সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে ১৯৭২ সালের ৫ থেকে ১৬ জুন অবধি জাতিসংঘের সাধারণ সভা থেকে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘ইউনাইটেড ন্যাশসন কনফারেন্স অন দ্য হিউম্যান এনভায়রনমেন্ট’ অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যা ছিল ইতিহাসের প্রথম পরিবেশবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন। এই সম্মেলনের আলোকেই ১৯৭৪ সাল থেকে ঘটা করে প্রতি বছরই দিবসটি আলাদা আলাদা শহরে আলাদা আলাদা প্রতিপাদ্য নিয়ে পালিত হয়ে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫, ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত ও ২০১০ সালে দিবসটি পালনের আয়োজক দেশ ছিল বাংলাদেশ। এ বছরের ৫ জুন দিবসটি উদ্যাপনের ৫০ বছর পূর্তিতে একই মূলমন্ত্র ‘একটাই মাত্র পৃথিবী’ স্লোগানকে উপজীব্য করেই সারা পৃথিবীতে পালিত হয়েছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এই সুযোগে বিগত ৫০ বছরে সামগ্রিক পৃথিবীতে পরিবেশগত নিপীড়ন এবং জীবনঘনিষ্ঠ পরিবেশগত বিষয়গুলোতে আমাদের অবস্থান নিয়ে পর্যালোচনা করা যাক।
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির ‘ফুড ওয়েস্ট ইনডেক্স-২০২১’ মতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর ১ কোটি টনের বেশি খাবার নষ্ট হয়। ২৩০টি দেশের পানি ও স্যানিটেশনবিষয়ক উপাত্ত নিয়ে প্রণীত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের ‘জেএমপি প্রতিবেদন ২০২১’ বলছে, ২০২০ সালে স্যানিটেশন সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষের হার বাংলাদেশে ৫৪ শতাংশ, পাকিস্তানে ৬৮ শতাংশ ও ভারতে ৭১ শতাংশ, যেখানে বাংলাদেশে ২২ শতাংশ, ভারতে ২ শতাংশ ও পাকিস্তানে ৩ শতাংশ মানুষ অনুন্নত শৌচাগার ব্যবহার করে। গৃহস্থালি কাজে ব্যবহারযোগ্য পানিপ্রাপ্তির হার বাংলাদেশে ১৫ শতাংশ, ভারতে ৪৪ শতাংশ ও পাকিস্তানে ২৬ শতাংশ। ইউনিসেফের সিসিআরআই প্রতিবেদন ২০২১ মতে, বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের শিকার হওয়ায় অত্যন্ত উচ্চঝুঁকিতে থাকা ৬৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১৫তম। জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশনস নেটওয়ার্কের প্রতিবেদন ২০২১ অনুযায়ী, এসডিজি অর্জনে ১৬৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের অবস্হান যথাক্রমে ১০৯, ১২০ ও ১২৯তম। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রতিবেদন ২০২১ অনুযায়ী বিশ্বের বসবাসযোগ্য ১৪০টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৩৭তম।
বায়ুমণ্ডলে পিএম ২.৫, পিএম ১০, ওজোন, কার্বন মনো-অক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড ইত্যাদিসহ অন্যান্য গ্রিনহাউজ গ্যাসের আনুপাতিক হার ক্রমেই বাড়ছে, সংকুচিত হচ্ছে বায়ুমণ্ডলের ওজোনস্তরের আয়তন। বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর মোট মৃত্যুর ২৮ শতাংশ ঘটে পরিবেশ দূষণজনিত রোগব্যাধির কারণে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, বায়ুদূষণের কারণে বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর প্রায় ৭০ লাখ মানুষ মারা যায়। ২২ মার্চ ২০২২-এ সুইজারল্যান্ডভিত্তিক আইকিউএয়ার বায়ুমান সূচক বা এয়ার কোয়ালিটি ইনডেস্ক থেকে প্রকাশিত ‘বিশ্বের বায়ুর মান প্রতিবেদন ২০২১’ শীর্ষক প্রবন্ধে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর দেশের তালিকায় শীর্ষস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম, ২০২০ সালে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরের ১৬তম স্থানে ছিল বাংলাদেশের মানিকগঞ্জ। এফএওর হিসাবে, বিশ্বব্যাপী গত ১৫ বছরে প্রায় ১.৪ শতাংশ বন উজাড় হয়েছে অথচ বাংলাদেশে তার পরিমাণ ২.৬ শতাংশ এবং বছরে সংরক্ষিত বনসহ ২ হাজার ৬০০ হেক্টর বন উজাড় হচ্ছে। গত দুই দশকে কক্সবাজার জেলায় ৩ হাজারের বেশি পাহাড় কাটা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে এবং রোহিঙ্গাদের জন্য আশ্রয় স্থাপনে উজাড় হয়েছে ৮ হাজার একর সংরক্ষিত বনাঞ্চল। বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে পরিচিত বাংলাদেশের ফুসফুস হিসেবে খ্যাত সংরক্ষিত বন ‘সুন্দরবন’-এর বিস্তার ও ঘনত্ব কমেছে। তদুপরি, পরিবেশদূষণের মারাত্মক প্রভাবে বাংলাদেশ এখন চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগপূর্ণ দেশে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পরিবেশবিষয়ক সংস্থা এনভায়রনমেন্টাল প্রটেকশন এজেন্সি ২০১৮ সালে বিশ্বের ১৮০টি দেশের পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, তাতে বাংলাদেশ শেষের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে ছিল। বিশ্বে কৃষিজমি ও বনভূমি হ্রাসের স্কেলে বাংলাদেশ প্রথম এবং ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ২০১৮ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী প্লাস্টিক দূষণে দশম। ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক প্যারিস চুক্তিতে ১৯৫টি দেশ চলতি শতকে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যা বাস্তবায়নে ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর প্রায় ৮ শতাংশ হারে কার্বন নিঃসারণ কমাতে হবে। কিন্তু চুক্তির তিন বছরের মধ্যেই ২০১৮ পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার ৬০০ কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসারিত হয়ে গেছে এবং এভাবে চলতে থাকলে চলতি শতকের শেষ নাগাদ পৃথিবীর তাপমাত্রা ৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়বে।
ক্রমবর্ধমান উষ্ণায়নের ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে পানিতে পরিণত হচ্ছে, অবমুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন অণুজীব। ঢাকার চারপাশের সব নদীর পানি বহু আগেই তার স্বাভাবিক গুণাগুণ হারিয়েছে। ১ হাজার প্লাস্টিকের ব্যাগ গিলে সমুদ্রে তিমির করুণ মৃত্যুর খবর আমরা জেনেছি। বিস্মিত হতে হয় এটা জেনে যে, প্রতিদিন সারা বিশ্বে যে পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়, তার ৫০ শতাংশ একবার ব্যবহারযোগ্য কাপ, চামচ, খাবার প্লেট বা পলিথিন। রাজধানীতে প্রতিদিন ৫ হাজার মেট্রিক টনের বেশি বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। জাতীয় একটি দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, ঢাকা শহরেই প্রতিদিন ১২৪ টন প্লাস্টিকজাতীয় বর্জ্য তৈরি হয়, যার ৮৬ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করা হয়। বাকি যে অংশটি ব্যবহৃত হয় না, তার বেশির ভাগটা পলিথিন। বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের নগর অঞ্চলগুলোতে বার্ষিক মাথাপিছু প্লাস্টিকের ব্যবহার ২০০৫ সালে তিন কেজি ছিল। কিন্তু ২০২০ সালে সে পরিমাণ তিন গুণ বেড়ে ৯ কেজি হয়েছে। আবার, বৃষ্টির পানিতে বিরাজমান অ্যাসিডে খাদ্যনিরাপত্তা হুমকিতে পড়ছে, ধ্বংস হচ্ছে সবুজ অরণ্য।
কৃষিযোগ্য জমি বন্ধ্যা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা ও উত্তরাঞ্চলে মরুকরণের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শস্য রক্ষার জন্য নানা ধরনের বিপজ্জনক কীটনাশক ওষুধ তৈরি ও প্রয়োগ হচ্ছে, যার মাধ্যমে নানাবিধ রাসায়নিক দ্রব্যের অনুপ্রবেশের ফলে নানা জটিল ও কঠিন রোগ দানা বাঁধছে মানুষের শরীরে। কৃষিজমির উর্বরাশক্তি কমে যাওয়ায় ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বাড়তি খাদ্যচাহিদা মেটাতে আমাদের নতুন নতুন জৈবপ্রযুক্তি, রাসায়নিক যৌগ, পেট্রোকেমিক্যাল ও যান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে। খাদ্যনিরাপত্তার প্রয়োজনে একান্ত বাধ্য হয়েই আজ আমরা ঐতিহ্যবাহী, পরিবেশ ও জনস্বাস্হ্যবান্ধব চাষাবাদ পদ্ধতি থেকে সরে গিয়ে করপোরেট এগ্রো কোম্পানির জিএমও বীজ ও পেট্রোকেমিক্যালের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ফসলহানি ও খাদ্যাভাবের সংকট মোকাবিলায় কৃষিব্যবস্থায় মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার, কীটনাশক, ছত্রাকনাশক, আগাছানাশক, ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর যান্ত্রিক সেচব্যবস্থায় প্রচুর জীবাশ্মজ্বালানি খরচ করে অতিরিক্ত ফসল উৎপাদনে যত্নবান হচ্ছি। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ৩ মিটার থেকে ১০ মিটার পর্যন্ত নেমে গেছে। প্রতি বছর প্রায় শূন্য দশমিক ৫৪ শতাংশ চাষযোগ্য কৃষিজমি বিভিন্ন অবকাঠামো, বসতবাড়ি, কলকারখানা ইত্যাদি নির্মাণের দরুন অকৃষি জমিতে রূপান্তর হচ্ছে। বিবিএসের তথ্যমতে, ২০০১-০২ থেকে ২০১৬-১৭ সাল পর্যন্ত দেশের প্রধান খাদ্যশস্যগুলোর উৎপাদন প্রায় ৭৬ শতাংশ বেড়েছে। স্বল্প জমিতে অধিক উৎপাদন করতে গিয়ে মাটির ওপর ক্রমাগত চাপ বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ফসফরাস-সমৃদ্ধ সার অনিয়ন্ত্রিতভাবে প্রয়োগের ফলে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ফলন কমতে পারে।
১৯৯২ সালে রিওডি জেনিরোর আর্থ-সামিট, ১৯৯৫ সালে বার্লিনের জলবায়ু সম্মেলন (কপ-১), ১৯৯৭ সালে কিউটোতে গৃহীত কিউটো প্রটোকল, ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে সর্বশেষ স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনসহ (কপ-২৬) অদ্যাবধি ২৬টি কপ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলেও জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত ভারসাম্য বিনষ্টের কারণগুলো নিয়ন্ত্রণসহ পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে। সরকার পরিবেশ রক্ষায় বিভিন্ন ধরনের আইন প্রণয়ন করেছে, ১৯৯৫ সালে পাশ হয়েছে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন। ২০০২ সালে পলিথিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। অতিথি পাখি ধরা ও শিকার করা আইনত নিষিদ্ধ। পাহাড় কাটা ও জলাভূমি ভরাট ইত্যাদি আইনসিদ্ধ কাজ নয়। পরিবেশদূষণ ও বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) বন্ধ রাখার দায়ে সুপারশপ, কারখানাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। নাগরিক হিসেবে এসব আইন মেনে চলা আমাদের কর্তব্য। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে পরিবেশ ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা গেলে বৈশ্বিক পরিবর্তিত জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করে আরো কিছুদিন টিকে থাকা সম্ভব হতে পারে!
লেখক: প্রফেসর, পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
