দোনেস্ক ও লুহানস্ককে স্বাধীন প্রজাতন্ত্র হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের তিন মাস অতিবাহিত হয়েছে। যুদ্ধ চলছে পুরোদমে। যুদ্ধের এই পর্যায়ে এসে সবার একটিই জিজ্ঞাসা, এখন পর্যন্ত কে জয়ী—ভ্লাদিমির পুতিন নাকি পশ্চিমা বিশ্ব?
রাশিয়ার সামরিক অভিযানের ফলে লাখ লাখ বেসামরিক নাগরিক ইউক্রেন থেকে প্রতিবেশী দেশগুলোতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। যদিও প্রতিরোধ অব্যাহত রেখেছে ইউক্রেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এখনো ক্ষমতায় রয়েছেন; অর্থাৎ কিয়েভের পতন ঘটেনি এখনো। কিছু বিশেষজ্ঞ বলছেন, এ যুদ্ধে রুশ সামরিক বাহিনী আশানুরূপ সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। তাদের মতে, বহু সৈন্য হতাহত হলেও রাশিয়ার পদক্ষেপগুলো খুব একটা কাজে দেয়নি। তবে এটা মনে রাখতে হবে, আমরা একটি ‘বিশাল’ দেশের কথা বলছি। রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে যে বিস্তীর্ণ ভূমি রয়েছে, তাকে খাটো করে দেখাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মস্কো একটি ‘বিভ্রান্তিকর’ কৌশল এঁটেছে। ইচ্ছাকৃতভাবে কিয়েভে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী করছে রাশিয়া, যাতে সকলের মনে হয়—রাজধানী কিয়েভই তাদের মূল লক্ষ্যবস্তু। যতক্ষণে সবাই এ রকমটি ভাবতে থাকবে, ততক্ষণে আগে দখল করা অঞ্চলগুলোতে রাশিয়া তার কর্তৃত্ব-ক্ষমতাকে সুসংহত করে ফেলবে। যাহোক, আমরা সবাই জানি, চলমান ইউক্রেন যুদ্ধ কেবল দুটি দেশের মধ্যকার সংঘাত নয়। এটি চিরাচরিত ভূমি দখলের লড়াইও নয়। বরং এটি একটি বিশেষ লড়াই। আসল লড়াইটা হলো রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার ন্যাটো মিত্রদের মধ্যে, যারা বার্লিন প্রাচীরের পতনের পর থেকে পূর্বাঞ্চলকে রাশিয়ার দিকে ক্রমাগত ঠেলে নিতে মরিয়া।
জয় লাভের ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে কে এগিয়ে রয়েছে—এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর খুঁজতে শুধু ইউক্রেনের বিষয়গুলোর দিকে তাকালেই হবে না। ইউক্রেন ছাড়াও আমাদের আরো কিছু বিষয়ের দিকে দৃষ্টি ঘোরাতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের দেখতে হবে—নিজের দেশে পুতিনের অবস্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ তাকে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কোণঠাসা করার চেষ্টা করা হয়েছে? পশ্চিমারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে যে আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নিয়েছে, ইতিহাসে তা নজিরবিহীন। আমি শুধু অর্থনৈতিক ব্যবস্হার কথা বলছি না। বিখ্যাত রাশিয়ান সুরকার পিওতর ইলিচ চাইকভস্কির ‘সোয়ান লেক’ ব্যালেটকে অপেরার সংগ্রহশালা থেকে অপসারণ কিংবা রাশিয়ান ক্রীড়াবিদদের প্রতিযোগিতা থেকে নিষিদ্ধ করার মতো ‘সর্বাত্মক’ কর্মকাণ্ড চালানো হয়েছে। পুতিন এবং তার দেশ রাশিয়াকে কোণঠাসা করতে সর্বপ্রকার আক্রমণাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে, এই পর্যায়ে এসে আমরা দেখতে পাচ্ছি—যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে সেগুলোর কোনোটিই পুতিনের কোনো ধরনের ক্ষতি করতে পারেনি। এমনকি তা রাশিয়ার অভ্যন্তরে অশান্তি সৃষ্টি করার জন্যও যথেষ্ট ছিল না।
রাশিয়ার অর্থনীতি বেশ মসৃণভাবে চলছে। আমদানি থমকে গেলেও জ্বালানিসমৃদ্ধ রাশিয়ার রপ্তানি রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। রাশিয়ার তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বেড়েছে। যুদ্ধের আগের তুলনায় রুবলের মান বেড়েছে, রুবল এখন অনেক বেশি শক্তিশালী। এতটা বেশি যে, রুবলের সঙ্গে অন্যান্য মুদ্রার মূল্যের বিস্তর ফারাক বেড়েছে। রুবলের বিপরীতে কোনো মুদ্রা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না বলেও মনে করা হচ্ছে।
ইউরোপের যেসব দেশ রাশিয়া থেকে গ্যাস কিনবে না বলে প্রথম দিকে ‘অটল’ ছিল, তারাও এখন নরম সুরে কথা বলছে—‘ব্যাকপেডেলিং’ করছে। এমনকি তারা ঘোষণা করেছে, তারা গ্যাস কিনতে রুবলে অর্থ প্রদান করতেও ইচ্ছুক। ‘পেট্রো-ডলার’ ভারসাম্য যা কিনা মার্কিন আধিপত্যের প্রধান উত্স, তাতেও চিড় ধরা শুরু হয়েছে। রাশিয়ায় বসবাসকারী কিছু বিশ্বস্ত সূত্র থেকে জানতে পেরেছি, দেশে কয়েকটি আমদানি পণ্য আগের মতো পাওয়া যাচ্ছে না; এছাড়া তারা তেমন কোনো বড় পার্থক্য দেখছে না। তবে এটা মানতে হবে যে, করোনা ভাইরাস মহামারির পর থেকে বিশ্বের প্রতিটি দেশকেই একই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
আরেকটি বিষয় হলো, যুদ্ধের আগের তুলনায় দেশের অভ্যন্তরে পুতিনের প্রভাব-প্রতিপত্তি বর্তমানে আরো বেড়েছে। পুতিন পশ্চিমা বিশ্বকে সামরিকভাবে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্হা সচল রাখতে পেরেছেন। এর ফলে জনগণের মধ্যে জাতীয়তাবাদের প্রতিফলন ঘটেছে, পুতিনের প্রতি রাশিয়ার জনগণের আস্থা-সমর্থন বৃদ্ধি পেয়েছে।
হ্যাঁ, আমি জানি যে, পশ্চিমা সংবাদপত্রে যেসব ছবি আঁকা হয় সেগুলোর বাস্তবতা ‘সম্পূর্ণ আলাদা’। ইউরোপীয় নেতাদের ‘হাস্যোজ্জ্বল—আনন্দময়’ ফটো ব্যবহার করে মূলত তথ্য আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। একটা বিষয়েই এটা পরিষ্কার হয়— জেলেনস্কিকে সরাসরি সাপোর্ট দিতে ইউক্রেন সফর করার মতো কোনো রিস্ক নেননি পশ্চিমা নেতাদের কেউই।
কিন্তু এসবের পরও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এই পরিস্থিতি কতদূর গড়াতে পারে? পশ্চিমা বিশ্বে জেলেনস্কির কদর বেড়েছে, পশ্চিমা জনমতের সমর্থনও পাচ্ছেন তিনি। তবে এই ‘বিভ্রান্তমূলক’ চিত্র ইউক্রেনের জনগণকে কতক্ষণ ‘অবুঝ’ রাখতে পারবে। কেননা, রাশিয়ান যুদ্ধাস্ত্রের সামনে নিক্ষিপ্ত হতে হচ্ছে তাদেরকেই। তাছাড়া ইতিমধ্যেই রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য ‘মাশুল’ গুনতে শুরু করেছেন পশ্চিমা জনগণও?
লেখক: তুর্কি সাংবাদিক
দ্য ডেইলি সাবাহ থেকে ভাষান্তর: সুমৃৎ খান সুজন।
