শনিবার, ১৩ আগস্ট ২০২২, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

রুটি-পরোটাসহ সব বেকারি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বিপাকে মানুষ 

আপডেট : ২১ মে ২০২২, ০২:২০

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পণ্য পরিবেশক হিসেবে কাজ করেন কবির হোসেন। প্রতিদিন সকাল ৮টায় বাসা থেকে বের হয়ে সেই প্রতিষ্ঠানের গুদাম থেকে পণ্য নিয়ে বাজারে বাজারে ডেলিভারি দেন। কাজ শেষে বাসায় ফিরতে ফিরতে কোনোদিন রাত ৮টা, আবার কোনোদিন ১০টাও বাজে। বেশির ভাগ সময় তিনি সকালের নাস্তা ও দুপুরের খাবার বাইরেই কোনো হোটেলে খেয়ে নেন। কিন্তু হঠাৎ করেই তিনি বেশ অস্বস্তিতে পড়েছেন। 

কারণ নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দাম বাড়ায়, বিশেষ করে তেল, আটা, ময়দার দাম লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকায় বাইরে তার দুই বেলা খাবারের জন্য যে বরাদ্দ তাতে তিনি পেরে উঠছেন না। শুধু কবির হোসেন নন, তার মতো অনেকেই যাদের  কাজের জন্য বাইরে খেতে হয়, তারা বেশ বিপাকে পড়েছেন। আটা, ময়দার দাম বাড়ার প্রভাবে রুটি, পরোটা থেকে শুরু করে কেক, পাউরুটি, বিস্কুট, চানাচুর, নুডলস, ফাস্ট ফুডসহ বেকারি পণ্যের সব খাবারের দাম বেড়েছে। ফলে বাজেট ঠিক রাখতে হোটেলে খেতে বসে হিসেব করতে হচ্ছে।

উল্লেখ্য, বিশ্বে গম রপ্তানির প্রধান তিনটি দেশ রাশিয়া, ইউক্রেন ও ভারত গম রপ্তানি বন্ধ করায় এর প্রভাব পড়েছে দেশের আটা-ময়দার বাজারে। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য দুটির দাম। গতকাল শুক্রবারও আরেক দফা বেড়েছে আটা, ময়দার দাম। এ নিয়ে গত এক মাসের ব্যবধানে দাম বাড়ল তিন বার।

গতকাল রাজধানীর খুচরাবাজারে প্রতি কেজি খোলা সাদা আটা ৪৬ থেকে ৫০ টাকা, প্যাকেট আটা ৪৮ থেকে ৫০ টাকা, খোলা ময়দা ৫৮ থেকে ৬০ টাকা ও প্যাকেট ময়দা ৬৫ থেকে ৬৮ টাকায় বিক্রি হয়। সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) গতকাল তাদের বাজারদরের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এক মাসের ব্যবধানে প্রতি কেজি খোলা আটার দাম ৩১ দশমিক ৫১ শতাংশ, প্যাকেট আটার দাম ১২ দশমিক ৬৪ শতাংশ, খোলা ময়দার দাম ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ ও প্যাকেট ময়দার দাম ১৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেড়েছে। সরকারের এ সংস্থাটি জানিয়েছে, এক বছর আগে দেশের বাজারে প্রতি কেজি খোলা আটা ৩০ থেকে ৩২ টাকা, প্যাকেট আটা ৩২ থেকে ৩৫ টাকা, খোলা ময়দা ৩৫ থেকে ৩৬ টাকা ও প্যাকেট ময়দা ৪২ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এ হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে প্রতি কেজি আটা, ময়দায় ১৬ থেকে ২৮ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। যদিও খুচরা বাজারে দাম বেড়েছে আরো বেশি। আর এর প্রভাবে হোটেল-রেস্তোরাঁয় সব বেকারি পণ্যের দামও বেড়েছে।

গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁয় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, আটা, ময়দার তৈরি প্রায় সব পণ্যের দামই বেড়েছে। অনেক হোটেল তাদের খাবারের তালিকাতে পণ্যের আগের দাম কেটে নতুন দাম লিখে দিয়েছে। আগে যে পরোটা বিক্রি হতো ৫ টাকায়, তা এখন ১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আবার আগে ১০ টাকায় পাতলা নান রুটি পাওয়া গেলেও এখন তা ২০ টাকায় আর স্পেশাল নান রুটি ৫ টাকা বাড়িয়ে ২৫ টাকা করা হয়েছে। শুধু রুটি, পরোটাই নয়, অন্যান্য বেকারি পণ্যের দামও বেড়েছে। বিস্কুট, চানাচুর, কেক, বার্গার, পিত্জা, ভেজিটেবল রোল, চিকেন রোল, সিঙ্গারা সব কিছুর দামই বেড়েছে।

ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডে একসঙ্গে অনেকগুলো বাকরখানির দোকান। করোনার সময় গত দুই বছর তাদের ব্যবসা একরকম মন্দা গেছে। এখন যখন ব্যবসা আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল তখনই আটা, ময়দার দাম বাড়ায় আরেকটা আঘাত এসে পড়ল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বাখরখানির দোকানের স্বত্বাধিকারী বলেন, দাম বাড়ালে ক্রেতা কমে যায়। আবার আটা, ময়দার দাম বাড়ায় আমরা যদি পণ্যের দাম না বাড়াই তাহলেতো টিকে থাকতে পারব না। মানভেদে প্রতি কেজি বাকরখানিতে ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। আগে যে বাকরখানির কেজি ছিল ১৬০ টাকা, তা এখন ১৮০ টাকা করা হয়েছে।

রাজধানীর কাওরানবাজারের হোটেলগুলো অধিকাংশ সময়ই ক্রেতায় প্রায় ভর্তি থাকে। এই বাজারের ক্যাফে সৌদিয়া রেস্তোরাঁর ম্যানেজার মো. শাকিল বলেন, আটা, ময়দার দাম বাড়ায় রুটি, পরোটার দাম বাড়ানো হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে ভাতের দামও। তিনি বলেন, আগে একটি তন্দুর রুটি, পরোটা ৫ টাকা বিক্রি করলেও এখন তা বাড়িয়ে ১০ টাকা করা হয়েছে। স্পেশাল নানরুটি আগে ১৫ টাকা ছিল, এখন ২৫ টাকা করা হয়েছে। তিনি বলেন, বাজারে তেল, আটা, ময়দা, চালের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে তো আমাদের না বাড়িয়ে উপায় নেই।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গত ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলার পর দেশ দুটি থেকে আর গম আমদানি করা যায়নি। এরপর দেশের ব্যবসায়ীরা গম আমদানিতে ভারতমুখী হলেও এখন দেশটিও গম রপ্তানি বন্ধ করেছে। যদিও সম্প্রতি ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে গম রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার কথা বলেছে। তারা জানিয়েছে, গমের যেসব চালান পরীক্ষার জন্য কাস্টমসের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং ১৩ মে বা এর আগে তাদের কাছে নিবন্ধিত হয়েছে, এ ধরনের চালানগুলো রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হবে।

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছে, দেশে বছরে ৭৫ লাখ টন গমের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে ১১ লাখ টন গম দেশে উৎপাদিত হয়। বাকিটা আমদানি করা হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে দেশে মোট গম আমদানির ৬৩ শতাংশ, কানাডা থেকে ১৮ শতাংশ ও বাকিটা অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি করা হয়। তবে গত ২০২০-২০২১ অর্থবছরে ভারত থেকে গম আমদানি বেড়েছে। এই সময়ে মোট গম আমদানির ৪৫ শতাংশ রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে, কানাডা থেকে ২৩ শতাংশ, ভারত থেকে ১৭ শতাংশ আমদানি করা হয়। বাকিটা অন্য দেশগুলো থেকে আমদানি করা হয়। কিন্তু হঠাৎ করে রাশিয়া, ইউক্রেন ও ভারত গম রপ্তানি বন্ধ করায় বিপাকে পড়েছে বাংলাদেশ। কারণ এই তিনটি দেশ থেকেই বাংলাদেশ তার গমের চাহিদার বড় অংশ আমদানি করে থাকে। ফলে দেশের বাজারে দ্রুতই এর প্রভাব পড়েছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্র বলেছে, ভারত গম রপ্তানি বন্ধ করলেও সরকারি পর্যায়ে গম আমদানির বিষয়ে কথা চলছে। এরই মধ্যে ৩ লাখ টন গম আমদানির জন্য ভারতের সঙ্গে চুক্তিও করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, রাশিয়া, ইউক্রেন ও ভারত গম রপ্তানি বন্ধ করলেও সরকার আরো পাঁচটি দেশ থেকে গম আমদানির পথ খুঁজছে। ইতিমধ্যে কানাডার হাইকমিশনারের সঙ্গে গম আমদানির বিষয়ে কথা হয়েছে। এ ছাড়া ভারত আমাদের গম দেবে। তাই গম নিয়ে কোনো ধরনের সমস্যা হবে না। খুব শিগগিরি এসব পণ্যের দাম কমে আসবে। 

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

হারিকেন ধরা বিএনপিকে হয়তো হারিকেন দিয়েও খুঁজে পাওয়া যাবে না: তথ্যমন্ত্রী

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ব্যাখ্যা সম্পর্কে যা বললেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব

শিশুর অধিকার ও সুরক্ষায় পদক্ষেপ নিবে সরকার: আইনমন্ত্রী

যে এলাকায় যেদিন বন্ধ থাকবে শিল্পকারখানা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

ডেঙ্গুতে নতুন শনাক্ত ৯০, মৃত্যু ১

সুইস ব্যাংকের টাকার বিষয়ে তথ্য না চাওয়ার কারণ জানতে চেয়েছেন হাইকোর্ট

শিশুদের করোনার টিকাদান কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা

সরকারি ওষুধ বিক্রি করলে ১০ বছরের কারাদণ্ড