যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা এখন রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র

আপডেট : ০৬ জুন ২০২২, ২১:৪১

যুক্তরাষ্ট্রে সংস্কৃতির লড়াইয়ে সামনের সারিতে রয়েছে বই, স্কুল এবং গ্রন্থাগার৷ কী পড়া হবে, কী শেখানো হবে এ নিয়ে রক্ষণশীলদের নেতৃত্বে শুরু হয়েছে আন্দোলন৷ দেশজুড়ে শুরু হয়েছে নানা ধরনের বই নিষিদ্ধের দাবি৷এক কালো বাক্স ভর্তি রঙিন বই নিয়ে নিজের রান্নাঘরে এসেছেন রবিন স্টিনম্যান৷ সেখান থেকে কয়েকটি বের করলেন তিনি৷ কাগজ সেঁটে বইগুলোর কিছু অংশ আলাদা করে চিহ্নিত করা রয়েছে৷ 

বইগুলোর মধ্যে রয়েছে সি হর্স: দ্য শায়েস্ট পিশ ইন দ্য সি সেপারেট ইজ নেভার ইকুয়াল: সিলভিয়া মেন্দেস অ্যান্ড হার ফ্যামিলিজ ফাইট ফর ডিসেগ্রেগেশন এবং স্টোরি অব রুবি ব্রিজেস৷ 

স্টিনম্যান মনে করেন, স্কুলের পড়াশোনায় কতটা গলদ রয়ে যাচ্ছে, এই পৃষ্ঠাগুলোই তার প্রমাণ৷ মামস ফর লিবার্টি নামে একটি সংগঠনের সভাপতি তিনি৷ এটি টেনেসি রাজ্যের উইলিয়ামসন কাউন্টিতে রক্ষণশীল বাবা-মায়েদের একটি সংগঠন৷ সন্তানদের পড়াশোনার বিষয়বস্তু নিয়ে বাবা-মায়ের কথা বলার অধিকার নিয়ে কাজ করে এই সংগঠন৷ পাবলিক স্কুলে কিছু বই যেভাবে পড়ানো হয়, এ নিয়ে আপত্তি তুলেছে সংগঠনটি৷ 

স্টিনম্যান বলেন, স্কুল আমার সন্তানের ওপর কোনো আদর্শ চাপিয়ে দিতে পারে না৷ স্কুলে তাদের লিখতে এবং পড়তে শেখা, গণিত এবং বিজ্ঞান বোঝাতে হবে, যাতে তারা জীবনে উন্নতি করতে পারে৷ কিন্তু এই পাঠ্যসূচিতে একটা নির্দিষ্ট এজেন্ডা নিয়ে কাজ করা হয়েছে, শিশুদের মধ্যে সেটি ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে৷ গত বছরের শেষদিকে মামস ফর লিবার্টি টেনেসি ডিপার্টমেন্ট অব এডুকেশনের কাছে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানায়৷ 

তাদের দাবি, বই এবং শিক্ষা উপকরণ প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে অ্যামেরিকা বিরোধী, শ্বেতাঙ্গ বিরোধী এবং মেক্সিকান বিরোধী এবং এসবের মাধ্যমে পক্ষপাতমূলক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে যাতে শিশুরা নিজের দেশ, নিজেকে এবং একে অপরকে ঘৃণা করতে শিখছে৷ এই অভিযোগ অবশ্য খারিজ হয়ে গেছে৷ কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জুড়েই রক্ষণশীলরা এমন নানা আন্দোলন শুরু করেছেন৷ 

বিশেষ করে বর্ণবাদ, লিঙ্গ এবং যৌনতাকে যেভাবে পড়ানো হয়, এ নিয়ে তাদের ব্যাপক আপত্তি৷ স্কুলগুলো লড়াইয়ের ময়দান অ্যামেরিকার অভ্যন্তরীণ সাংস্কৃতিক লড়াইয়ে শ্রেণীকক্ষ এবং গ্রন্থাগার আবার মূল স্থান দখল করে নিয়েছে৷ অ্যামেরিকান লাইব্রেরি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে ২০২১ সালে, লাইব্রেরি, স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা উপকরণ ও সেবা নিয়ে ৭২৯টি চ্যালেঞ্জ হয়েছে৷ এর ফলে এক হাজার ৫৯৭টি বই সরিয়ে নিতে হয়েছে৷ ২০০০ সাল থেকে এমন চ্যালেঞ্জগুলোর হিসাব রাখতে শুরু করেছে সংগঠনটি৷ এরপর থেকে ২০২১ সালের এই সংখ্যাই সর্বোচ্চ৷ এসব বইয়ের বেশিরভাগই কৃষ্ণাঙ্গ এবং এলজিবিটিকিউ লেখকদের লেখা অথবা তাদের সম্পর্কে লেখা৷ অথচ অ্যামেরিকান লাইব্রেরি অ্যাসোসিয়েশনেরই এক জরিপে দেখা গেছে যে দল নির্বিশেষে বেশিরভাগ অ্যামেরিকান পাবলিক বা স্কুল লাইব্রেরি থেকে বই সরানোর পদক্ষেপের বিরোধী৷ 

ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক অ্যান্ড্রু হার্টম্যান মনে করেন, (বই নিষিদ্ধ করা) মার্কিন ইতিহাসে একটি নিয়মিত ঘটনা এবং এর সঙ্গে সংস্কৃতির লড়াইয়ের বড় সম্পর্ক রয়েছে৷ এটি মার্কিন ইতিহাসেরও অংশ৷

তিনি বলেন, মূলত ধর্মীয় রক্ষণশীল এবং সেক্যুলার উদারপন্থিদের এই লড়াই অনেক দিক থেকে সেই ১৯২০ সাল থেকেই শুরু হয়েছে৷ কিন্তু ১৯৬০ এর দশক থেকে সামাজিক অধিকার, নারীবাদ, সমকামীদের অধিকারের মতো নানা আন্দোলনের ফলে এটি তীব্র মাত্রা পেয়েছে৷ সেন্সরশিপ সংক্রান্ত এই লড়াই নতুন নয় এবং তা কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও সীমাবদ্ধ নয়৷ জার্মানিতে নাৎসি সরকার নানা বইকে সমাজের অধ:পতনের কারণ হিসাবে চিহ্নিত করে নিষিদ্ধ করেছিল, পুড়িয়ে ফেলেছিল, চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরুদ্ধে যাওয়া বই ধ্বংস করা হয়েছিল৷ 

বিশ্বজুড়েই ইতিহাসে বইয়ের ওপর এমন নানা খড়্গ নেমে এসেছে বারবার৷ অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রে এবারের এই ঘটনাগুলো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি রাজনৈতিক বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে৷ কারণ ক্রমশ তীব্রভাবে বিভক্ত হওয়া মার্কিন রাজনীতিতে এই আন্দোলনের দুই পক্ষে রয়েছে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট দলের সমর্থন৷ 

ইত্তেফাক/এএইচপি