বুধবার, ২৯ জুন ২০২২, ১৫ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

জন্মবার্ষিকীর শ্রদ্ধাঞ্জলি

‘রস’ নন্দনে কাজী নজরুলের গান

আপডেট : ২৫ মে ২০২২, ০৯:১৪

সংগীতের মূল লক্ষ্য রস সৃষ্টি করা আর শ্রোতাকুল সেই রস আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে প্রাণ ভরে আস্বাদন করে। শ্রোতার মনের আনন্দ, বেদনা, সুখ, দুঃখ নানা অনুভূতির কেন্দ্রগুলোকে সংগীতের নান্দনিকতায় পরিতৃপ্তি লাভ করে। যদিও সেই সব অনুভূতি সব ক্ষেত্রে ব্যক্ত করা যায় না। শুধু অনুভবেই থেকে যায়। সৌন্দর্যতত্ত্ববিদ জগন্নাথ মানুষের মনে যে বোধগুলোকে  চমৎকারিত্ব সৃষ্টি করে তাকেই সৌন্দর্য বলে মনে করেন। চমৎকারিত্বকে ইংরেজিতে বলা হয় ইমোশনাল থ্রিল (Emotional thril)। যদিও থ্রিল শব্দটি ভিন্নার্থক ভাব প্রকাশ করে থাকে, যা এই ইমোশনাল থ্রিল থেকে আলাদা বা স্বতন্ত্র। তার মতে, এটি ‘জাতিবিশেষ’ যাকে রমণীয়তা অর্থে বলা যায় অর্থাৎ স্বতন্ত্র জাতীয় আনন্দানুভব যাকে প্রত্যক্ষ অনুমান বা প্রমাণ করা যায় না; যা সর্বজনীন অনুভবের দ্বারা অনুমেয়। রস ও ভাব দুটিই অন্তঃকরণের বৃত্তি। সংগীতজ্ঞ ভরতের মতে, রস ছাড়া সংগীতকলার কোনো সার্থকতা নেই।

সংগীত, সাহিত্য, কাব্য, চিত্র, ভাস্কর্য প্রভৃতি শিল্পকলা সৃষ্টির মূলে থাকে রস ও অলংকার ভাবনা। এ কথা বিশ্বনাথ কবিরাজ, তার ‘সাহিত্যদর্পণে’, ভোজরাজ তার ‘শৃঙ্গার প্রকাশে’, শ্রীকণ্ঠ তার ‘রসকৌমুদী’ গ্রন্থে, ভরত মুণি ‘নাট্যশাস্ত্রে’ এবং ১৭শ শতকের গুণী কবি পণ্ডিতরাজ জগন্নাথও ‘রসগঙ্গাধর’ গ্রন্থে রসের বর্ণনা করেছেন। মহাকবি কালীদাস, মাঘ, ভারতী শ্রীহর্ষ প্রভৃতি বিগদ্ধ কবিরা রস ও ভাব সম্পর্কে লাবণ্য ও সৌন্দর্যের নানা উপযোগিতার কথা স্বীকার করেছেন। সৌন্দর্য লাবণ্য কমনীয়তা কান্তিকেও বোঝায়। এসবের মূলে রয়েছে স্নিগ্ধতা ও চমত্কারিত্ব— এর দ্যুতিকেই লাবণ্য বলা হয়। কালিদাস ‘শকুন্তলা’ নাটকে শকুন্তলার অপরূপ কান্িত ও কমনীয়তার বর্ণনা করেছেন। কালিদাস লিখেছেন, ‘অসুস্থ শরীরা শকুন্তলা, অদ্যাপি লাবণ্যময়ী ছায়া তাং ন মঞ্চতি’। রূপবর্ণনায় শরীরের ক্লান্তি ও স্নিগ্ধতায় লাবণ্যেও প্রকাশ। তেমনি কাব্যে, সাহিত্যে, শিল্পে এবং সংগীতেও সৌন্দর্য ও লাবণ্যের আবেশ বিদ্যমান। কাব্যে এই চমত্কারের প্রকাশ পায় ছন্দসুষমায়, সংগীতে বিকাশ পায় স্বর ও বাণী, রাগ-রাগিণীর রস সৌন্দর্যের মাধ্যমে।

ভরতের নাট্যশাস্ত্রে স্থায়ী আটটি রস এর কথা পাওয়া যায়। শৃঙ্গার, হাস্য, করুণ, রৌদ্র, বীর, ভয়ানক, বীভৎস ও অদ্ভুত। এই আটটি রসই সংগীতের ২২টি শ্রুতি ও সাতটি স্বরে লীলায়িত। আটটি রস ছাড়াও অন্যমতে আরো একটি রস এর উল্লেখ পাওয়া যায় ‘শান্ত রস’। সংগীতের উত্স স্বর। সংগীতে ব্যবহৃত সাতটি স্বর মানুষের প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে যেমন: ষড়জ—বীর রসের, রেখাব—বিস্ময় রসের, গান্ধার—শান্ত রসের, মধ্যম—হাস্যরসের, পঞ্চম—মধু রসের, ধৈবত—বীভত্ রসের ও নিখাদ—করুণ রসের। বস্তুত রস অনুভূতির বিষয়। রসের আরো প্রকারভেদ রয়েছে।

কাজী নজরুলের গানে অঙ্গ-সৌন্দর্য, সুর বৈশিষ্ট্য, রস ভাবনা এসব বিষয় নিয়ে ভাবনার অবকাশ রয়ে গেছে। কাজী নজরুল বিচিত্রধর্মী গান রচনা করেছেন। দেশাত্মবোধক, জাগরণী, আধুনিক, মার্চ সংগীত, শ্যামাসংগীত, কীর্তন, লোকসংগীত, বাউল, সাম্পানের গান, ঝুমুর, মার্সিয়া, গীতনাট্য ইত্যাদি এই সব গানের প্রতিটির স্বতন্ত্র ভাব রসের গান। যেমন:

১. হাস্যরসের গান: ‘আমার খোকার মাসী শ্রী অমুক বালা দাসী/ মোরে দেখলেই সর্বনাসী ফেলে দিক করে এক হাসী’। গানটিতে শালির রূপ-বর্ণনা করেছেন অত্যন্ত সুন্দরভাবে এবং এক পর্যায়ে সেই শালির প্রতি দুর্বলতার ভাব প্রকাশ করা হয়েছে।
২. শৃঙ্গার রসের গান: প্রিয় এমন রাত যেন যায় না বৃথায়/ পরি চাঁপা ফুলের শাড়ি খয়ের টিপ/ জাগি বাতায়নে জাগি আঁখি প্রদীপ। আবার, মোর প্রিয়া হবে এসো রানী/ দেব খোঁপায় তারার ফুল/ কর্ণে দুলাব তৃতীয় তিথির চৈতী চাঁদের দুল।
৩. করুণ রসের গান: কেন করুণ সুরে হূদয় পুরে বাজিছে বাঁশরী/ ঘনায় গহন নীরদ সঘন নয়ন মন ভরি।
৪. বীর রসের গান: কারার ঐ লৌহ কপাট/ ভেঙে ফেল করবে লোপাট। আবার, তোরা সব জয়ধ্বনি কর ঐ নতুনের কেতন ওড়ে কাল বোশেখীর ঝড়।
৫. ভয়ানক রসের গান:গরজে গম্ভীর গগনে কুম্ভু, নাচিছে সুন্দর নাচে সয়ম্ভু।
৬. শান্ত রসের গান: দাও শৌর্য দাও ধৈর্য্য হে উদার নাথ, দাও প্রাণ।
৭. বীভৎস রসের গান: এলো রে এলো ঐ রণরঙ্গিণী/ চণ্ডী এলো রে এলো ঐ অসুর সংহারিতে বাঁচাতে উত্পীড়িতে।
৮. অদ্ভুত রসের গান: সংগীতের ক্ষেত্রে অদ্ভুত রসের গান পাওয়া যায় না। নৃত্য ও নাটকে এর প্রয়োগ রয়েছে। সংগীতে এই রস প্রস্ফুটিত করা সম্ভব নয় বলে বিশ্বাস।

ভরত মুণির নাট্যশাস্ত্রে আটটি রস এবং পরবর্তী একটি (শান্ত) রস ছাড়া সংগীতের ক্ষেত্রে আরো একটি রস এর অভাব বোধ হচ্ছে বহুকাল থেকেই তা হলো ‘ভক্তিরস’। সংগীতের একটি বৃহত্ অংশ জুড়ে রয়েছে ভক্তি ভাবাপন্ন গান। সমাজের সব ধর্মে, সব শ্রেণির ধর্মীয় সংগীত এই ভক্তি রসের ওপর নির্ভরশীল। সমাজে একটি প্রচলিত কথাই আছে ‘ভক্তিতেই মুক্তি’। সুতরাং বোঝাই যায় ‘ভক্তি’ কে কতটা উচ্চ মর্যাদার আসনে উন্নীত করা হয়েছে। ফলে যুগে যুগে এই ভক্তি রসের ওপর ভর করে রচিত হয়েছে অসংখ্য গান, পালা, লোকগাথা। কাজী নজরুল ও অসংখ্য ভক্তি রসের গান রচনা করেছেন যেমন—ভক্তিরসের গান :অন্তরে তুমি আছ চিরদিন, ওগো অন্তর্যামী/ বাহিরে বৃথাই যত খুঁজি তায় পাই না তোমারে আমি

উল্লেখ্য, কাজী নজরুলের গানে রস ভাবনা রচনা করতে এসে এই ‘ভক্তি রস’ পর্যায়ের বড় অভাব মনে করছি। এটিকে সংযুক্ত করলে সংগীতে রস ভাবনা পরিপূর্ণতা লাভ করবে বলে আমার বিশ্বাস। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের আজ জন্মবার্ষিকী। আমরা তার প্রতি জানাই শ্রদ্ধাঞ্জলি।

লেখক: নজরুলসংগীত শিল্পী ও চেয়ারম্যান, সংগীত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এসজেড