিন্তু তাকে তা দেওয়া হচ্ছে না। এছাড়া তার অনেক ধরনের শারীরিক অসুস্থতা আছে, যা তার পরিবার আমলে নিচ্ছে না এবং চিকিৎসকের কাছেও নিয়ে যাচ্ছে না’—এসবের পরিপ্রেক্ষিতে তার ছেলে রূঢ় ভাষায় কথা বলাতে তিনি অভিমান করে বাসা থেকে বেরিয়ে যান। পরে চিকিৎসকের কাছে নিলে জানা যায়, ঐ প্রবীণ ব্যক্তি ডিমেনশিয়ায় ভুগছেন। এছাড়া তার ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপও রয়েছে।

এছাড়া চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে ফেসবুক লাইভে এসে ধানমন্ডি ৭ নম্বর সড়কে নিজের ফ্ল্যাটে আত্মহত্যা করেন চিত্রনায়ক রিয়াজের শ্বশুর ব্যবসায়ী আবু মহসিন খান। পুলিশ জানিয়েছে, একাকীত্ব ও হতাশা থেকেই নিজের মাথায় গুলি চালিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি। মৃত্যুর আগে ফেসবুক লাইভে এসে তিনি তার দীর্ঘদিনের একাকীত্ব, ব্যবসায় লস, অসুস্থতা ও হতাশার কথা জানান।

বেসরকারি সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে পারিবারিক জটিলতা, ব্যবসার ক্ষতি, কর্মহীনতা, সম্পর্কের অবনতি, জীবন নিয়ে হতাশা, আর্থিক সংকট এসবই বয়স্কদের মানসিক বিপর্যয়ের মূল কারণ। আর এ থেকে আত্মহননের পথ বেছে নেন অনেকে। মানসিক স্বাস্থ্যের সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে—বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ১৭ শতাংশ বা ২ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নানা ধরনের মানসিক রোগে আক্রান্ত এবং প্রতি ১০০ জনের মধ্যে সাত জন ভুগছেন বিষণ্ণতায়। অথচ অবাক করার বিষয় হলো—এর ৯২ শতাংশ রয়েছেন চিকিৎসার আওতার বাইরে।

চিকিৎসকের পরামর্শ নিচ্ছেন এক প্রবীণ সদস্য। [ছবি: সংগৃহীত]

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মেখলা সরকার বলেন, আমাদের দেশে এখনো মানসিক সমস্যাকে হালকাভাবে দেখা হয়। মানসিক সমস্যা প্রকট না হলে কেউ চিকিৎসকের কাছে আসতে চান না। বয়স্কদের ক্ষেত্রে বিষয়টা আরো অবহেলিত। এ বিষয়ে পরিবারের সদস্যদের সচেতনতা বাড়াতে হবে।

রাজধানীর বারিধারার সিনিয়র সিটিজেন হাসপাতালের জেরিয়াট্রিক মেডিসিন স্পেশালিস্ট ডা. সামনুন তাহা বলেন, প্রথমত প্রবীণদের সমস্যা চিহ্নিত করতে হবে। আমাদের দেশে আসলে প্রবীণদের মানসিক সমস্যার কারণটা আমরা শনাক্ত করতে পারি না। প্রবীণদের কমন একটা সমস্যা ‘ডিমেনশিয়া’, একই সঙ্গে ডিপ্রেশনও থাকে। ডিপ্রেশন বেড়ে গেলেও তারা অনেক কিছু ভুলে যায়, তবে সেটা ডিমেনশিয়া নয়। সে ক্ষেত্রে ডিপ্রেশনের চিকিৎসা করালেই তার ভুলে যাওয়ার সমস্যাটা ভালো হয়ে যায়। অনেক সময় চোখের কারণেও মেমোরি লস হয়, সেটা হয় ছোট ছোট স্ট্রোকের কারণে, যা অনেক সময় বোঝা যায় না। হরমোন সমস্যা বা কিছু ভিটামিনের অভাবেও মেমোরি লস হতে পারে বলে জানান এ চিকিৎসক। তিনি বলেন, কমন মেমোরি লসের কারণ ‘অ্যালঝেইমার’। রোগীর অনেক সময় হ্যালুশিয়েশন হয়, তারা উলটো-পালটা কথা বলে, আচরণ বদলায়, বাসার সবাইকে সন্দেহ করে, এটা একটা অসুখের লক্ষণ। এসব কিছুর সঙ্গেই মানসিক সমস্যা জড়িত। তাই প্রবীণদের চিকিৎসায় সমন্বিত বোর্ড গঠন দরকার। জেনারেল ফিজিশিয়ানদের ট্রেইনআপ করানো দরকার। প্রবীণদের নিয়ে পড়াশুনা এখনো আমাদের দেশের টেক্সবুকে নেই। যে কারণে ডাক্তাররাও ততটা অবহিত নন প্রবীণদের চিকিৎসায়।

বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এক প্রবীণ সদস্য। [ছবি: সংগৃহীত]

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম বলেন, সমাজে এখন সবকিছু দ্রুত বদলাচ্ছে। পরিবারের অন্যরা প্রবীণদের সময় দিচ্ছেন না। তারা চাইলেও কোথাও যেতে পারেন না, সন্তান-সন্ততির ওপর তাদের নির্ভর করতে হয়। ফলে তারা ঘরবন্দি হয়ে পড়ছেন। বসে বসে মৃত্যুর দিন গোনা ছাড়া তেমন কিছুই করার নেই। এ অবস্থায় মনে হতাশা ও বিষণ²তা ভর করে। আর একটি ব্যাপার হলো, পরিবারগুলোতে আর্থিক চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। চাকরি, ব্যবসা থেকে অবসর নেওয়া বয়স্ক মানুষটি পুঁজিবাদী সমাজের পুঁজির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না। তিনি নিজেকে অসহায় ভাবছেন। তিনি আরো বলেন, এ থেকে উত্তরণের জন্য পরিবারের সদস্যদের দায়িত্ব নিতে হবে। পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রের কিছু সুনির্দিষ্ট দায়-দায়িত্ব রয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাবেক উপদেষ্টা ডা. মোজাহারুল হক বলেন, পঞ্চাশোর্ধ্ব ব্যক্তিদের সিস্টেমেটিক রেগুলার বেসিসে চেকআপ করাতে হবে। আর যারা নিম্নবিত্ত তাদের চিকিৎসায় কোনো ইফেকটিভ রেফারেল সিস্টেম আমাদের দেশে গড়ে ওঠেনি। প্রবীণদের চিকিৎসায় জেরিয়াট্রিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ দরকার। কিন্তু বাংলাদেশে এই জেরিয়াট্রিক মেডিসিন ডেভেলপ করেনি। যে কারণে বাংলাদেশের ১৫ শতাংশ প্রবীণ ব্যক্তির চিকিৎসায় কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। কোনো স্পেশাল জেরিয়াট্রিক হাসপাতাল নেই। দেশে জেরিয়াট্রিক চিকিৎসার সুযোগ তৈরি এবং প্রতিটি উপজেলায় বয়স্ক মানুষের চিকিৎসায় সুব্যবস্থা রাখতে হবে। পাশাপাশি জেরিয়াট্রিক প্যাডিয়াটিক নার্স তৈরি করতে হবে।

ইত্তেফাক/ ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

দেশে অকালমৃত্যুর অন্যতম কারণ উচ্চ রক্তচাপ

বিশেষ সংবাদ

দালালের খপ্পরে নাজেহাল রোগী

বিশেষ সংবাদ

মাছের বরফে শরবত, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে নগরবাসী

বিশেষ সংবাদ

দেশে থ্যালাসেমিয়া নিয়ে প্রতি বছর জন্ম নেয় ১০ হাজার শিশু

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

ঈদ উৎসবে সুস্থ থাকুন

হাই তোলে কেন 

নারায়ণগঞ্জ

পাইপে ছিদ্র, পানিতে কলেরার জীবাণু

দূষিত পানি থেকেই ডায়রিয়া!