বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

আইন মানছে না অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়!

আপডেট : ২৬ মে ২০২২, ০৭:০০

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০’ মানা বাধ্যতামূলক। আর এই আইন সঠিকভাবে পালন করছে কি না, তা তদারকির জন্য রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আইনও মানছে না, পাশাপাশি ইউজিসির নির্দেশনার বেশির ভাগ অগ্রাহ্য করছে। মূলত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকদের ‘রাজনৈতিক’ প্রভাবের কারণে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাও নিতে ব্যর্থ হচ্ছে এই তদারকি প্রতিষ্ঠানটি। ফলে অনিয়ম করেও পার পেয়ে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা।

সম্প্রতি ৩০৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের মামলায় গ্রেফতার হন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাবশালী চার ট্রাস্টি। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়টির ট্রাস্টি বোর্ডের ছয় সদস্যের বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এটা অন্য ‘নিয়ম না মানা’ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবেও কাজ করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর আগেও ইউজিসির তদন্তে নর্থ সাউথের  ট্রাস্টিদের বিরুদ্ধের নানা অনিয়মের প্রমাণ মিলেছিল। সেই প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়েও। কিন্তু সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি।

দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্মকাণ্ডে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা। যেসব বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে সেগুলো তদারকি করতেই হিমশিম খাচ্ছে সরকার। অন্যদিকে এরই মধ্যে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের জন্য চলছে দৌড়ঝাঁপ। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন পেতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আরো ১০৭টি আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে একডজনের বেশি আবেদন নিয়ে কাজও শুরু হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

বর্তমানে দেশে সরকার অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ১০৮টি। ৫২টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২০১০ সালের আইন অনুযায়ী। অবশিষ্ট ৫১টির মধ্যে ২৮টি স্থায়ী ক্যাম্পাসে কার্যক্রম শুরু করেছে। বাকি ২৩টি স্থায়ী ক্যাম্পাসে যায়নি। অথচ স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার বিষয়ে আইনের বাধ্যবাধকতা আছে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য, উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও ট্রেজারার নিয়োগের বাধ্যবাধতা রয়েছে।  আইন অনুযায়ী একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা উপাচার্য। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম তত্ত্বাবধানের কাজটি তিনিই করেন। কিন্তু  প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্ব ধরে রাখতে গিয়ে উপাচার্যদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয় না অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়। আবার এ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিতেও অনাগ্রহ ট্রাস্টি বোর্ডর। শিক্ষার্থীদের মূল সনদে রাষ্ট্রপতি নিয়োগকৃত উপাচার্যের স্বাক্ষর করার বিধান থাকলেও তা হচ্ছে না।

দেশে চালু থাকা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধেকের বেশি সংখ্যকের বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অভিযোগ। ইতিমধ্যে ২৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। এর মধ্যে কয়েকটির তদন্ত শেষ হয়েছে। কয়েকটির বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকা আত্মসাৎ, জমি ক্রয়ে অনিয়ম, অননুমোদিত কোর্স পরিচালনাসহ নানা অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে। শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ভুয়া পিএইডি ডিগ্রি গ্রহণের অভিযোগ, বিদেশে টাকা পাচারের প্রমাণ মিলেছে কয়েকটি তদন্তে।

জানা গেছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ এবং ইউজিসির নির্দেশনা অমান্য করে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় কোর্স পরিচালনা করছে। এদের বিরুদ্ধে বারবার নোটিশ দিয়ে কোর্স বন্ধ করার নির্দেশ দিলেও তা অগ্রাহ্য করে আসছে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট, গবেষণা নেই। শিক্ষার্থী ভর্তিতে মানা হয় না কোনো নিয়ম। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ইচ্ছেমতো টিউশন ফি নির্ধারণ করে শিক্ষার্থীদের নানামুখী ভোগান্তিতে ফেলছে প্রতিনিয়ত। শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি নির্ধারণ এবং শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন কাঠামো ইউজিসিকে অবহিত করার কথা থাকলেও তা করে না অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্থিক হিসাব নিকাশের অডিট রিপোর্ট প্রতি বছর ইউজিসিতে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় তা জমা দেয় না।

শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী একটি গণমাধ্যমের কাছে বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে আমরা বেশকিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্ট সম্পর্কিত অনিয়মের খোঁজ ও অভিযোগ পেয়েছি। যেখানে ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোন্নয়নে কাজ করার কথা, উলটো তারাই কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, নির্দেশনা উপেক্ষা করে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা নামে-বেনামে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাভজনক পদে বসে আছেন। প্রতি মাসে বেতন/ভাতা এবং সম্মানী নিচ্ছেন। অনেক ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি নিজ পরিবারের কাজে ব্যবহার করছেন।

আইন অনুযায়ী, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষকের সংখ্যা পূর্ণকালীন শিক্ষকের এক তৃতীয়াংশের বেশি হবে না। কিন্তু দেখা যায়, কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকের সংখ্যা পূর্ণকালীন শিক্ষকের চেয়ে বেশি। এছাড়া ইউজিসিকে ভুল তথ্য দিয়ে থাকে কতিপয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টিরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬ শতাংশকে (৩ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এবং বাকি ৩ শতাংশ দরিদ্র শিক্ষার্থীদের) বিনা বেতনে পড়ানোর কথা থাকলেও অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এই নিয়ম মানে না। এ ক্ষেত্রে কৌশলের আশ্রয় নেয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। নিজস্ব আত্মীয়-স্বজনকে দরিদ্র দেখিয়ে বিনা মূল্যে পড়ানো হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আইন মানতে বাধ্য করা উচিত। আর আইনের কঠোর ধারাটিও প্রয়োগ করা উচিত। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ২০১০-এর ৩৫(৭) ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোন কারণে কোন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অচলাবস্থা দেখা দিলে কিংবা স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত ও শিক্ষার্থীদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখার স্বার্থে চ্যান্সেলর, কমিশন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সুপারিশক্রমে প্রয়োজনীয় আদেশ ও নির্দেশ দিতে পারবেন। এ বিষয়ে চ্যান্সেলরের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।’

ইত্তেফাক/ ইআ