শুক্রবার, ১৯ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

উজানের জেলাগুলোতে ধেয়ে আসছে বন্যা

আপডেট : ২১ মে ২০২২, ০৯:৩৩

উজানের পাহাড়ি ঢল আর টানা ভারী বর্ষণে সুরমা, কুশিয়ারার পর এবার পদ্মা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধলেশ্বরীসহ দেশের ৮১টি নদীর পানি বাড়ছে উদ্বেগজনকহারে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র আগামী তিন-চার দিনের মধ্যে উত্তরের উজানের জেলাগুলোতেও বন্যার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, নদীগুলোর ধারণক্ষমতা অস্বাভাবিক কমে যাওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। 

সপ্তাহ ধরে বন্যায় সিলেট-সুনামগঞ্জসহ দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি জেলার মানুষ পানিতে ভাসছেন। সেখানে তলিয়ে গেছে বসতভিটা, সড়ক, শিক্ষাঙ্গন ও ফসলের মাঠসহ লোকালয়। গত দেড় যুগেও এমন ভয়াবহ বন্যা দেখেনি সিলেটের মানুষ। দুদিনে পদ্মা ও যমুনার পানি বেড়েছে ১০০ সেন্টিমিটার। ফলে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে ফেরি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। জামালপুরে উজানের ঢলে বাঁধে ধস দেখা দিয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান ভুঁইয়া বলেন, আমাদের পর্যবেক্ষণ ১০৯টি পানি সমতল স্টেশনের মধ্যে ৮১টি স্টেশনে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। উত্তরাঞ্চলের লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম জেলা রয়েছে। এই জেলাগুলো খুব স্বল্প মেয়াদে বন্যার কবলে পড়ার আশঙ্কা আছে আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, একদিকে ড্রেজিংয়ের অভাবে নদীগুলো পলিতে ভরে গেছে। 

অন্যদিকে দখলদারদের দৌরাত্মে্য হয়ে গেছে ভরাট। ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান ভুঁইয়া বলেন, উজান থেকে যে পানিটা আসছে অতীতের তুলনায় এখন নদীগুলো অর্ধেক পরিমাণ পানি ধারণক্ষমতার মধ্যে আসলেই সেটা দুই কূল উপচে বিপত্সীমা অতিক্রম করে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি করছে। নদ-নদীর ধারণক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ড্রেজিং প্রয়োজন। এদিকে পদ্মা ও যমুনা নদীতে হঠাৎ পানি বাড়ায় রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া এবং মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া নৌপথে ফেরিতে যানবাহন পারাপার ব্যাহত হচ্ছে। 

পদ্মায় অস্বাভাবিক পানি বাড়ায় দৌলতদিয়ার ৪ ও ৫ নম্বর ঘাট তলিয়ে বন্ধ হয়ে যায় বৃহস্পতিবার রাত থেকে। পাটুরিয়া প্রান্তে একটি ঘাট সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ ছিল। এতে দৌলতদিয়া প্রান্তে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। তবে ২, ৩ ও ৭ নম্বর ঘাট দিয়ে যান পার করা হয় সে সময়। ভোগান্তিতে পড়তে হয় যাত্রীদের।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন  (বিআইডব্লিউটিসি) আরিচা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার থেকে পদ্মা ও যমুনা নদীতে অস্বাভাবিক গতিতে পানি বাড়ছে। রাতের মধ্যে অস্বাভাবিক গতিতে পানি বাড়ায় দৌলতদিয়ায় চারটি ঘাটের মধ্যে ৪ এবং ৫ নম্বর ঘাটের পন্টুনের র্যাম তলিয়ে যায়। তাই গতকাল শুক্রবার ভোর থেকে ঘাট দুটি দিয়ে যানবাহন পারাপার বন্ধ ছিল। পাটুরিয়া প্রান্তে সব কটি (চারটি) ঘাটের পন্টুনের  মাথা তলিয়ে গেলেও ঝুঁকিপূর্ণভাবে ফেরিতে গাড়ি ওঠানামা অব্যাহত আছে। 

বিআইডব্লিউটিসির আরিচা কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (মেরিন) আবদুস সাত্তার বলেন, গত দুই দিনে প্রায় ১০০ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে। হঠাৎ পদ্মা ও যমুনা নদীতে অস্বাভাবিক গতিতে পানি বাড়ায় দৌলতদিয়া ও পাটুরিয়া ঘাটের অধিকাংশ ঘাটের র‍্যামে মাথা তলিয়ে গেছে। প্রায় ১৬ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর দৌলতদিয়ার দুটি ফেরিঘাট আবার চালু হয়েছে। 

বিআইডব্লিউটিসির দৌলতদিয়া ঘাটের ব্যবস্থাপক প্রফুল্ল চৌহান জানান, গতকাল শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে ঘাট দুটি চালু হয়। বিকাল ৩টার দিকে ঘাট দুটি সংস্কারের কাজ শুরু করে বিআইডব্লিউটিএ। দেড় ঘণ্টার চেষ্টায় রেকার দিয়ে র‍্যাম টেনে তুলে ঘাট দুটি স্বাভাবিক করা হয়। ঘাট এলাকায় যেসব যান পারের অপেক্ষায় রয়েছে তা দ্রুত পার করার চেষ্টা চলছে। এ রুটে ছোট-বড় মিলে ১৮টি ফেরি দিয়ে যান পার করা হচ্ছে। পানি বাড়ার কারণে ৬ নম্বর ঘাটটি চালু করা হয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, গতকাল শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগের ৯টি পয়েন্টে মোট ৬৯৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। কুশিয়ারা বিপত্সীমার ১৭৫ ও সুরমা নদী ১১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীতে ১৩৯ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্রে ১০৬ সেন্টিমিটার, তিস্তায় ৫০ সেন্টিমিটার, ধলেশ্বরীতে ৮১ সেন্টিমিটারসহ নতুন করে ৮১টি নদীর পানি বেড়েছে উদ্বেগজনকভাবে। আর এতে উত্তরের জেলাগুলোতে আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জামালপুরে উজানের ঢলে বাঁধে ধস: পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জামালপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবু সাঈদ জানান, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জামালপুরে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। সবশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্ট পানি বেড়েছে ৭৪ সেন্টিমিটার। জেলার ইসলামপুর কুলকান্দি হার্ড পয়েন্টের বাম তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের বাঁধের ৩০ মিটার অংশে ধস নামে। এতে ভাঙনের মুখে পড়েছে স্কুল, মাদরাসাসহ নদীর তীরবর্তী এলাকা। 

তিনি বলেন, ভারতের আসাম ও মেঘালয়ে অতিবৃষ্টির কারণে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। নদীর গতি-প্রকৃতিও পরিবর্তন হয়েছে। ফলে এখানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। বাঁধ ধস রোধে জিওব্যাগ ড্রাম্পিং করা হচ্ছে। জায়গাটি পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী সময়ে আরো জিওব্যাগ ড্রাম্পিং করার ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানান এ প্রকৌশলী।

শিবালয় (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা বাবুল আকতার মঞ্জুর জানান, পদ্মা-যমুনার পানি গত ২৪ ঘণ্টায় আরিচা পয়েন্টে ১ দশমিক ২৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশেষ করে পাটুরিয়া-আরিচা-কাজীরহাটে ফেরিঘাট এলাকা নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। এতে ফেরিতে যানবাহন লোড-আনলোড মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটে পদ্মায় প্রবল স্রোত ও উভয় ঘাটযোগে যানবাহন লোড-আনলোড বিঘ্নিত হওয়ায় যানজট সৃষ্টি হয়েছে। উথলী ফেরিসংযোগ মোড়ে ট্রাক দাঁড় করিয়ে রাখায় আরিচার দিকে প্রায় তিন কিলোমিটার যানবাহনের সারি দেখা দিয়েছে। 

পানি উন্নয়ন বোর্ড মানিকগঞ্জ উপবিভাগ নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মহীউদ্দিন জানান, গত দুই দিনের ব্যবধানে বিশেষ করে আরিচা পয়েন্টে যমুনার পানি প্রায় সোয়া মিটার বৃদ্ধি পায়। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পানি বৃদ্ধির ফলে শিবালয় উপজেলার নদী তীরবর্তীর জাফরগঞ্জ, ধুসর, বাশাইল, তেওতা, বোয়ালী উথলী, নবগ্রাম, হাজিরবাঁধা, অন্বয়পুর, নালী প্রভৃতি এলাকার চকে আবাদকৃত উঠতি বোরো ধান তলিয়ে যাচ্ছে। অনেক কৃষক নিরুপায় হয়ে আধাপাকা ধান কেটে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেক পুকুরের আবাদকৃত মাছ বেরিয়ে যাচ্ছে। এদিকে শ্রমিকসংকট ও উচ্চ মজুরির কারণে অনেক কৃষক ধান কাটা শুরু করতে পারছে না।

ভাঙ্গুড়া (পাবনা) সংবাদদাতা জানান, পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের পুঁইবিল স্লুইসগেট দিয়ে গতকাল শুক্রবার বিকালে বিল অঞ্চলের বোরো প্রকল্পে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। ফলে ৪ হাজার হেক্টর জমির পাকা ধান তলিয়ে যাবার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পুঁইবিল কৈচারকোনা বোরো স্কিমের মালিক বকুল সরকার জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় স্হানীয় গুমানি নদীর পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় স্লুইসগেটের ভাঙা অংশ দিয়ে প্রকল্পেও ভেতরে পানি যাচ্ছে। এরই মধ্যে শতাধিক বিঘা জমির পাকা ধান তলিয়ে গেছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় পানি প্রবেশের গতি আরো বেড়ে গেছে। 

পুঁইবিল গ্রামের কৃষক আব্দুল আলিম বলেন, এক দিনে গুমানি নদীর পানি প্রায় দুই হাত বৃদ্ধি পেয়েছে। রাতের মধ্যে স্লুইসগেটের পুরানো দরজা ভেঙে গেলে ইরি-বোরো প্রকল্প সয়লাব হয়ে যাবে। 

এদিকে প্রকল্পের ভেতর পানি ঢুকে পড়ার খবরে কৃষকরা ধান কাটতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। বিকালে কিছু সংখ্যক কৃষক পানির মধ্যেই ধান কাটা শুরু করেন। 

উপজেলার তারাপুর গ্রামের কৃষক সোহরাব হোসেন বলেন, খাওয়াসহ একজন শ্রমিককে ৮০০ টাকা দিন দিয়েও প্রয়োজনীয় শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। 

পাবনা পাউবির উপ-সহকারী প্রকৌশলী আলামিন বলেন, গত বৃহস্পতিবার স্লুইসগেটের দরজা বন্ধ করা হয়েছে। তবে পুরোপুরি বন্ধ না হয়ে থাকলে পানি ঢুকতে পারে। শনিবার পুনরায় চেক করা হবে বলে তিনি জানান।

ইত্তেফাক/এএইচপি