রোববার, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২২ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

কলকাতায় আবাসন খাতে পি কে হালদারের বিপুল বিনিয়োগ!

আপডেট : ১৭ মে ২০২২, ০৯:০২

গ্রেফতারের পর এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) রিমান্ডে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিচ্ছেন প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পি কে হালদার। গত রবিবার রাতভর এবং সোমবার (১৬ মে) দিনভর জেরায় উঠে এসেছে কলকাতাসংলগ্ন রাজারহাট, নিউটাউনে পি কের বিপুল বিনিয়োগের কথা। যা শুনে রীতিমতো তাজ্জব হয়ে গেছেন তদন্তকারী অফিসাররা।

প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা লোপাট ও বিদেশে পাচারের অভিযোগে গত শনিবার পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশের এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রশান্ত কুমার হালদারকে গ্রেফতার করে ভারতের আর্থিকবিষয়ক গোয়েন্দা সংস্থা ইডি। এরপর থেকে তিনি সেখানে রিমান্ডে রয়েছেন।

রিমান্ডে থাকার কারণে সোমবার পি কে হালদারকে রুটিন স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য স্থানীয় সরকারি একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর টানা জেরা চলে। হাসপাতালে যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের পি কে বলেন, ‘দেশে ফিরতে চাই।’? তাহলে বাংলাদেশ থেকে পালালেন কেন—এমন প্রশ্নের উত্তর অবশ্য তিনি দেননি।

ইডি অফিসে আলাদা কক্ষে জেরা করা হচ্ছে পি কের সঙ্গে গ্রেফতার হওয়া আরো চার জনকে। পি কে এবং অন্য চার জন যা বলছেন, তা মিলিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তদন্তকারীরা বলছেন, মাঝেমধ্যেই ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন পি কে। অন্য চার জনকে জেরার পর তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য নিয়ে পালটা চাপ দিতেই মেনে নিচ্ছেন কিছু তথ্য।

এমনই জেরা-পালটা জেরায় উঠে এসেছে কলকাতা ও সংলগ্ন অঞ্চলে পি কের রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় বিনিয়োগের কিছু তথ্য। তদন্তকারীরা সেসব তথ্য খতিয়ে দেখতে ঐসব জায়গায় অভিযান চালান। কয়েকটি জায়গায় সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন। জানা গেছে, কলকাতার উপকণ্ঠে সল্টলেক লাগোয়া রাজারহাট, নিউটাউন বর্ধিষ্ণু এলাকা। কলকাতা বিমানবন্দরের খুব কাছাকাছি হওয়ায় এই অঞ্চলে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা জমজমাট হয়ে উঠেছে। দামও চড়া। অনেকেই এই অঞ্চলে বিনিয়োগ করছেন দ্রুত কোটি কোটি টাকা উপার্জন করতে। প্রশান্ত কুমার হালদার এ রকমই কিছু রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন স্থানীয় কয়েক জনের মাধ্যমে। কয়েকটি ক্ষেত্রে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন পি কের সঙ্গে গ্রেফতার হওয়া স্বপন মৈত্র ও উত্তম মৈত্র। এরাই স্থানীয় ডেভলপারদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন।

অভিনব কৌশলে বিনিয়োগ: জানা গেছে, রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অভিনব কৌশল অবলম্বন করেছেন পি কে। কোটি টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট কিনে সেখানে তিনি নিজেকে দেখাচ্ছেন ভাড়াটিয়া হিসেবে। কৌশলটা কী? কলকাতায় সরাসরি বিনিয়োগ করতে পারেন একমাত্র ভারতীয় নাগরিকরা। বিদেশি নাগরিকরা ভাড়াটিয়া হিসেবে ফ্ল্যাট নিতে পারেন। সেটা স্বল্পমেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদি দুই ভাবেই হয়ে থাকে। ঐ এলাকায় বিনিয়োগ করে ফ্ল্যাট নিয়েছেন পি কে দীর্ঘমেয়াদি ভাড়াটিয়া হিসেবে। কারণ উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগরে স্থানীয়দের কাছে পি কে শিবশঙ্কর নামে পরিচিত হলেও সেই নামে কোনো ভারতীয় নথি তিনি তৈরি করেননি।

দীর্ঘমেয়াদি ভাড়াটিয়া হতে গেলে ফ্ল্যাটের যা দাম তার কাছাকাছি অর্থ বিনিয়োগ করে ৩০-৪০ বা ৫০ কিংবা ৯৯ বছরের জন্য লিজ নেওয়া যায়। লিজের সেই টাকা সরকারি ভাবে দেখানো হয় না। এ হিসেব জানেন শুধু ফ্ল্যাটের মালিক এবং লিজ ভাড়াটিয়া। এক্ষেত্রে মালিকের সরাসরি আর ঐ ফ্ল্যাটে বা সম্পত্তিতে অধিকার থাকে না। লিজ ভাড়াটিয়া ঐ সম্পত্তি অন্য কাউকে পুনরায় লিজ দিতে পারেন। বাজারদর অনুযায়ী মোটা অর্থের বিনিময়ে এসব হস্তান্তর হয়। হস্তান্তর বাবদ চুক্তিতে সই করার জন্য মালিক কিছু টাকা পান। সময়ের সঙ্গে এই অর্থের পরিমাণ বাড়ে।

তদন্তকারীরা বলছেন, সুচতুরভাবে নিজের টাকা লুকিয়ে রাখতে প্রশান্ত কুমার কিছু ক্ষেত্রে এই কৌশল অবলম্বন করেছেন। বহু জায়গায় এভাবে কলকাতায় সম্পত্তি করাটা তার পক্ষে অসম্ভব না। কোথায় কোথায় তিনি এভাবে সম্পত্তি করেছেন, সেটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ইত্তেফাক/এমআর