বৃহস্পতিবার, ২৬ মে ২০২২, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

৭২ দিনে হাজার হাজার মৃত্যু

ইউক্রেন যুদ্ধ যেন শেষ হওয়ার নয়  

আপডেট : ০৯ মে ২০২২, ০৯:৪৪

প্রবাদ আছে, রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। প্রবাদটি নিয়ে হয়তো বা কারো দ্বিমত আছে। কারণ রাজারা মরে গেলে নেতৃত্ব দেবে কে? দেশকে রক্ষা করবে কে? কথাটা শুনতে খারাপ লাগলেও বাস্তবতা ঠিক তাই-ই। চলমান ইউক্রেন যুদ্ধ সেই বাস্তবতাকেই স্বীকার করতে বাধ্য করছে। সাধারণ মানুষের জীবন যেন কচু পাতার পানির মতো। এই জন্ম তো, এই অকাল মৃত্যুকে অন্তত আপনজনের কাছে তাই মনে হয়।

জীবন এভাবেই যাওয়ার কথা!

সাধারণত যুদ্ধে হতাহতের সঠিক হিসেব কখনো পাওয়া যায় না। আবার বিভিন্ন সংস্হা আলাদা আলাদা হিসেব দিয়ে থাকে। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু করে। যদিও মস্কো এটিকে সামরিক অভিযান আখ্যা দিয়ে থাকে।

গত ৫ মে পর্যন্ত জাতিসংঘের এক হিসেবে দেখা যায়, ইউক্রেন যুদ্ধে মোট মারা গেছে ১৪ হাজার ২০০ থেকে ১৪ হাজার ৪০০ জন। এর মধ্যে বেসামরিক নাগরিক মারা গেছে ৩ হাজার ৪০৪ জন যার মধ্যে ৩০৬ জন বিদেশি। জাতিসংঘের হিসেবে স্বেচ্ছাসেবী মারা গেছে ৪ হাজার ৪০০ জন, যদি মিউজিয়াম অব মিলিটারির হিসেবে সেই সংখ্যা ৪ হাজার ৬০০ এর বেশি।

ইউক্রেনের খারকিভের হামলার পরের দৃশ্য। ছবিঃ সংগৃহীত

জাতিসংঘ বলছে, ইউক্রেনের ২৩১ জন শিশু মারা গেছে। এই শিশুর মা-বাবা হয়তো স্বপ্ন দেখেছিলেন, তারা একদিন বড় হবে। কিন্তু তার আগেই তাদের জীবন কেড়ে নেওয়া হলো। অথচ তারা মৃত্যুর আগে জানতে পারল না তাদের অপরাধটা কী ছিল? ইউক্রেনের মারিউপোল শহরে তো এক নারীকে পেটের সন্তানসহ মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। যুদ্ধে রাশিয়ারও কম সৈন্য মারা যায়নি। বিবিসি নিউজ (রাশিয়ান) জানিয়েছে, ৬ মে পর্যন্ত ২ হাজার ১২০ জন রুশ সৈন্য নিহত হয়েছে।

যুদ্ধ শেষ হবে কবে?

মার্কিন সরকারের সিনিয়র কর্মকর্তা, গোয়েন্দা কর্মকর্তা এমনকি সামরিক বাহিনীর সিনিয়র কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন যে, ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হতে পারে। কিন্তু সেটা কতদিন তা কেউ বলছেন না। এমনকি ইউক্রেনের কর্মকর্তারাও সেই একই কথা বলছেন। তবে মুখে কুলুপ এটেছে রাশিয়ার সরকার। তারা যুদ্ধ শুরু করলেও শেষ হওয়ার কথা বলছেন না। রাশিয়া কিছু শর্ত দিয়েছে যে, এসব শর্ত মানলেই সামরিক অভিযান বন্ধ হবে।

সম্প্রতি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি দাবি করেছেন, রাশিয়া তার সৈন্যদের যুদ্ধের পূর্বের অবস্হায় ফিরিয়ে নিলেই কেবল সমঝোতা হতে পারে। কিন্তু রাশিয়া যে শর্ত দিয়েছে তা মানা হবে কি না, সেই বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি।

রুশ হামলার শিকার মারিউপোল যেন ভূতুড়ে নগরী। ছবিঃ সংগৃহীত

প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি লন্ডন ভিত্তিক একটি গবেষণা সংস্হা চ্যাথাম হাউজের সঙ্গে কথা বলার সময় বলেছেন, শান্তি চুক্তির ব্যাপারে তার দেশের জন্য নূ্যনতম গ্রহণযোগ্য অবস্হান হচ্ছে এটা। তিনি ইউক্রেনের নেতা, ক্ষুদ্র ইউক্রেনের নন। তবে ২০১৪ সালে রাশিয়া যে ক্রিমিয়া অঞ্চলকে দখল করে নিজের সীমানায় ঢুকিয়েছে তার কথা কিছু উল্লেখ করেননি জেলেনস্কি।

রাশিয়া এখন দক্ষিণ ইউক্রেনের বিরাট এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। পূর্ব ইউক্রেনের এই পুরোনো শিল্পকারখানা সমৃদ্ধ অঞ্চলটিকে বলা হয় ডনবাস-যা ‘ডোনেট বেসিন’ বা ডোনেট নদীর অববাহিকার সংক্ষিপ্ত রূপ। রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন যখন ডনবাস বলেন, তখন তিনি বোঝান ইউক্রেনের পুরোনো ইস্পাত ও কয়লা উত্পাদনকারী এলাকাটিকে, যার অর্থ সমগ্র দোনেত্স্ক ও লুহানস্ক মিলিয়ে একটি বড় অঞ্চল। প্রধানত রুশভাষী এই এলাকাটিকে মুক্ত করার কথা বারবার বলে আসছেন পুতিন।

রাশিয়া ২০১৪ সালে ক্রিমিয়াকে নিজের অংশ করে নেওয়ার পর থেকে পুতিনের প্রক্সি বাহিনী এই ডনবাসের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি এলাকা দখল করে নেয়। যুদ্ধ শুরুর এক মাসের মধ্যেই রাশিয়া লুহানস্কের ৯৩ শতাংশ এবং দোনেত্স্কের ৫৪ শতাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ দখল করে নেয়।

তবে পুরো দনবাসকে পদানত করা থেকে রুশ বাহিনী এখনো বহু দূরে। এখানে যুদ্ধের ফল কী হয় তার ওপরই নির্ভর করছে ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযানের ভাগ্য। দৃশ্যতঃ এই অভিযানে রাশিয়া অনেক ক্ষেত্রেই সাফল্য পায়নি।

তাই প্রশ্ন হচ্ছে ইউক্রেনে, তার ভাষায়, ‘বিশেষ অপারেশনের’ সাফল্য দাবি করতে হলে তার কী কী অর্জন করতে হবে? তবে চ্যাথাম হাউজে দেওয়া বক্তৃতায় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়া ইউক্রেনের যেসব এলাকা দখল করেছে, সেগুলো তাদের দখলে রেখে দেওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। জেলেনস্কি তার দেশের প্রতি মিটার জায়গার জন্য লড়াই চালিয়ে যাবার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। দুই দেশের পারস্পরিক এই দাবি বলে দিচ্ছে, যুদ্ধ তাড়াতাড়ি শেষ হবার নয়। তাইতো সাধারণ মানুষ এবং সৈন্যদের মৃত্যুর শেষ সংখ্যাও তাড়াতাড়ি জানা সম্ভব নয়।

ইত্তেফাক/টিআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

দক্ষিণ ইউক্রেনে রাশিয়ার পাসপোর্ট বিলির নির্দেশ

ইউক্রেনে রাশিয়ার বিধ্বস্ত ট্যাংক নিয়ে প্রদর্শনী

চলতি বছরের শেষ নাগাদ ক্রিমিয়া পুনর্দখল করবে কিয়েভ

ইউক্রেনে অস্ত্র পাঠানো নিয়ে জার্মানি-পোল্যান্ড দ্বন্দ্ব

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

মারিউপোলে ২০০ দেহ উদ্ধার

ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বের সব অংশকে প্রভাবিত করবে: বাইডেন

আরও জোরালো সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন জেলেনস্কি

যুদ্ধ শেষ করতে পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ চাই: জেলেনস্কি