মামলা দিয়ে হয়রানি, সক্রিয় ১১ নারী

আপডেট : ০৫ জুন ২০২২, ০০:২৯

রাজধানীতে একটি চক্র বছরের বছর ধরে ভুয়া মামলা দিয়ে সাধারণ মানুষের ঘুম হারাম করে চলেছে। এদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না সরকারি চাকরিজীবী, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী এমনকি পুলিশের কর্মকর্তারাও। ঐ চক্র নারী সদস্যদের দিয়ে ধর্ষণ মামলা দায়ের করিয়ে ফাঁদে ফেলে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। এরকম মামলাবাজ সিন্ডিকেটের অন্তত ১১ জন নারী সদস্যর নাম জানা গেছে যাদের দিয়ে ভুয়া মামলা দায়ের করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে ।

জানা গেছে, রাজধানীর ডেমরার স্টাফ কোয়ার্টার এলাকার হোটেল ফেসী ইন নামে একটি আবাসিক হোটেলে গত ৯ মার্চ এক তরুণীকে আটকে রেখে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু হোটেল ম্যানেজার বলেন, এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। এমনকি এই নামে কোনো গেস্টও আসেনি। পরে মামলার বাদী ওই তরুণী স্বীকার করেন, এক সাংবাদিকের পরামর্শে তিনি মামলা করেছেন। সাবেক প্রেমিকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে তিনি যাত্রাবাড়ী থানায় যান। সেখানে পুলিশ তার বিরুদ্ধে মামলা নিতে অপরাগতা প্রকাশ করলে আলমগীর সেলিম নামে ঐ সাংবাদিক তাকে জানায় যে তোমার সাবেক প্রেমিকের বিরুদ্ধে একাধিক ধর্ষণ মামলা দায়ের করতে হবে। পরে তিনি আদালতে গিয়ে তার সাবেক প্রেমিক ও মামলা না নেওয়ায় যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশের কয়েক জন কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করেন।

তবে মামলায় যে সময়ের ধর্ষণের অভিযোগ করা হয়েছে, ঐ সময়ের হোটেলের সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, এমন কেউ হোটেলে প্রবেশ করেনি। মামলায় অভিযুক্ত যুবক, ভুক্তভোগী তরুণী, সহায়তাকারী নারী কেউই ঘটনার আগে পড়ে এক সপ্তাহে ডেমরা এলাকায় যাননি। এ ব্যাপারে পুলিশের ওয়ারী বিভাগের উপ-কমিশনার শাহ ইফতেখার আহমেদ বলেন, ওই তরুণী সাবেক প্রেমিককে শায়েস্তা করার নামে একটি প্রতারক চক্রের সহায়তায় মিথ্যা মামলা দায়ের করেন। তিনি বলেন, মিথ্যা মামলার শিকার ব্যক্তিরা থানায় অভিযোগ করলে পুলিশ ব্যবস্থা নেবে। এর আগে মামলাবাজ সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য আলমগীর সেলিম র‍্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়েছিল। কিন্তু কয়েক দিন পর জামিন পেয়ে আবারও তার পুরোনো পেশায় ফিরে যায়।

একইভাবে এরকম আরেকটি মামলাবাজ সিন্ডিকেট দিয়ে হাতিরঝিল থানার ওসিসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে আদালতে ধর্ষণ মামলার আবেদন করা হয়। মামলার আবেদনের বলা হয়েছে, হাতিরঝিলের উলন রোডের একটি বাড়িতে পুতুল নামের তরুণীকে কয়েক জন মিলে গণধর্ষণ করে। এ ব্যাপারে হাতিরঝিল থানার ওসি আব্দুর রশিদ বলেন, মামলায় ধর্ষণের যে ঘটনাস্থল উলন রোডের বাড়ির ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে, ঐ ঠিকানায় এ ধরনের কোনো ঘটনাই ঘটেনি। এমনকি পুতুল নামে কেউ ঐ বাড়িতে ভাড়া থাকেননি।

আরেক ভুক্তভোগী পাভেল হোসেন পাপন বলেন, পাঁচ বছর আগে রিজিয়া বেগম নামে এক নারীকে দিয়ে আদালতে তার বিরুদ্ধে মানবপাচারের মামলা হলে তিনি গ্রেফতার হন। জামিন পাওয়ার পর আলমগীর সেলিম নামে এক সাংবাদিক জানায় যে ৩ লাখ টাকা দিলে মানবপাচারের মামলা তুলে নেওয়া হবে। পরে বাধ্য হয়ে রাজি হলে, আদালতে এই পাভেল হোসেন পাপন প্রকৃত আসামি নয় বলে বাদী মুচলেকা দেয়। এরপরই ঐ মামলা থেকে তিনি রেহাই পান। এরপর কয়েক দিন আগে আবারও রিজিয়া বেগম ফোন দিয়ে জানায় যে তার বিরুদ্ধে হাতিরঝিল থানা এলাকায় গণধর্ষণের অভিযোগে আদালতে মামলা হয়েছে। এখন এই মামলা নিয়ে আমি পারিবারিকভাবে অশান্তিতে আছি। আমার মেয়ের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা বাসায় কান্নাকাটি করছি। কিন্তু এই সিন্ডিকেট থেকে রক্ষা পাব কীভাবে? আমি বছর দুয়েকের মধ্যে হাতিরঝিল এলাকায় যাইনি। তাহলে আমি কীভাবে ধর্ষণের ঘটনার সঙ্গে জড়িত হলাম ?

মামলাবাজ এই চক্রটি সম্পর্কে যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম বলেন, এরকম মামলাবাজ সিন্ডিকেট গোটা রাজধানীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এরা বিভিন্ন পেশার মানুষকে টার্গেট করে চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না দিলে আদালতে মামলা ঠুকে দেয়। অ্যাডভোকেট তুহিন হাওলাদার বলেন, কেউ মিথ্যা মামলার শিকার হলে, আদালতে মামলার বাদীর বিরুদ্ধে পালটা মামলা করা যাবে।

ইত্তেফাক/ ইআ