শনিবার, ২৮ মে ২০২২, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

অর্থনীতিতে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে

আপডেট : ১৪ মে ২০২২, ০৬:৪২

করোনার কারণে দেশের অর্থনীতি বড় ক্ষতির মুখে পড়বে—এমন আশঙ্কা ছিল। তবে বাস্তবে তেমনটি ঘটেনি। খারাপ অবস্হা থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতির উত্তরণ হচ্ছে বেশ ভালোভাবেই। অবশ্য এ ভালো পরিস্থিতির মধ্যেও দেশের অর্থনীতির জন্য বেশকিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আয়বৈষম্য কমানো এবং যুব কর্মসংস্থান হলো বড় তিনটি চ্যালেঞ্জ।

এগুলো থেকে উত্তরণের উপায়, আগামী অর্থবছরের বাজেট, শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশের শিক্ষাসহ অর্থনীতির নানাদিক নিয়ে দৈনিক ইত্তেফাকের সঙ্গে কথা বলেছেন অর্থনীতিবিদ ড. সাদিক আহমেদ। তিনি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেও কাজ করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক হিসেবে ক্যারিয়ার এরপর শুরু করা এ অর্থনীতিবিদ লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স থেকে এমএসসি করেছেন। আর বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি শেষ করে বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন বড় পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।

সামষ্টিক অর্থনীতি বিষয়ে ড. সাদিক বলেন, মূল্যস্ফীতিই এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা। মূল্যস্ফীতি ধনী লোকদের ওপর খুব বেশি প্রভাব ফেলে না। যারা গরিব বিশেষ করে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ তাদের ওপর বেশি প্রভাব পড়ে। এজন্য সামাজিক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্হা নিতে হবে। আর দীর্ঘমেয়াদে এজন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আয় বণ্টনের প্রতি জোর দিতে হবে। এজন্য অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া জেলাগুলোর প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ জেলাগুলোতে ডেলটা প্ল্যান বাস্তবায়নের কথা বলেন তিনি। এর ফলে দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলা বিশেষ করে কুড়িগ্রামের অবস্হার উন্নতি হবে বলে আশা ব্যক্ত করেন তিনি।

তিনি বলেন, কোভিড-১৯ ছিল বড় ধরনের ধাক্কা। এতে আমাদের অর্থনীতির পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাত সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ কারণেই সরকারকে এ বিষয়ে আরো গুরুত্ব দিতে হবে। আমরা এখনো সার্বজনীন স্বাস্থ্য বিমা করতে পারিনি। স্বাস্থ্য বিমার ক্ষেত্রে আমাদের দেশ পিছিয়ে আছে। অথচ ভারত ও পাকিস্তানে তা শুরু হয়েছে।

আগামী ৯ জুন ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী। বাজেট বিষয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার সে বিষয়ে তিনি বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের জন্য স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি আয় দরকার। আর আয় বাড়াতে হবে ট্যাক্স থেকেই। কাদের কাছ থেকে ট্যাক্স আদায় করতে হবে সে বিষয়ে অনেক কাজ করার আছে। এজন্য ‘সিলেকটিভ অ্যান্ড প্রোডাকটিভ’ অডিটের ওপর জোর দিতে হবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও ধনীরা ট্যাক্স সঠিকভাবে দেয় না। নির্দিষ্ট আয়ের মানুষকে ট্যাক্সের জন্য চাপ প্রয়োগ না করে, যারা ট্যাক্স দেয় না তাদের কাছ থেকে আদায়ের ব্যবস্হা করতে হবে। তবে কাউকে অহেতুক হয়রানি করা উচিত নয়।

ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে অর্থনৈতিক ফ্রেমওয়ার্ক করা দরকার উল্লেখ করে ড. সাদিক আহমেদ বলেন, ট্যাক্স আদায় পদ্ধতি সহজ করতে হবে। এজন্য যেসব ফর্ম আছে তা সংক্ষিপ্ত করতে হবে। আর উন্নত দেশের মতো ডিজিটাল ও কম্পিউটারাইজড পদ্ধতি ব্যবহার শুরু করতে হবে। সেখানে ‘সেল্ফ অ্যাসেসমেন্ট’-এর ব্যবস্হা থাকবে। অডিটকে সিলেকটিভ এবং প্রোডাক্টিভ করতে হলে কম্পিউটার প্রোগ্রামের বিভিন্ন ইন্ডিকেটর থাকবে যেগুলোর মাধ্যমে অডিটের সঠিকতা যাচাই হবে। এখনকার মতো সবাইকে হয়রানি করা বন্ধ করতে হবে।

বড় প্রকল্প বিষয়ে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, বর্তমানে দেশে অনেক বড় বড় প্রকল্প চলছে। এটা বেশ ভালো। তবে প্রকল্প সম্পন্ন করতে দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে। প্রকল্প শুরুর সময় যে সময়সীমা দেওয়া হচ্ছে শেষ হতে আরো বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। তাই সঠিক সময়ে শেষ করার জন্য সময়সীমা একেবারে নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। ভালো কোম্পানিকে কাজ দিতে হবে। বাজেট বাড়াতে হবে।

দেশের কৃষি খাত খুব ভালো করছে উল্লেখ করে সাদিক আহমেদ বলেন, দেশের কৃষি উত্পাদন বাড়ছে। টেকসই উন্নয়নের জন্য এ খাত ভূমিকা রাখছে। সরকার কৃষি খাতে অনেক ধরনের প্রকল্প দিয়ে কৃষকদের সাহাঘ্য করছে। এখন কৃষিপণ্য রফতানি করার দিকে সরকারকে নজর দিতে হবে।

আর্থিক ব্যবস্হাপনা ঠিক না থাকায় শ্রীলঙ্কার বর্তমানে যে সংকট শুরু হয়েছে সেখান থেকে বাংলাদেশের কোনো শিক্ষা নেওয়ার বিষয় আছে কি না- এমন প্রশ্নের উত্তরে ড. সাদিক ইত্তেফাককে বলেন, বাংলাদেশের এখনই কোনো রিস্ক নেই। তাদের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্হা অনেক ভালো। এখনই ভয় পাওয়ার কোনো পরিস্থিতি নেই। তবে দীর্ঘ মেয়াদে এখান থেকে শিক্ষা নেওয়ার রয়েছে। আমাদেরকে সচেতন হতে হবে। বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্হাপনায় বাংলাদেশ ভালো অবস্হায় রয়েছে। দেশের মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) তুলনায় বৈদেশিক ঋণের পরিমাণও উদ্বেগজনক নয়। বিপরীতে অভ্যন্তরীণ ঋণব্যবস্হায় বাংলাদেশ কিছুটা খারাপ অবস্হায় রয়েছে। সঞ্চয়পত্র থেকে উচ্চ সুদের বিনিময়ে ঋণ নিচ্ছে সরকার। এজন্য সরকারকে গুণতে হচ্ছে ১১ থেকে ১৩ শতাংশ সুদ। সঞ্চয়পত্র থেকে না নিয়ে ব্যাংক বা বন্ড থেকে নিলে প্রায় অর্ধেক খরচে এ ঋণ নেওয়া যেত।

যখনই সঞ্চপত্র থেকে ঋণ নেওয়ার কথা উঠে তখনই সামাজিক নিরাপত্তার কথা বলা হয়। তবে আসল বিষয় হলো সরকার যে সঞ্চয়পত্রে এত টাকা দিচ্ছে তার সুবিধা গরিবরা পায় না। এজন্য সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও তা খুব বেশি কাজে আসে না। তাই সঞ্চয়পত্রকে সামাজিক নিরাপত্তার টুলস (সরঞ্জাম) হিসাবে দেখা ঠিক না বলে তিনি মনে করেন। তিনি আরো বলেন, সঞ্চয়পত্রের ওপর জোর না দিয়ে ন্যাশনাল সোশ্যাল সিকিউরিটি স্ট্রাটেজির (এনএসএসএস) ইমপ্লিমেন্টেশনের ওপর আরো গভীরভাবে মনোযোগ দিতে হবে।

রফতানি বহুমুখীকরণের বিষয়ে জোর দিতে হবে বলে মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে রফতানির গন্তব্য ও পণ্য দুই দিকেই জোর দিতে হবে। করোনার মধ্যে গার্মেন্টস শিল্পপণ্য রফতানি করে যে আয় সেটা আমাদের দেশের জন্য বিরাট বড় অর্জন। এ খাত থেকে আয় না হলে সার্বিক রফতানি আয় কমে যেত। এজন্য আমেরিকা ও ইউরোপের বাইরের বাজারে এসব পণ্য রফতানির উদ্যোগ জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি অন্যান্য পণ্য রফতানি বাড়ানোর কাজ এগিয়ে নিতে হবে।

অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানির জন্য দেশীয় উত্পাদন বাড়াতে হবে। আর এজন্য আমাদের অবকাঠামো, বন্দর, শ্রমিক সমস্যার সমাধান করতে হবে। এছাড়া ব্যবসার খরচ কমানো ও দেশের ব্র্যান্ড ইমেজকে আরো শক্তিশালী করার কাজ করতে হবে।

ইত্তেফাক/বিএএফ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

বিশেষ সংবাদ

ডলারের সংকট মোকাবিলায় এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে 

হজযাত্রীদের জন্য আজ খোলা কিছু ব্যাংক

বিশেষ সংবাদ

নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছেই

জাহাজ নির্মাণশিল্পে স্বল্প সুদে ২ হাজার কোটি টাকার তহবিল

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

রেমিট্যান্সে প্রণোদনা ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব

স্বস্তি ফিরলো শেয়ারবাজারে বেড়েছে সূচক ও লেনদেন

স্বর্ণের দাম ভরিতে ২ হাজার ৯১৬ টাকা কমলো 

দেশে প্রথম বার ব্রোকারেজ ব্যবসায় আসছে শ্রীলঙ্কান কোম্পানি