বৃহস্পতিবার, ২৬ মে ২০২২, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

শাওয়াল মাসের আমলসমূহ

আপডেট : ১৩ মে ২০২২, ১২:৩৪

ঈদ উদ্যাপনের মধ্য দিয়ে তাকওয়া অর্জনের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সের সমাপ্তি হলো। রমজান মাস প্রশিক্ষণের মাস। রমজানের প্রশিক্ষণ অনুযায়ী বাকি ১১ মাস জীবনকে রাঙিয়ে নেবেন মুমিনেরা। আল্লাহর নিকট শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি যে, তিনি আমাদের সুস্হতার সঙ্গে রমজানে তার নৈকট্য অর্জনে সহায়তা করেছেন। মুমিনরা রমজান বিদায় দেবে কিন্তু রমজানের ইবাদত বিদায় দেবে না। রমজান-পরবর্তী সময়ে নিজ জীবনকে আল্লাহর জন্য সপে দেবে। আমরা রমজানে রোজা রেখেছি, কিন্তু রমজান-পরবর্তী সময়ে রোজা রাখার বেশ সুযোগ রয়েছে।

সপ্তাহে সোম ও বৃহস্পতিবার এবং চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে নফল রোজাসহ শাবান, জিলহজ, মহররম ও শাওয়াল মাসের রোজা রয়েছে; যা রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাখতেন। শাওয়াল মাসের রোজার ব্যাপরে হজরত আবু আইয়ুব আনসারী (রা.) বলেন, ‘রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি রমজান মাসের সব ফরজ রোজাগুলো রাখল, অতঃপর শাওয়াল মাসে আরো ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন সারা বছর ধরেই রোজা রাখল।’ (সহিহ মুসলিম)

রমজানের রাতে তারাবিহ ও সাহরির আগে তাহাজ্জুদ নামাজে মনোনিবেশ ছিলাম। রমজান চলে যাওয়ায় তাহাজ্জুদের অভ্যাস যেন আমরা না ছাড়ি। তাহাজ্জুদের নামাজে আল্লাহর নিকট অনেক কিছু চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। অতিরিক্ত নফল ও তাহাজ্জুদ নামাজ আদায়ে পরকালে জান্নাত লাভে সহয়তা পাওয়া যাবে। অতিরিক্ত নফল নামাজসহ আমাদের নবি হজরত মোহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব সময় তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করতেন। ফরজ নামাজের পর উত্তম নামাজ হলো তাহাজ্জুদের নামাজ। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘ফরজ নামাজসমূহের পর উত্তম নামাজ হলো রাতের তাহাজ্জুদ।’ (মুসলিম শরিফ)

রমজান মাসে প্রতি ঘরে কোরআন তেলওয়াত হয়। রমজান বিদায় হওয়া মানে কোরআন তেলওয়াত বন্ধ করে দেওয়া নয়। রমজানে যেভাবে কোরআন তেলাওয়াতকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল, তা ধরে রাখতে হবে। প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় কোরআন তেলওয়াত করা উত্তম। আমরা অনেকেই কোরআন পড়তে জানি না, এই ধারণা নিয়ে কোরআন তেলওয়াত করি না। আসলে আমরা কিন্তু কয়েকটি সুরা নামাজে পড়ি। তা কোরআনের অংশ। এই সুরাসমূহ নিয়মিত তেলাওয়াত করতে পারি। সময় নিয়ে কোরআন শিক্ষা করা খুবই জরুরি। হজরত ওসমান (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম ঐ ব্যক্তি, যে নিজে কোরআন শেখে এবং অন্যকে শেখায়।’ (বুখারি)।

কোরআন তেলওয়াতের সঙ্গে আমরা রমজানে অধিক দান-সদকা করেছি। রমজানকে আমরা দানের মাস হিসেব মনে করেছিলাম। রমজান ছাড়া অন্য মাসেও দান করা যায়। তবে নবিজি সর্বাধিক দানশীল ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও রমজানে প্রবহমান বায়ুর চেয়ে বেশি দান-সদকা করতেন। আমরা প্রতিদিন, সপ্তাহে এক দিন কিংবা মাসিক বেতন পেয়ে সেই বেতনের কিছু অংশ দান করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি, যা আমাদের জন্য খুবই সহজ। দানে আল্লাহ খুশি হন। অন্তর পবিত্র হয়। দানে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘হে কাব বিন উজরা! নামাজ আল্লাহর নৈকট্য দানকারী, রোজা ঢালস্বরূপ এবং দান-সদকা গুনাহ মিটিয়ে ফেলে, যেমন পানি আগুনকে নিভিয়ে ফেলে।’ (আবু ইয়ালা)

রমজানে যেভাবে দান করেছি, তেমনি আমরা মসজিদমুখী ছিলাম। মাথায় টুপি, গায়ে পাঞ্জাবি পরিধান করে মসজিদে বসে ইবাদতে মশগুল ছিলাম। রমজান বিদায়ে মসজিদে অতিরিক্ত ইবাদত-বন্দেগি করায় নিষেধ নেই। রমজান মাসে যেভাবে মসজিদমুখী ছিলাম, এখনো অতিরিক্ত মসজিদমুখী হওয়া জরুরি। একটু সময় পেলেই অযথা গল্পে সময় নষ্ট করা উচিত নয়। মসজিদে বসে তাসবিহ-তাহলিল ও দরুদ পাঠে ব্যস্ত থাকা ভালো। মসজিদে বসে থাকলেও আল্লাহ সাওয়াব দিয়ে থাকেন। এজন্যই মসজিদকে সবচেয়ে উত্তম জায়গা বলা হয়েছে, যা রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তিনি বলেন, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে পছন্দনীয় স্হান মসজিদ আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট স্হান বাজার।’ (সহিহ মুসলিম)

রমজান মাস দোয়া কবুলের মাস। রমজান ছাড়া দোয়া কবুলের অসংখ্য সময় রয়েছে। প্রতিদিন সুবহে সাদিকের পূর্ব সময়ে, আজান ও নামাজের মধ্যবর্তী সময়ে, ফরজ নামাজের পর, জুমার দিনসহ সফরে থাকাকালীন দোয়া কবুল হয়। তখন আমরা দুই হাত তুলে আল্লাহর নিকট সমস্যার কথা বলে সমাধান করিয়ে নিতে পারি। আমরা রমজানে মিথ্যা, গিবত, অন্যায় কাজ ও হারাম উপার্জন করিনি। ইচ্ছা হলেও মনকে বলেছি, আমি তো রোজাদার। আমরা রমজানকে বিদায় দিতে পারি, তবে রমজানের কোনো আমলকে বিদায় দিতে পারি না। এজন্য পাপাচার, হিংসা, গিবত, চোখলখোরি থেকে নিজেকে মুক্ত রাখব। গরিব-দুঃখী-অসহায়দের পাশে দাঁড়াব। সত্যি কথা যে, রমজান শেষে আমরা কেউ ধর্মকর্ম তেমন করি না। আগামী রমজান আসা পর্যন্ত রুটিন তৈরি করে সেই রুটিন অনুযায়ী ইবাদতে মগ্ন হব। রমজান শেষ হয়েছে, শুদ্ধ হওয়া শেষ হয়নি। হালাল অর্থ অর্জন করব। আল্লাহর ভয়ে জুলুম করা থেকে বেঁচে থাকব। অন্যের ক্ষতি নয়, সবাইকে সহায়তা করব। সহমর্মিতার মাসে যে শিক্ষা পেয়েছি, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তা বাস্তবায়ন করব। রমজান থেকে পাওয়া শিক্ষা আজীবন ধরে রাখব। আল্লাহ আমাদের সহয়তা দান করুন। আমিন।

লেখক: ইসলামবিষয়ক গবেষক 

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

৫ জুন থেকে হজ ফ্লাইট শুরু করতে চায় ধর্ম মন্ত্রণালয়

হজযাত্রী নিবন্ধনের সময় শেষ আজ 

জাকাত বোর্ড ও দারিদ্র্য দূরীকরণ

চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ৮ জুলাই পবিত্র হজ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

বেসরকারিভাবে হজ পালনে খরচ পড়বে যত

সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজের খরচ বাড়লো লাখ টাকা

চাঁদ দেখা কমিটির বৈঠক সন্ধ্যায় 

ঈদ কবে, জানা যাবে রবিবার