চালের বাজারে অস্থিরতার জন্য দেশের বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান আর মিলারদের দুষলেন পাইকারি চাল ব্যবসায়ীরা। তারা বলেন, অর্ডার দিয়েও মিল থেকে চাল পাওয়া যাচ্ছে না। মিলাররা বেশি মুনাফার আশায় চাল মজুত করছেন। পাইকারি ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, মিল থেকে চাল কিনলে তারা কোনো রসিদ দেন না। এছাড়া মিলাররা কত দামে ধান কিনছেন আর কত দামে চাল বিক্রি করছেন, এটা যাচাই করলেই তো চাল নিয়ে কারা কারসাজি করছে তা বেরিয়ে আসবে। তবে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, এবার ধানের দাম বেশি। তাই চালের দামেও এর প্রভাব পড়েছে।
চালের বাজারের অস্থিরতার কারণ খুঁজতে গতকাল জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এক বৈঠকে ডেকেছিল করপোরেট প্রতিষ্ঠান, মিলার আর পাইকারি ব্যবসায়ীদের। বৈঠকে চালের বাজারের অস্থিরতার পেছনে মূলত একে অপরকে দোষারোপ করেন ব্যবসায়ীরা। উল্লেখ্য, এখন বোরোর ভরা মৌসুম হলেও চালের বাজার অস্থির। প্রতি কেজি চালে ৪ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে বোরোর ভরা মৌসুমে চালের দাম এত বেশি কেন, তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর পরই খাদ্য মন্ত্রণালয়সহ প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। চালের অবৈধ মজুতের খোঁজে রাজধানীসহ সারা দেশে অভিযান চলছে।
গতকাল বৈঠকে বাদামতলী ও বাবুবাজার চাল আড়ত মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজি নিজামউদ্দিন বলেন, ‘আমরা আশ্চর্য হয়ে গেছি, বোরোর ভরা মৌসুমে চালের দাম কেন বাড়বে? তেলের ক্ষেত্রে যে অবস্থা হয়েছে, চালের ক্ষেত্রে এমনটা হতে পারে বলে মিলাররা হয়তো মনে করেছেন।’ তিনি বলেন, ‘আমরা তো মিল থেকে চালটা কিনে আনি। তাহলে মিলারদের জিজ্ঞেস করুন, তারা কত দামে আমাদের কাছে চাল বিক্রি করছেন।’ মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আগে কখনো ১ টাকার চাল ৫ টাকা হয় নাই। কিন্তু এখন ঝড়-বৃষ্টি যা-ই হোক, অটো রাইচ মিলে ধান দিলে চাল হয়ে বের হয়। তাহলে কেন এ অবস্থা হবে? করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো লাখ লাখ বস্তা চাল মজুত করছে। আমরা পাইকারি ব্যবসায়ীরা তাদের কাছে গেলে চাল দেয় না। মিলাররা সরকারের গুদামে চাল দিচ্ছে—দাম বাড়ার এটাও একটা কারণ।’
কাওরান বাজার কিচেন মার্কেট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক লোকমান হোসেন বলেন, এবার মৌসুমের শুরুতে মিনিকেটের বস্তা ছিল ২ হাজার ৭০০ টাকা। তা এখন ৩ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কী এমন অবস্থা হলো যে দাম এত বাড়ল? তিনি বলেন, ‘গত রোজার ঈদের সময়ও পোলায়ের চালের বস্তা ছিল ৪ হাজার ৩০০ থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা। তা এখন ৫ হাজার টাকা ছাড়িয়ে গেছে। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি কেজি পোলাওয়ের চালে ৫০ টাকার বেশি মুনাফা করে বলে তিনি অভিযোগ করেন। আর আমরা পাইকারি ব্যবসায়ীরা অভিযানের কারণে সামাজিকভাবে হেয় হচ্ছি।’ কাওরান বাজার কিচেন মার্কেট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনারা ঝিকে মেরে বউকে শিক্ষা দিচ্ছেন। আপনারা যেমন আমাদের রসিদ দেখছেন, তেমনি আপনারা চাল কলে গিয়ে তারা কত দামে ধান কিনছেন, আর কত দামে চাল বিক্রি করছেন তা যাচাই করুন। মিল মালিকদের জরিমানা করেছেন তা আমরা কখনো দেখিনি।’
বৈঠকে আকিজ গ্রুপের প্রতিনিধি মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘আমরা এই ব্যবসায় নতুন। বছরে মাত্র ৫০০ টন চাল ডেলিভারি দেই। এটা বাজারে মোট চাহিদার তুলনায় খুবই কম।’ এসিআইয়ের জেনারেল ম্যানেজার অবন্তি কুমার সরকার বলেন, ‘পাইকারি ব্যবসায়ীরা দাম কমলে অর্ডার দেওয়া মাল ডেলিভারি নেন না। আবার দাম বাড়লে আরো দাম বাড়ার আশায় ডেলিভারি নেন না। এতে আমাদের গুদামে মাল মজুত থেকে যায়। এটা কি আমাদের সমস্যা?’ তিনি বলেন, ‘পাঁচ বছর ধরে ব্যবসা করছি। কিন্তু এবারই প্রথম চালের দাম এত বেশি। আর আমরা কিন্তু নিজেদের উৎপাদন করা চাল প্যাকেট করি।’
প্রাণ গ্রুপের সিনিয়র ম্যানেজার (অপারেশন) নিয়াজ মোরশেদ বলেন, ‘এবার মৌসুমের শুরুতে ২ হাজার ১০০ টাকা বস্তা ধান কিনেছি। সেই ধান এখন ২ হাজার ৮০০ টাকা। এবার ধানের দাম বেশি। এর প্রভাব পড়েছে চালের দামে।’ প্রতি মাসে তারা ৫০০ থেকে ৬০০ টন মিনিকেট চাল বিক্রি করেন বলে জানান। মেঘনা গ্রুপের তসলিম শাহরিয়ার বলেন, ‘আমরা অ্যারোমেটিক চাল বাজারজাত করি।’ কোনো ধরনের অনিয়ম করা হয় না বলে জানান তিনি। সিটি গ্রুপের প্রতিনিধি বলেন, ‘করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারের মোট চাহিদার ৮ থেকে ৯ শতাংশ চাল বাজারজাত করে। এটা কি বাজারে বড় প্রভাব ফেলবে?’
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনাদের কথার সঙ্গে কাজের মিল নেই। কারণ, এক কাওরান বাজার থেকেই এর আগে হাজার হাজার টন সয়াবিন তেলের অবৈধ মজুত পাওয়া গেছে।’ তিনি বলেন, ‘করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো কত দামে ধান কিনে কত দামে চাল বিক্রি করছে, তা আমরা এখন বিশ্লেষণ করব। এছাড়া মোটা চালের তো প্যাকেট হয় না। তাহলে মোটা চালের দাম বাড়ল কেন?’ তিনি বলেন, ‘কোনো মিল চাল ক্রয়ের রসিদ না দিলে আমাদের জানান। আমরা ব্যবস্থা নেব। চালের ক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’ ভোক্তার মহাপরিচালক বলেন, কোনো একটা পক্ষ চালের বাজার অস্থিতিশলী করার পাঁয়তারা করছে। আগামী সপ্তাহ থেকে চালের মিলগুলোতে অভিযান চালানো হবে বলে জানান তিনি। উল্লেখ্য, বোরোর ভরা মৌসুমে প্রতি বছর ধান-চালের দাম কম থাকলেও এবার বাজার চড়া।
ব্যবসায়ীরা বলেছেন, অতিবৃষ্টি, ঝড় ও পাহাড়ি ঢলে ধান পচে নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে মোট চালের উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব পড়বে। তবে কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত তাদের কাছে যে তথ্য এসেছে, তাতে দেখা গেছে, অতিবৃষ্টি, ঝড় ও পাহাড়ি ঢলে মোট ৭৮ হাজার ৯৮৭ টন চাল নষ্ট হয়েছে, যা মোট চাল উৎপাদনের তুলনায় খুবই কম। এ বছর বোরোতে ২ কোটি ১১ লাখ ৫৭ হাজার ৮৬৩ টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত বছর ছিল ২ কোটি ৮ লাখ ৮৫ হাজার ২৬৩ টন। তাই এখন পর্যন্ত ঝড়-বৃষ্টিতে যে পরিমাণ ফসল নষ্ট হয়েছে, তাতে মোট চাল উৎপাদনে বড় ধরনের কোনো প্রভাব পড়বে না। কিন্তু একটি অসাধু ব্যবসায়ী চক্র এটাকে পুঁজি করে চালের বাজার অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা করছে। গতকাল খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির এক জরুরি (এফপিএমসি) ভাচুর্য়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বেসরকারিভাবে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেছেন, বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকার বেসরকারিভাবে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। খাদ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে এই বৈঠকে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। খাদ্যমন্ত্রী জানান, মিটিংয়ের রেজলু্যশনসহ সারসংক্ষেপ প্রধানমন্ত্রীর কাছে দ্রুত পাঠানো হবে।
