শনিবার, ২৮ মে ২০২২, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ওভার ট্রাম্পড

আপডেট : ১৩ মে ২০২২, ১৩:০১

এবার নিজ শহরে গেলে পৈতৃক বাড়ির গৃহপরিচারিকা সালমা বুয়ার রকম-সকম অমিত্রাক্ষরের ভালো ঠেকল না। কেমন যেন একটু গায়েপড়া ভাব। বুয়া যে এ বাড়িতে অনেকদিন, তা নয়। তাকে রাখা হয় নতুন যে ভদ্রলোক আবাসিক সুপারিনটেনডেন্ট এসেছেন তার সুবাদে। এখন আর এ শহরে থাকেন না অমিত্রাক্ষররা। পৈত্রিক বাড়িটিতে একটি স্বেচ্ছাসেবক সংগঠনের কার্যক্রম চালুর প্রস্ত্ততি চলছে। অমিত্রাক্ষরের পিতার স্মরণে। সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের প্রয়োজনীয় অনুমতি লাভ হয়ে গেছে। এখন সদস্যভুক্তি, জনবল নিয়োগ, রূপরেখা নির্ধারণ, এরপর কার্যক্রম শুরু হবে সীমিতভাবে। সীমিত থেকে ক্রমেই বৃহত্তর পরিমণ্ডলে। কার্যক্রম বা অপারেশন শুরুর পাশাপাশি প্রোফাইল তৈরি, দাতাদের মনোযোগ ও অনুদান লাভ, সেবা খাত বাড়ানো এবং এর আওতা সম্প্রসারণ। এজন্যই নতুন সুপারকে যোগদান করানো হয়েছে। আর আছেন কয়েকজন বিশ্বস্ত পুরনো কমী‌র্। তারা আছেন রক্ষণাবেক্ষণের ভার নিয়ে। কিন্তু এ দেশে যা হয় আরকি। কেউ ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে বাড়াবাড়ির চূড়ান্ত করেন, আর কারো ক্ষেত্রে অনিয়ম, অপচয় বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া বা শৃঙ্খলা ফেরাতে জোরারোপ করলে সবাই মিলে তাকে তাড়ানোর ব্যবস্হা করে। সুপারকে নিয়েও সেই একই ব্যাপার।

প্রথমেই অমিত্রাক্ষরের কানে এলো, সালমা বুয়াকে সুপার কয়েকদিনই জাপটে ধরেছেন। একদিন সকালে মশারি তোলার আগেই তার কক্ষে ঝাড়পোছের কাজে গেলে টেনে মশারির মধ্যে নিতে চেয়েছেন। সব শুনে অমিত্রাক্ষর বললেন, আমি কয়েকদিনের জন্য এসেছি, মেহমানের মতোই এখানে। বুয়াকে আপনারাই রেখেছেন, আপনারাই মিটিয়ে নেন। তিনি পুরনো কমী‌র্দের দুজনকে অনুরোধ করেন—এক. তার কোনো মতামত না চাইতে; দুই. তার এ সেবামূলক উদ্যোগটি যেন অঙ্কুরেই বিনষ্ট না হয়। সালমা বুয়ার ইসু্যটি নিয়ে বাড়াবাড়ির আগেই সমাধান করা যায়।

সুপারের বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ শুনতে পেলেন, তার অপরিমিত ব্যয়ের। কেবল চালু হচ্ছে এমন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে যতটুকু সম্ভব সর্বোচ্চ বেতন, সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্হা করেও তার জন্য যথেষ্ট হচ্ছে না। প্রতি মাসেই আশপাশের দোকানে বাকি হচ্ছে। নতুন মাস শুরু হলেই বেতনের ত্রিশ থেকে চল্লিশ ভাগ দিয়ে সেই বাকি শোধ করে দিতে হয়। বাকি ষাট থেকে সত্তর শতাংশে মাসকাবারি হয় না। মানে সে মাসেও আবার ধার। দারিদ্রে্যর দুষ্টচক্রের আবর্তে আটকাপড়ার মতো ব্যাপার।

পুরনো লোকেরা বলেন, সুপার নাকি বেজায় চাপাবাজ। প্রায়শই বলে—আমি কতশত এনজিও দাঁড় করিয়েছি। বিদেশি ফান্ড এনেছি। এনজিও ব্যক্তিত্ব ওমুক আমার চেনা, তমুক আমার বন্ধুস্হানীয়। আবেদ ভাই প্রায়ই ফোন করেন। ইউনূস ভাই যেতে বলেন। খুশী আপা না খেয়ে কোনোদিন আসতে দেননি। ফারুক ভাই যখন শুনলেন, আমি খুলনায় নতুন প্রজেক্ট দাঁড় করাতে এসেছি, বললেন, আমার এলাকা তো, খুব ভালো হলো, শুনে খুশি হলাম। অমিত্রাক্ষর অবশ্য এসব এখনো অবিশ্বাস্য মনে করেন না। তাই তো বড় স্বপ্ন আর আশা নিয়ে তাকে এনেছেন। তার যেন আরাম-আয়েশের কোনো ঘাটতি না হয়, মান জীবনযাত্রা নিশ্চিত হয়, সেজন্য সর্বাত্মক খেয়াল রাখার ব্যবস্হা করেছেন।

এনজিও কাজে পারঙ্গম লোকেরাও যেমন আসছেন, অনেক উঠতি তরুণ-তরুণীও আসেন প্রতিদিনই সুপারের কাছে। পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু হলেই অবশ্য সুপারিনটেনডেন্ট পদবিটি বদলে যাবে। তবু এখনই শিক্ষানবিশরা তাকে স্যার সম্বোধন করে। এনজিও কার্যক্রমে ভাই সম্বোধনই বেশি প্রচলিত। স্যার ডাকায় অমিত্রাক্ষরের বরং বেশি ভরসা লাগে। মনে হয় ইনিই পারবেন। ক্রমেই জমে উঠছে অফিস। এতদিনে প্রায় তালাবদ্ধ বাড়িতে এসেছে প্রাণ। একটি পোড়োবাড়িই এ অঞ্চলের স্বাস্হ্যসেবা, সচেতনতা সৃষ্টি আর অর্থনৈতিক সুরক্ষার সূতিকাগার হবে ভাবতেই ভালো লাগে অমিত্রাক্ষরের। তার পিতার স্মৃতি অম্লান হবে, নিজেরও সুনাম হবে।

একদিন মোবাইল টেলিফোনে সুপার অমিত্রাক্ষরকে একটি অনুরোধ করেন। অমিত্রাক্ষর ততদিনে খুলনা থেকে ফিরে এসে নিজের কর্মস্হলে বৃত্তি সামলাচ্ছেন।

—শুভেচ্ছা। কেমন আছেন ভাই আমার?

—জি, ভালো। আপনার কোনো সমস্যা হচ্ছে না তো।

—নিশ্চয়ই না। আমার ভাই আছেন। তিনি আমার জন্য সর্বোত্তম সব করছেন। কিছু হলে নিশ্চয়ই বলব। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা বাম সংগঠনের সদ্য সাবেক সভাপতি সস্ত্রীক আপনাদের খুলনায় বেড়াতে এসেছেন। তিনি তার সহধর্মিণীসহ আপনার বাড়িতে থাকতে বললে ভালো হতো। না হলে হোটেলে উঠতে হবে।

—না না। ছি ছি। তা কেন? আপনি নিঃসংকোচে বলুন।

—ধন্যবাদ। আমাদের কার্যক্রমও তাদের দেখিয়ে রাখব।

—খু-উ-ব ভালো হবে।

বামপম্হি রাজনীতির বিষয়ে অমিত্রাক্ষরের অসীম অনুরাগ আছে। সাম্যবাদী ধ্যানধারণা তার ভালো লাগে। অমিত্রাক্ষর তাঁর গভীর ভালোবাসা আর একাগ্রতার জন্য অতিথিদের খাওয়াদাওয়া, প্রয়োজন, আরাম, স্বাচ্ছন্দ্য বিষয়ে বিশদে বলে দেন বাড়িতে।

১৯১৭-২০১৭ সালে রুশ বিপ্লবের শতবর্ষে বিরাট অনুষ্ঠানের আয়োজন হয় ঢাকায়। সে এক অন্য অনুভূতি। চারদিকে সাম্যবাদের মূর্ত প্রতীক লাল পতাকাশোভিত। মঞ্চ ও প্যানা প্রিন্টের ব্যানারে বিপ্লবের লাল রঙের জমিন। ভলান্টিয়ারদের পরনে লাল গেঞ্জি। বুকে লেলিনগ্রাদের মহামতি লেনিনের হাত সম্মুখে তোলা আইকনিক ভাস্কর্যটি প্রিন্ট করা। প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন, কাটআউটে সজ্জিত গোটা এলাকা। মঞ্চে মার্ক্স-অ্যাঙ্গেলসের ছবি একদিকে। একদিকে লেনিন, স্টালিন, ট্রটস্কি প্রমুখ। রাজনৈতিক বিরোধ থাকলেও আজ রুশ বিপ্লবের নেতারা একখানে। ‘ডাস ক্যাপিটাল’ বইয়ের কয়েকটি প্রচ্ছদ দিয়ে প্যানাপ্রিন্ট করা হয়েছে। মার্ক্সবাদের মূলমন্ত্র, ভারতীয় উপমহাদেশের বামপম্হি নেতাদের উক্তি ছাপানো হয়েছে সেলফস্ট্যান্ডে। চারদিকে প্রাণের উচ্ছ্বাস। অনেকে অনেকের সঙ্গে দেখা করছেন। পুরনো কমরেডকে পেয়ে বুকে জড়িয়ে ধরছেন। বাজছে প্রেরণাদায়ী গান।

‘ঐ উজ্জ্বল দিন, ডাকে স্বপ্ন রঙিন

ছুটে আয় রে লগন বয়ে যায় রে মিলন বীন

ঐ যে তুলেছে তান—শোন ঐ আহ্বান ...’

গানটির সুর-তাল-লয়ে একলীন হয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন অমিত্রাক্ষর। বক্তারা বক্তৃতা করলেন। বিপ্লবের সাফল্য, ব্যর্থতা, তুলনামূলক আলোচনা, নানা সূক্ষ্ম দিক, বিরল চর্চিত মূল্যায়ন, প্রায় অজানা অনেক কথা। বক্তৃতা পর্বের শেষে বিদায়ের আগে রাজশাহী অঞ্চলের এনক্লোজারে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাম সংগঠনের সভাপতি রিজভী আহমেদের দিকে এগিয়ে গেলেন। তাকে স্বভাবসুলভ করর্মদন ও কুশল জিজ্ঞাসার পর গত বছরের খুলনা সফরের কথা স্মরণ করালেন। রিজভী বললেন, তিনি কোনোদিনই খুলনায় যাননি। একবার কৃষিজমিতে জোর করে লবণপানি প্রবেশ করিয়ে চিংড়ি চাষ বিরোধী কর্মসূচিতে যাওয়ার কথা ছিল। সেবার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কী কারণে যাওয়া হয়নি। এরকম খটকার মুখে অমিত্রাক্ষর কথা না বাড়িয়ে চলে এলেন। অস্হিরতা নিয়ে খুলনায় ফোন করলেন তাদের ম্যানেজার আবদুস সাত্তারকে। না পেয়ে তার ডেপুটি সুমন দেকে মোবাইলে ধরলেন। সুমন জানাল, আপনাকে ভাই জানানো হয়নি। সেদিন একটা লোক একজন মহিলা নিয়ে আসে, পরদিন সকালে আমরা বের হওয়ার সময় তাদের আটকাই। লোকটি স্বীকার করে সে দালাল (দেহপসারিণীদের)। সঙ্গের মেয়েছেলেটি তার আপন কেউ নয়। আমি তাদের আটকে রেখে জাকির ভাই, জাহিদ ভাই, মহেনদাকে ডাকতে চেয়েছিলাম। সাত্তার ভাই বললেন, আপনার থেকে অনুমতি নিছে। সুমন জোর দিয়ে বলে এবারে, ‘সুপার লোকটা জম্মের খারাপ। আপনারে আগেও বলছি।’

সব শুনে নিদারুণ স্তম্ভিত হয়ে পড়েন অমিত্রাক্ষর। তাঁর প্রিয় মার্ক্স-লেনিনের নামে এসব কী হয়, ভেবে পান না। মানুষ কমিউনিস্ট মনোভাবাপন্নদের দুর্বলতার এমনই সুযোগ নেয়! কবে থেকে এমন শুরু হয়েছে? তাস অমিত্রাক্ষর খেলতে জানেন না। আবাল্যই তিনি নিরীহ, সহজ, সাদাসিধে আর বোকা প্রকৃতির। তবে এটা জানেন, তাস খেলায় তুরুপের তাস থাকে, ট্রাম্পকার্ড থাকে। অন্যের কাছে আরো বড় মানের কার্ড থাকতে পারে। তিনি সেটা ছাড়লে ছোট মানের ট্রাম্পকার্ড মার খেয়ে যায় খেলায়। ওভার ট্রাম্পড হয় তখন। অমিত্রাক্ষরের সঙ্গে ঘটে থাকা ঘটনাটি ওভার ট্রাম্পড হওয়ার, সে মুহূর্তে বুঝতে পারেন তিনি।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

রবীন্দ্রনাথ ও যাযাবর

কবিতা

মনের অলিন্দ ও প্রতিবেশী

বাংলা শব্দের সুলুক সন্ধানে— 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

‘আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ’

কবিতা

আঁধারের হাত ধরে

হুমায়ুন আজাদের সমাজদর্শন