মঙ্গলবার, ২৮ জুন ২০২২, ১৪ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বই আলোচনা

বাংলা শব্দের সুলুক সন্ধানে— 

আপডেট : ২০ মে ২০২২, ০৬:৪৩

ঢাউস আকৃতির ‘বাংলার শব্দকথা’ বইটি দেখে প্রথম দর্শনেই মনে হতে পারে—এটি বোধহয় বাংলা শব্দের ওপর কোনো অভিধান-বিশেষ| কিন্তু বইটির স্বকীয়তা নিয়ে লেখক ডা. নৃপেন ভৌমিক জানাচ্ছেন—‘এটি অভিধান নয়| নিছক কৌতূহলের বশে বাঙালির অত্যন্ত পরিচিত কিছু বাংলা শব্দের উত্স সন্ধান করতে গিয়ে তাদের ব্যুত্পত্তি অনুসরণ করে এবং অর্থ পরিবর্তন অনুধাবন করে প্রাচীন বাংলার অজ্ঞাত জীবনচর্চার কিছু কিছু ইতিহাস জানতে পেরেছি|’ লেখকের এই মন্তব্যটি এ গ্রম্হের প্রবেশমুখ হিসেবে বেশ গুরুত্ব বহন করে| বাংলাভাষার বু্যত্পত্তি কিংবা এসবের সুলুকসন্ধান নিয়ে আগ্রহী পাঠকদের জন্য বইটি প্রকৃত অর্থেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে|

আমরা জানি যে, ভাষা তথা শব্দের ব্যুত্পত্তি কিংবা পরিবর্তনের সূত্র ধরে একটি অঞ্চলের ভৌগোলিক-সামাজিক-রাজনৈতিক বিশেষত নৃতাত্ত্বিক বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে| কারণ যে কোনো ভাষায় ব্যবহূত শব্দগুলো শুধুমাত্র মানুষের মুখ নিঃসৃত কিংবা উচ্চারিত কোনো ধ্বনি সমষ্টিই নয় বরং উচ্চারণকারীর পারিবারিক-সামাজিক-রাজনৈতিক নৃতাত্ত্বিক সর্বোপরি মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্টে্যর স্মারকও বটে| তাই কোনো জাতিগোষ্ঠীর ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য তথা তাদের উচ্চারিত শব্দমালার সুলুক সন্ধানের মধ্য দিয়ে সেই জাতিগোষ্ঠীর হাজার বছরের অন্দর ও বাহিরের পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে| 

ঠিক সেই জায়গা থেকে বাঙালির নৃতাত্ত্বিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে নতুনভাবে আবিষ্কার করার জন্য ডা. নৃপেন ভৌমিকের ‘বাংলার শব্দকথা’ গ্রম্হটি তাত্পর্যপূর্ণ হয়ে উঠবে| বইটি পাঠ করতে গেলেই আমরা দেখব লেখক এখানে বাংলা শব্দের উত্স সন্ধান করতে গিয়ে প্রসঙ্গক্রমে বাঙালির চারিত্রিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকেও তুলে ধরেছেন| 

বিশেষত বাঙালির ধর্ম বিশ্বাস ও লোকজীবন, তাদের সংস্কার কিংবা আচার, লোকবিশ্বাস এবং লোকাচার ইত্যাদি বিষয় বিভিন্ন শব্দের ব্যুত্পত্তির ইতিহাসের মধ্য দিয়ে বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে| উদাহরণ হিসেবে এ গ্রম্হের কলম শব্দটির ব্যুত্পত্তির ইতিহাসের কথাই ধরা যাক| লেখক জানাচ্ছেন—‘প্যানাম’ বা পালক থেকে কলমের ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘পেন’-এর উদ্ভব| এর সপক্ষে প্রমাণের কথাও বলেছেন তিনি| অনেকটা গল্পের আদলে ডা. নৃপেন ভৌমিক এই অংশে কলম সৃষ্টি বা কলমের ব্যবহারের পূর্বের ইতিহাস তুলে ধরেছেন| তিনি বঙ্গদেশে পাখির পালক দিয়ে তৈরি কলমের ব্যবহারের কথা তথা ইতিহাস তুলে ধরেছেন| 

মিশরে প্রথম চালু খাগড়ার কলম টেকসই না হলেও ব্যবহার হতো বেশি| ধারালো ছুরি দিয়ে কলম কাটা হতো বলে ফার্সিতে ছুরির আরেক নাম ‘কলমতরাশ’| বোঝা যাচ্ছে কলম কাটার ছুরি ছিল পৃথক| লেখনী অর্থে কলম শব্দটির দ্বৈত বু্যত্পত্তি পাওয়া যায় : সংস্কৃত ও আরবি| সংস্কৃত ‘কলম্ব’ শব্দ থেকে কলম এসেছে বলে অনেকে মনে করেন| আরবি ‘কলম’ শব্দের মানে ‘খাগ’ অর্থাৎ নল দিয়ে তৈরি লেখনী| মুসলিম শাসনের প্রাক্কালে প্রথমে আদালতে, পরে কথ্যভাষায় ‘কলম’ শব্দের প্রচলন ঘটে| 

এইভাবে লেখক ‘কলম’ শব্দটির ব্যুত্পত্তির ইতিহাস বর্ণনার পাশাপাশি আধুনিক কলম সৃষ্টির ইতিহাসও তুলে ধরেছেন| তিনি স্মরণ করেছেন জোসেফ ব্রাহামের কথা, যিনি ১৮০৯ খ্রিষ্টাব্দে মোড়ক বিশিষ্ট ফাউন্টেন পেন তৈরি করেন| এই উদাহরণটির প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরার অর্থ এই যে, মূলত ডা. নৃপেন ভৌমিক এ গ্রম্হে একে একে অনুসন্ধান করেছেন বাঙালির ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র, বাসনকোসন, খাবারদাবার, পিঠাপুলি, মন্ডামিঠাই অর্থাৎ বাঙালির লোকজীবন ও লোক-ঐতিহ্যের নানান শব্দ| সেইসঙ্গে বাংলার কৃষিভিত্তিক জীবন, যানবাহন ব্যবস্হা থেকে শুরু করে আরো অসংখ্য বিষয় সচিত্রভাবে স্হান পেয়েছে এ গ্রম্হে| শুধু স্হান পাওয়াই নয়, পাঠকের জন্য বাড়তি পাওয়া—সংশ্লিষ্ট শব্দগুলোর জন্মকথা ও বিবর্তনের ইতিহাস| ফলে গ্রম্হটি বাংলা শব্দের সুলুক সন্ধানী গ্রম্হ হিসেবে বিবেচিত হবে|

‘বাংলার শব্দকথা’
ডা. নৃপেন ভৌমিক
প্রকাশক: অবসর প্রকাশনা সংস্হা
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ
মূল্য: ১২০০ টাকা

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

পাশের সিটের মেয়েটি

গ্রেট মাইন্ড থিংক অ্যালাইক

রামমোহন ও উপমহাদেশে পারস্যচর্চা

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

ইতিহাসের স্মারক

‘বন্ধ কোরো না পাখা’

মেনোপজ

রবীন্দ্রনাথ ও যাযাবর