বৃষ্টি হচ্ছে। কার্নিসের শ্যাওলা সবুজ দেয়াল ঘেঁষে চুইয়ে পড়ছে বারিধারা। আপনি বসে আছেন জানালার গ্রিল ধরে। আপনার মন খারাপ—কোনো অতীত দিনের কথা মনে পড়ে! আপনার প্রিয় মানুষ ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ আপনার অজান্তেই এক কাপ চা হাতে আপনার পাশে এসে দাঁড়াল। আপনি অন্যমনস্কভাবেই চায়ের কাপে হাত দিয়ে বৃষ্টি আর চায়ে ডুব দিলেন।
একটু অন্যভাবে ভাবুন। যে মেয়েটিকে আপনি সারা জীবন ধরে আস্তে আস্তে বড় করে তুলেছেন আজ তার বিয়ের দিন। চারদিকে গান, বাজনা, মানুষের কলকাকলি, হইহুল্লোড়। হঠাৎ আকাশ জুড়ে মেঘ ডেকে বৃষ্টি নামছে। আপনার চোখে ভেসে উঠছে এমন বৃষ্টির দিনে ছোট্ট মেয়েটিকে নিয়ে কীভাবে দৌড়ে বেড়াতেন খোলা মাঠে, তখন মেয়েটির সদ্য বড় হওয়া চুলগুলোর যে ঝুটি তা দুলে দুলে পড়ত বৃষ্টির ফোঁটার সঙ্গে! পুতুল দিয়ে যখন প্রথম মেয়েটি ঘর বানাতে শিখেছিল, সেসময় আপনাকে এক মুহূর্ত ওর কাছ থেকে সরে যেতে দিত না! বলত—বাবা বসো, তুমিও আমার সঙ্গে ঘর বানাও! আপনি বসে থাকতেন আর দেখতেন।
কখনো কখনো বিরক্তিও অনুভব করতেন। অথচ আজ সেই মেয়েটি আপনার কাছ থেকে চলে যাচ্ছে! আপনার আত্মা জুড়ে মেঘের চেয়েও যখন কালো আঁধারের হাতছানি, তখন আপনার মেয়ে বিয়ের শাড়ি পরেই আপনার জন্য চা বানিয়ে নিয়ে এসেছে! কাঁধের ওপর হাত রেখে মেয়ে বলছে, ‘বাবা চা নাও।’ তখন চুইয়ে পড়া ভালোবাসা অনর্গল যা বলতে চাইবে তা আটকে গেলেও আপনি ভাববেন, ‘আহা জীবন!’ মনে বেজে উঠবে গান—আয় খুকু আয়...। বন্ধুদের আড্ডার সঙ্গেও চায়ের নিবিড় সম্পর্ক।
অনেক বিরক্তি নিয়ে যখন কোনো বন্ধু মন হারানোর গল্প বলতে শুরু করে, গলা শুকিয়ে চৌচির হয়ে আসে এবং এলোমেলো চুলগুলো ছিঁড়ে ফেলে হতাশা ডুবতে ইচ্ছে করে তখনও চায়ের কথাই মনে পড়ে আগে। শত্রুর মনেও হঠাৎ ভালোবাসার জন্ম দিতে পারে চা। একটা ডাক দিয়ে চায়ের আমন্ত্রণে হঠাৎ পুরোনো ভালোবাসায় ডুব দেওয়ার গল্পও কম নয়! চা-এর গুরুত্ব অর্থনীতি, সমাজনীতি, সাহিত্য, গান এবং শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। চায়ের যত্ন নিতে হবে এখন আমাদের অর্থনীতিকে বাঁচানোর জন্যই। আমাদের চায়ের ভালোবাসা ও বিপণন ভালোবেসে ছড়িয়ে দিতে পারলে আমাদেরই যে লাভ। চা শিল্প বাঁচাতে সরকার ও গবেষকরা তাদের করণীয় আরো ভালোভাবে ঠিক করবেন—এটাই প্রত্যাশা। চা দিয়ে জয় হোক ভালোবাসার।
