সোমবার, ২৩ মে ২০২২, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বছরে ৮০ হাজার হেক্টর জমি চলে যাচ্ছে অকৃষি খাতে

আপডেট : ১৪ মে ২০২২, ০৬:৩০

পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ এখনো কৃষি নির্ভর। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো নির্ধারিত হয়ে থাকে কৃষির উৎপাদনের হ্রাস-বৃদ্ধির উপর। কিন্তু দিন দিন দেশের কৃষি জমি চলে যাচ্ছে অকৃষি খাতে। নতুন বসতভিটা, রাস্তা-ঘাট-অবকাঠামো নির্মাণ, ইটভাটা, কল-কারখানা, নগরায়ণে অধিগ্রহনেই ভূমির অবক্ষয় হচ্ছে বেশি। 

বর্তমান হারে ভূমি অবক্ষয় চলতে থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে কোনো কৃষি জমি থাকবে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে পরিবেশ অধিদফতর। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদফতর একটি কর্মশালার আয়োজন করেছিল। 

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন বলেন, ভূমিকে অবক্ষয়ের হাত থেকে বাঁচাতে হবে। বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৬৯ হাজার হেক্টর আবাদি জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে।

ঐ অনুষ্ঠানে পরিবেশ অধিদফতরের তৎকালীন মহাপরিচালক বলেন, প্রতি বছর বাংলাদেশে ১ শতাংশ হারে কৃষি জমি নষ্ট হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে কোন কৃষি জমি থাকবে না। জনসংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে না জমি। সব চাপ পড়ছে কৃষি জমির ওপর। 

বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ২ কোটি ১ লাখ ৫৭ হাজার একর বা ৮০ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর। মোট জনসংখ্যা আনুমানিক ১৮ কোটি হিসেবে, মাথাপিছু আবাদি জমির পরিমাণ দাঁড়ায় শূন্য দশমিক ৪৪ হেক্টরে। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট নির্মাণসহ নানা কারণে প্রতিবছর দেশের প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। 

অর্থাৎ প্রতিবছরই এদেশ থেকে ১ শতাংশ হারে কৃষিজমি হারিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন কমছে প্রায় ২১৯ হেক্টর আবাদি জমি। পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং কৃষি বিভাগের হিসাব মতে, প্রতি বছর দেশের কৃষি জমির পরিমাণ কমছে ৬৮ হাজার ৭০০ হেক্টর, অর্থাৎ প্রতি বছর শতকরা এক ভাগ হিসাবে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ কমে যাছে।

সরকারের গবেষণা প্রতিষ্ঠান মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইন্সটিটিউটের (এসআরডিআই) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের কৃষিজমি বিলুপ্তির প্রবণতা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়,  ২০০০ সাল পরবর্তী ১২ বছরে দেশে প্রতিবছর ৬৮ হাজার ৭৬০ হেক্টর আবাদি জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ কাজের কারণে প্রতিবছর ৩ হাজার হেক্টর জমি বিলীন হচ্ছে। জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি ২০১০’ এবং ‘কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি জোনিং আইন ২০১০’ অনুসারে কৃষিজমি কৃষিকাজ ব্যতীত অন্যকোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না। কোনো কৃষিজমি ভরাট করে বাড়িঘর, শিল্প-কারখানা, ইটভাটা বা অন্যকোন অকৃষি স্থাপনা কোনোভাবেই নির্মাণ করা যাবে না উল্লেখ করে একটি নামেমাত্র আইন আছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়,১৯৮২-৮৩ সালে বাংলাদেশে প্রকৃত ফসলি জমি ছিলো ৯.১৫ মিলিয়ন হেক্টর। ২০১৭-১৮ সালে ফসলি জমির পরিমান কমে দাঁড়িয়েছে ৮.০২ মিলিয়ন হেক্টরে। দেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৬৯,০০০ হেক্টর আবাদী জমি অকৃষি কাজে ব্যবহারের জন্য চলে যাচ্ছে। উচ্চহারে জনসংখ্যা ও তাদের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে মাথাপিছু জমির পরিমাণ হ্রাসের জন্য কৃষি, বন ও জলাভূমির পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর অফিসের তথ্য থেকে জানা যায়, দেশের মোট ভূমির মধ্যে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ এখন ৭৯ দশমিক ৪৬ লক্ষ হেক্টর। আর এর ৫৩ শতাংশ-ই দুই বা তিন ফসলি জমি। তবে অবকাঠামো নির্মাণ, ইটভাটা, কল-কারখানার জন্য ভূমি অধিগ্রহণ এবং নতুন নতুন বসতভিটা বাড়ার কারণে প্রথমেই অধিগ্রহণ হচ্ছে কৃষি জমি।

বেসরকারি পর্যায়ে গবেষকরা বলছেন, সেচের আওয়তায় চাষাবাদের জমি ৭৪ লাখ ৪৮ হাজার হেক্টর। ফসলের নিবিড়তা ১৯৪ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ধানের উৎপাদন হয়েছিল ৩ কোটি ৬৬ লাখ ৩৮ হাজার টন। একই অর্থবছরে মোট দানাদার ফসলের উৎপাদন ছিল ৪ কোটি ৩০ লাখ ৩৬ হাজার টন। আর ২০২০-২১ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়ায় ৪ কোটি ৬৬ লাখ ৩৫ হাজার টন ।

ভূমি জরিপ বিভাগের তথ্য মতে ১৯৭১ সালে আমাদের আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ২ কোটি ১৭ লাখ হেক্টর। যা বর্তমানে এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮১ লাখ ৫৮ হাজার হেক্টরে।১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৯০ লাখ। ২০০০ সালে ১৩ কোটি এবং বর্তমানে ১৮ কোটিতে এসে দাঁড়িয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে রাজশাহী বিভাগে ১৫ হাজার ৯৪৫ হেক্টর, ঢাকায় ১৫ হাজার ১৩১ হেক্টর, খুলনায় ১১ হাজার ৯৬ হেক্টর, রংপুরে ৮ হাজার ৭৮১ হেক্টর, বরিশালে ৬ হাজার ৬৬১ হেক্টর জমি প্রতিবছর অকৃষি জমিতে পরিণত হচ্ছে। চট্টগ্রাম বিভাগে প্রতিবছর ১৭ হাজার ৯৬৮ হেক্টর জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে।

এদিকে গত ৩১ মার্চ কৃষি জমি অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করলে ৩ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রেখে একটি বেসরকারি বিল সংসদ গ্রহণ করেছে। এই আইন কার্যকর হলে কেউ কৃষি জমি অকৃষি কাজে ব্যবহার করলে অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এমন বিধান রাখা হয়েছে। বিলটি উত্থাপনের পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে প্রেরণ করা হয়। উত্থাপিত আইনটি কৃষি জমি (যথাযথ ব্যবহার ও সংরক্ষণ) আইন-২০২২ নামে অভিহিত করা হয়েছে। 

বিশিষ্ট নগরপরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, কৃষিজমি রক্ষা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই আমি মনেকরি জমির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সবার আগে জাতীয় ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা ও নীতিমালা জরুরী।এদিকে কৃষি অধিদপ্তর ও ভূমি জরিপ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে কৃষি জমির পরিমাণ যে হারে কমছে, তাতে অচিরেই কৃষির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। যদিও স্বাধীনতার ৫০ বছর পর বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে, খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে ৩ গুণ। 

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

‘আইনের কঠোর প্রয়োগে তামাকপণ্য নিয়ন্ত্রণে আনা হবে’

অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

গবেষণা

‘কম ক্ষতিগ্রস্ত মুদ্রার তালিকায় বিশ্বে ২য় স্থানে বাংলাদেশের টাকা’

হাজী সেলিমের জামিন নামঞ্জুর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

‘কৃষি-খাদ্য সুরক্ষা চর্চাগুলো অন্যান্য দেশের সঙ্গে ভাগ করে নিতে প্রস্তুত বাংলাদেশ’

নির্যাতনের শিকার সেই তরুণীকে ফেরত পাঠালো ভারত

বিশেষ সংবাদ

প্রতিরোধে সচেতনতার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

বিশেষ সংবাদ

মোটরসাইকেল চালাতে নিরুৎসাহিত করছে বিআরটিএ