বিসিএস ক্যাডারগুলোর মধ্যে ভারসাম্য দরকার

আপডেট : ২৮ মে ২০২২, ০৩:৪৫

সরকারি চাকরি পাওয়ার প্রধানতম মাধ্যম হচ্ছে বিসিএস পরীক্ষা। অতীতে কেবল ক্যাডার পদে নিয়োগ দেওয়ার বিধান থাকলেও এখন বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্য প্রার্থীদের মধ্য থেকে ২৬টি ক্যাডার পদে এবং যোগ্য একটি অংশকে নন-ক্যাডার পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়। আবার ক্যাডার পদগুলো কারিগরি/পেশাদার ও সাধারণ ক্যাডারে বিভক্ত। কেবল নির্দিষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীরা কারিগরি পদের জন্য আবেদন ও নিয়োগ পেতে পারেন।

কৃষি, বন, প্রকৌশল, চিকিত্সকসহ অনেক পদে পেশাদার প্রার্থীরা আবেদন করতে পারেন। অন্যরা সাধারণ ক্যাডারের জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচিত হন। প্রশাসন, পররাষ্ট্রসহ বেশ কিছু পদ সাধারণ ক্যাডার হিসেবে বিবেচিত। তবে কোনো কোনো পদে সাধারণ ও কারিগরি উভয় রকম প্রার্থীর দরকার হয়। প্রতি বছরই বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে কারিগরি ও সাধারণ ক্যাডারে নিয়োগ দেওয়া হয়। এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া যা রাষ্ট্র নিজের কাজের প্রয়োজনে দক্ষ ও যোগ্যদের মধ্য থেকে অধিকতর যোগ্যতাসম্পন্নদের নিয়োগ দিয়ে থাকে। তেমনি কারিগরি ক্যাডারের জন্য রাষ্ট্রকে উপযুক্ত প্রার্থী তৈরির জন্য অনেক ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হয়।

অতীতের তুলনায় পদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও শিক্ষার্থীদের তুলনায় সেটা কম। দেখা যায়, প্রতি পদের বিপরীতে প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় শতাধিক পরীক্ষার্থী থাকে। সেখান থেকে চূড়ান্ত নিয়োগ পান হয়তো ৩-৪ হাজার।

বিভিন্ন সময়ের বিসিএস পরীক্ষায় চূড়ান্তভাবে নিয়োগ পাওয়াদের তথ্য বিচার করলে দেখা যায় কারিগরি ক্যাডারের জন্য উপযুক্ত অনেকে সাধারণ ক্যাডারে নিয়োগ পান। তবে সাম্প্রতিক বিসিএসগুলোয় এ সংখ্যা অনেক বেড়েছে। যেমন ৩৮তম বিসিএস পরীক্ষায় প্রশাসন ক্যাডারে চাকরিতে প্রবেশ করেছেন বুয়েট, কুয়েট, রুয়েট ও চুয়েট থেকে পাশ করা ২৬০ জন। সম্প্রতি ৪০তম বিসিএস পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে সরকারি কর্ম কমিশন সরকারের কাছে নিয়োগের জন্য চূড়ান্ত সুপারিশ পেশ করেছে যেখানে প্রশাসন, পররাষ্ট্র ও পুলিশ ক্যাডারে নিয়োগের সুপারিশপ্রাপ্তদের তালিকায় সর্বোচ্চ স্হান প্রকৌশলীদের। বর্তমানে কেবল মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের নিয়ম করায় প্রকৃত মেধাবীদের সুযোগ আরো বেড়েছে। মেধাবীরা সরকারি চাকরিতে আসবেন এটা দেশের জন্য খুবই ভালো এবং তাদের কাছ থেকে আমরা অনেক ভালো সেবা পাব।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় দেখা যায়, বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রযুক্তি ও প্রকৌশল বিষয়ে আগ্রহ বেশি থাকে এবং মেধা তালিকার প্রথম সারির শিক্ষার্থীরা সহজে সেসব বিষয়ে ভর্তি হন। একই অবস্হা কৃষি ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিক্যাল কলেজে। তাদের কারণে অনেক শিক্ষার্থী পছন্দের বিষয়ে ভর্তি হতে পারেন না কিংবা ভর্তির সুযোগই পান না। অথচ তাদের একাংশ যখন পরবর্তী সময় পেশাদার পদে না গিয়ে সাধারণ ক্যাডারে চলে যান, তখন বিষয়টি নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয় বলেই মনে করি।

বিসিএসে আবেদনকারীদের পছন্দের ক্রম নিয়ে যদি কোনো তালিকা করা যায়, তাহলে দেখা যাবে অধিকাংশের পছন্দের প্রথম পাঁচটির মধ্যে হয়তো প্রশাসন, পররাষ্ট্র ও পুলিশ ক্যাডার রয়েছে। শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি আমার শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন প্রবণতা খুব বেশি। তাদের এমন প্রবণতার কারণ কী তা বুঝতে পারা খুব কঠিন কিছু নয়। এটা সত্য যে সব কারিগরি পদে আবেদনকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় পদ হয়তো সব সময় থাকে না। সেক্ষেত্রে তারা বাধ্য হয়ে সাধারণ ক্যাডারে চলে যান। তাহলে এখানে রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি বিবেচ্য। কিন্তু যদি কেউ নিজ থেকেই করেন তাহলে সেটা ব্যক্তির ভিন্ন চিন্তা হিসেবেই দেখতে হবে। তাই কারিগরি পদের উপযোগীদের মধ্যে এমন প্রবণতা আমাদের জন্য যে মোটেও ভালো বার্তা নয়, তা উপলব্ধি করতে হবে।

ক্যাডার পছন্দ করা তাদের স্বাধীনতা যা নিয়ে কিছু বলার সুযোগ নেই। কিন্তু যাদের রাষ্ট্র কোটি কোটি টাকা খরচ করে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার সুযোগ দিল, রাষ্ট্রের প্রতি তাদের কি কোনো দায়বদ্ধতা নেই? নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের নীতি বা কৌশল নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। সংগত কারণেই প্রশ্ন আসে কেন চিকিত্সক, প্রকৌশলী বা অন্য বিশেষায়িত শিক্ষায় শিক্ষিতরা তাদের নিজস্ব পেশার বাইরে অন্য ক্যাডারে যাচ্ছেন? এক জন চিকিত্সক, কৃষিবিদ বা প্রকৌশলীকে কেন পুলিশ বা প্রশাসনে কাজ করতে হবে? একটি দেশে বিভিন্ন রকম পেশা থাকে, তেমনি দরকার হয় উপযুক্ত ব্যক্তির। রাষ্ট্র সে জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে প্রকৌশল ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজসহ বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি ও যাবতীয় ব্যয় বহন করে। কেন তারা পেশাদার সেবা দেওয়ার বদলে সাধারণ ক্যাডারে চলে যাচ্ছেন?

নীতিনির্ধারকসহ সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়গুলো ভাবার দরকার আছে। কী এমন মধু যা আমাদের শিক্ষার্থীদের মানসিকতা বদলে দিচ্ছে? নিশ্চয় এর পেছনে অনেক বাস্তবতা আছে যা অবহেলা করার সুযোগ নেই। যদি বিভিন্ন ক্যাডারের মধ্যে সম্মান, সুযোগ-সুবিধা ও অন্যান্য বিষয়ে ব্যাপক ব্যবধান থাকে তাহলে শিক্ষার্থীদের মানসিকতা বদলানো খুব কঠিন। বাংলাদেশে এক জন চিকিত্সক সরকারি চাকরি না করলেও বৈধভাবে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করার সুযোগ আছে।

তেমন সুযোগ আছে আরো কিছু কারিগরি পেশায়। অথচ এক জন প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীর পক্ষে বৈধভাবে কোটি কোটি টাকা উপার্জনের সুযোগ নেই। বেতনের টাকা দিয়ে দেশে ও দেশের বাইরে বাড়ি গাড়ি করার সুযোগও নেই। অথচ সে পদগুলোতে চাকরি করার জন্য যখন অনেকেই হুমড়ি খেয়ে পড়ে তখন ভাবতে হবে কোথাও একটা গলদ আছে। আমাদের নীতিনির্ধারকদের তা চিন্তা করতেই হবে।

লেখক: শিক্ষক, সমাজকর্ম বিভাগ- শাবিপ্রবি, সিলেট।

ইত্তেফাক/বিএএফ