শুক্রবার, ২৭ মে ২০২২, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

হুমায়ুন আজাদের সমাজদর্শন

আপডেট : ১৩ মে ২০২২, ০৬:১০

একজন লেখক বা কবি চোখে আঙুল দিয়ে সমাজের ক্ষতগুলো দেখিয়ে দেন, যা কিছু বর্তমান, অথবা যা কিছু সৌন্দর্য তাকে কখনো নান্দনিকতার সঙ্গে, আবার প্রয়োজনে রূঢ় বাস্তবতার মধ্য দিয়ে চিত্রায়িত করেন; বর্তমান পাঠকের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ পাঠককে বর্তমানের খতিয়ান বর্ণনা করেন। এক কথায় তিনি সময়ের প্রতিনিধি-সময়ের ধারাভাষ্যকার। সেই অর্থে হুমায়ুন আজাদ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য কবি-লেখক। তিনি তাঁর সময়কে ধারণ করেছেন সুচারুরূপে। আজাদ ছিলেন দূরবীন চোখে অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ দর্শক। নিজের চারপাশ দেখতেন গভীর মনোনিবেশে, বাস্তবতার নিরিখে, নির্লিপ্ত চোখে। যে কারণে তিনি বাংলাভাষায় সবচেয়ে সার্থক ভাষ্যকার। তাঁর সত্যভাষণ চিরাচরিত কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ গ্রহণ করতে পারেনি। তাঁর কলম ও কালিকে হজম করতে না পেরে সমাজের একটি বড় অংশের প্রচ্ছন্ন সমর্থনে অন্ধত্ববাদীরা খুনাখুনির পথ বেছে নেয়।

লেখার দায়বোধ তাঁর যতই প্রখর থেকে প্রখরতর হয়ে উঠছিল, ব্যক্তি আজাদ ততই বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছিলেন। ভেতরে জমাট বাঁধা খেদ ও ক্ষোভ উগড়ে দিলেন ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত ‘সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’ কাব্যগ্রন্থের মধ্য দিয়ে। বললেন

আমি জানি সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে
নষ্টদের দানবমুঠোতে ধরা পড়বে মানবিক
সব সংঘ পরিষদ; চলে যাবে অত্যন্ত উল্লাসে
চ’লে যাবে এই সমাজ-সভ্যতা-সমস্ত দলিল...’

অথচ ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ অলৌকিক ইস্টিমারে দ্রোহের দেখা মেলে, কিন্তু নষ্টদের অধিকারে চলে যাওয়ার এই খেদ সেখানে নেই। যিনি নিজেকে আদ্যপান্ত কবি বলে মনে করতেন, সেই তিনিই কবিতাকে গৌণ করে নেমে এলেন বিশেষত প্রবন্ধ ও উপন্যাস নিয়ে কলমযুদ্ধে!

হুমায়ুন আজাদ জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯৪৭ সালে ঢাকার অদূরে বিক্রমপুরে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তরতাজা যুবক, বিশ্ববিদ্যালয় প্রভাষক। প্রচণ্ড ঘৃণা ছিল তার দখলদার পাকিস্তানি ও এদেশীয় রাজাকার তথা পাকিস্তানপম্হিদের ওপর। তার ছোটগল্প বা স্মৃতিচারণ ‘আমার মুক্তিযুদ্ধ’। হুমায়ুন আজাদ ভণ্ডামি করতে জানতেন না। বিদেশে লেখাপড়া করার সময় তিনি একই ডরমেটরিতে থাকা একজন পাকিস্তানির সঙ্গে এমনকি বাক্যালাপেও ছিলেন অনীহ। সেই পাকিস্তানির ফরাসি বান্ধবীটি যখন রুচি, মেধা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি মমত্ব থেকে পাকিস্তানিকে ত্যাগ করে হুমায়ুন আজাদের বন্ধুতে পরিণত হন আজাদ তা মুক্তিযুদ্ধের মতো বিজয় বলে দেখতে পান। এই মানুষটিই ১৯৭৫ সালে তাঁর ২৮-২৯ বছর বয়সে দেখতে পান বাংলাদেশকে যেন তাঁর চোখের সামনে আরেকবার হত্যা করা হলো। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে শুরু হয় আরেকবার অন্ধকারে ফিরে যাওয়া।

হুমায়ুন আজাদ অসহিষ্ণু হয়ে উঠতে থাকলেন। কারণ হুমায়ুন আজাদের মতো আধুনিকমনস্ক লেখক জানতেন, মানুষের বিশ্বাস রাষ্ট্রের কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। তিনি ‘আমার অবিশ্বাস’ গ্রম্হে লিখলেন, ‘প্রতিটি আদর্শই কারাগার; কোনো আদর্শকে পরম মনে করা হচ্ছে কারাগারকে পরম মনে করা... মানুষ জীবনযাপন করার জন্য জন্মেছে, তার জীবনের কোনো লক্ষ্য নেই—কেন থাকবে? জীবনযাপনই তার লক্ষ্য, বিশেষ আদর্শ যাপন জীবনের লক্ষ্য নয়।’

হুমায়ুন আজাদের ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল থেকে শুরু করে শেষ উপন্যাস পাক সার জমিন সাদ বাদ পর্যন্ত সবগুলো গ্রন্থই স্বপ্নভঙ্গের দলিল। তাই তিনি দেশ, জাতি, দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য ও সুচেতনা ফিরিয়ে আনতে লড়াই করে গেছেন বিভিন্ন পথে। এমনকি মহাবিশ্ব নামক গ্রন্থ লিখে তিনি মানুষকে টানতে চেয়েছেন বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজচেতনায়। পারেননি।

তিনি দেখেছেন এই সমাজ নারীকে কীভাবে বন্দি করে রেখেছে। তাই লিখেছিলেন ‘নারী’ নামক গ্রন্থ। এই গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, ‘পুরুষতন্ত্র নারীকে নিয়োগ করেছে একরাশ ভূমিকায় বা দায়িত্বে। নারীকে নিয়োগ করেছে কন্যা, মাতা গৃহিণীর ভূমিকায়, এবং তাকে দেখতে চায় সুকন্যা সুমাতা সুগৃহিণী সুকন্যা, সুমাতা, সুগৃহিণী রূপে। কোনো নিম্নপদকে অসার মহিমা দিতে হলে পদগুলোকে সুভাষিত করতে হয়; পুরুষতন্ত্রও নারীর ভূমিকাগুলোকে সুভাষিত করেছে, সেগুলোর সাথে জড়িয়ে দিয়েছে বড়ো বড়ো ভাব। তবে এই ভূমিকাগুলোর গূঢ় তাত্পর্য একটি শব্দেই প্রকাশ পায়: শব্দটি দাসী।’

স্বভাবতই পুরুষতন্ত্র হুমায়ুন আজাদের এই স্পষ্টভাষণ গ্রহণ করতে পারেনি। আমরা জানি, পৃথিবীতে বেশকিছু জনপদ ছিল মাতৃতান্ত্রিক। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক বড়বড় রিলিজিয়াসগুলো সেই মাতৃতান্ত্রিক সমাজকে ভেঙেচুরে চুরমার করেছে।

নারীর মতোই বাংলাভাষা কীভাবে নিগৃহীত হয়েছে তা ভাষাবিদ হুমায়ুন আজাদ তুলে ধরেছেন তার ‘বাংলাভাষার শত্রুমিত্র’ গ্রন্থে। ভাষাকে ভালোবেসে লিখেছেন ‘লাল নীল দীপাবলী’র মতো শক্তিশালী গ্রন্থ।

হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে সংঘাত ছিল তথাকথিত প্রগতিশীলদেরও। দীর্ঘদিনের অসুস্থ সংস্কারকেও তিনি ঝেড়ে ফেলার পক্ষে ছিলেন, যা এদেশের প্রগতিশীলরাও গ্রহণ করতে পারেননি। তাঁর স্পষ্ট বয়ান প্রয়োজনের খাতিরে রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলকেও ছাড় দেয়নি, যা অনেকে মেনে নিতে পারেননি। ফলে প্রগতিশীলরাও যুক্তিতে না গিয়ে ব্যক্তি হুমায়ুনের আচরণ স্বভাব নিয়ে কথা বলতে দ্বিধা করেননি। এটিও মূলত একটি প্রতিক্রিয়াশীল কাজ। ব্যক্তি হুমায়ুন কে—সেটা দেখার দায়িত্ব সমাজ, পাঠক বা লেখকদের নয়। তিনি কী লিখেছেন—সেটাই মুখ্য হওয়ার কথা।

আমরা একটু লক্ষ করলেই দেখব আজকের বাংলাদেশকে তিনি যথাযথভাবে দেখতে পেয়েছিলেন তাঁর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে। সবগুলো বইয়ের, সব বাক্যের পাশাপাশি তার প্রবচনগুচ্ছে আমরা তা দেখতে পাই। আজ আমরা কী দেখতে পাচ্ছি? আধুনিক প্রযুক্তি হাতের মুঠোয় পেলেও আমরা পরিণত হয়েছি মধ্যযুগীয় দাঁড়কাকে।

তবে তাঁর দেখাকে বক্তব্যে পরিণত করে আজাদ যে সংখ্যায় কম হলেও শক্তিশালী মতাদর্শের অঙ্কুরোদ্গম করে গেছেন—তা এই জনপদে একদিন বটবৃক্ষের মতো ডালপালা ছড়িয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। এই আশা নিয়েই আমরা অন্ধকার গলি দিয়ে হাঁটছি। 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

কবিতা

মনের অলিন্দ ও প্রতিবেশী

বাংলা শব্দের সুলুক সন্ধানে— 

‘আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ’

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

কবিতা

ওভার ট্রাম্পড

আঁধারের হাত ধরে

আজ কবিগুরুর জন্মদিন