দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ডেকে আনতে পারে অর্থনৈতিক বিপর্যয়

আপডেট : ৩১ মে ২০২২, ১৬:২৮

করোনা ভাইরাসের রেশ কাটতে না কাটতেই একটি বড় যুদ্ধ দেখছে বিশ্ববাসী। যুদ্ধটি রাশিয়া আর ইউক্রেনের মধ্যে হলেও এর প্রভাব বিশ্বের সব মানুষের ওপর পড়ছে। যেমনটি পড়েছিল করোনার সময়। এ যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা।

যেকোনো যুদ্ধেরই একটি বৈশ্বিক প্রভাব থাকে। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবটা অনেক বেশি। কারণ বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষ খাদ্য ও জ্বালানির জন্য রাশিয়া ও ইউক্রেনের ওপর নির্ভরশীল। 

এমনিতেই করোনার সময় বিশ্ববাজার অস্থিতিশীল ছিল। আর বিভিন্ন দেশে লকডাউনের কারণে সারা বিশ্বের উৎপাদন ব্যবস্থা ও সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল। 

এই প্রভাব বাংলাদেশের ওপরও পড়ে। সম্প্রতি দেশে দ্রব্যের মূল্য বেড়েছে। দাম বাড়লে ক্রেতারা যেন বাজারের সবকিছু কিনে ফেলতে চায়। আর এই সুযোগে ব্যবসায়ীরাও দাম আরও বাড়িয়ে দেয়। ফলে আমাদের দেশে বাজারের অবস্থা যতটুকু খারাপ হওয়ার কথা তার চেয়ে অনেক বেশি খারাপ হয়। 

পেঁয়াজ, চাল, ডাল, আলু, তেল ইত্যাদি দ্রব্যের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির পর সর্বশেষ ডলারের মূল্য বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক যেখানে ডলারের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে ৮৭ টাকা ৫০ পয়সা, সেখানে ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জ ডলার বিক্রি করছে ১০২ টাকায়। বলা হচ্ছে, ডলারের চাহিদার তুলনায় জোগান কম। তাই দাম বেশি। আরও বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে, পরিবহণ খরচ বেড়েছে, অর্থাৎ মোট কথায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে। তাই পণ্য আমদানিতে বেশি পরিমাণ ডলার খরচ করতে হচ্ছে। আবার ফরেন রেমিটেন্স সে পরিমাণ আসছে না। তাই বাজারে ডলারের সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে চাহিদা ও জোগান তত্ত্বের নিয়মানুসারে ডলারের দাম বেড়ে গেছে। ঘুরিয়ে এভাবেও বলা হয়, ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমেছে। 

একদিকে নিজের টাকায় পদ্মা সেতু দেখে যেমন বুকটা ফুলে ওঠে, আরেক দিকে একবছরে ৯৮ হাজার কোটি টাকার পাচার হওয়ার সংবাদ শুনে ও রাগে ও দুঃখে আত্মাটা চুপসে যায়। মূলত আমদানি রপ্তানির কারসাজি ও হুন্ডির মাধ্যমে এই টকা পাচার করা হয় বলে কথা প্রচলিত আছে। বিদেশে তো আর টাকা যায় না, যায় সমমূল্যের ডলার। এবারের ডলারের চাহিদাবৃদ্ধি ও মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি আমার কাছে কেমন একটা খটকা লেগেছে। তাই একটু খোঁজখবর নিতে থাকলাম। বেশ ইন্টারেস্টিং কিছু বিষয় আবিষ্কার করা গেলো। আসলে ডলার নিয়েও একটি বড় বাণিজ্য হয়ে গেলো। ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জের যোগসাজশে কেউ কেউ ডলারের ব্যবসায়ে নেমে পড়েছেন। বাজার গরম থাকতে থাকতে যদি স্বল্প সময়ে কিছু কামিয়ে নেওয়া যায়! আবার নিকট ভবিষ্যতে ডলার ট্রান্সফারের ওপর সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ আসতে পারে ভেবে টাকা পাচারকারীরাও থেমে নেই। দ্রুত কাজ শেষ করতে চান তারা। কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে চান না। তাই কিনছেন ডলার। আর আমদানিকারকরা তো রয়েছেনই। সুতরাং এই ডলারের ওপর এখন অনেকের চোখ। অতএব, এত চাহিদা যার, তার দাম তো বাড়বেই। 

মানুষের চোখ যখন কোনো পণ্যের ওপর পড়ে, তার আর রক্ষা হয় না। এভাবেই চলে বাংলাদেশের বাজার। এভাবেই তৈরি হয় সংকট। আমাদের এই সংকটগুলোতে স্বাভাবিকতার চেয়ে কৃত্রিমতার প্রভাবই বেশি যা দিন দিন বেড়েই চলছে। আর সংকটে একদিকে কতিপয় মানুষ আঙুল ফুলে কলা গাছ হয়ে যাচ্ছে; অন্যদিকে বেশিরভাগ মানুষ চলে যাচ্ছে দারিদ্র্যসীমার নিচে। আয়বৈষম্য, ব্যয়বৈষম্য ও সম্পদের বৈষম্য ক্রমশ বাড়ছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সর্বোপরি মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। 

যারা আজকে ভাবছেন,  বাণিজ্যে কারসাজি করে ধন-সম্পদ কুক্ষিগত করে আরাম আয়েশে জীবন কাটাবেন তারা ভুল ভাবছেন। সুতরাং সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে চাইলে এবং সাম্য বজায় রাখতে চাইলে নিজেদের স্বার্থেই ইকো সিস্টেমটা টিকিয়ে রাখা দরকার। শুধু রাজনীতি আর অর্থনীতি বুঝলেই চলবে না; সমাজবিজ্ঞানও বুঝতে হবে।  

মোহাম্মদ আমান উল্লাহ আমান।

লেখক: উদ্যোক্তা অর্থনীতিবিদ ও গবেষক, টেকসই ব্যবসায় উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ; চেয়ারম্যান, এন্টারপ্রাইজ ৩৬০ লিমিটেড ও স্কুল অব অন্ট্রুপ্রেনিওরশীপ ডেভেলপমেন্ট।

ইত্তেফাক/এএএম