তালায় ভেজাল দুধের রমরমা কারবার!

আপডেট : ০৭ জুন ২০২২, ১৪:৫৮

সাতক্ষীরার দুগ্ধপল্লী বলে খ্যাত জেয়ালা এলাকার সুনামকে পুঁজি করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম উপায়ে ভেজাল দুধ তৈরি করছেন। ক্ষতিকর জেলি, সোডা, সয়াবিন তেল, লবণ, চিনি, স্যালাইন, নিম্নমানের গুঁড়া দুধসহ মারাত্মক সব কেমিক্যালের সংমিশ্রণে তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম দুধ। এসব দুধ নামি ব্রান্ডের প্যাকেটজাত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে সারাদেশে। সবাই অজান্তেই এসব দুধ পান করছেন।

অভিযোগ রয়েছে, তালায় সহজে সাধারণকে ধোঁকা দিয়ে অধিক মুনাফা লাভের আশায় একটি প্রতারক চক্র শিশু খাদ্য হিসেবে প্রতিদিন টনে টনে ভেজাল দুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করছে। বৈধ ব্যবসার তুলনায় লাভ অন্তত ৭/৮ গুণ বেশি হওয়ায় ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। সঙ্গে স্থানীয় মুনাফালোভীদের পাশাপাশি রয়েছেন দেশের দামি ব্রান্ডের স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা খাঁটি দুধ প্রক্রিয়াকরণ প্রতিষ্ঠানের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারী।

এদিকে, সিন্ডিকেটের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে প্রকৃত খামারীদের এখন পথে বসার উপক্রম হয়েছে। তারা উদ্যোক্তা হিসেবে হালাল উপায়ে দিন-রাত পরিশ্রম করে খাঁটি দুধ উৎপাদন করেও সঠিক দাম পাচ্ছেন না। এদিকে, সিলিং সেন্টারগুলোও অপেক্ষাকৃত কম দামে দুধ পাওয়ায় খামারিদের উৎপাদিত দুধের চাহিদায় কৃত্রিম ভাটা তৈরি করছে। ফলে বাধ্য হয়ে খামারিরাও অপেক্ষাকৃত কম দামে তাদের কাছে দুধ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
স্থানীয় একাধিক খামারি জানান, তালা উপজেলার জেয়ালা গ্রাম ইতোমধ্যে দুধ উৎপাদনের জন্য দেশময় সুনাম কুড়িয়েছে। স্থানীয় খামারিদের কাছ থেকে ন্যায্য দামে খাঁটি দুধ সংগ্রহ করে সুষ্ঠু প্রক্রিয়ায় প্যাকেটজাত করে তা দেশব্যাপী সরবরাহের জন্য দেশের একাধিক নামী কোম্পানি খামার এলাকায় গড়ে তুলেছে স্ব স্ব ব্রান্ডের সিলিং সেন্টার।

প্রথম দিকে সিলিং সেন্টারগুলো খামারিদের লাভবান হওয়ার স্বপ্ন দেখালেও পরবর্তী সময়ে সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অসাধু চক্রটি গড়ে তুলেছে ভেজাল দুধের সিন্ডিকেট। এর যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন খামারিরা।

সূত্র জানায়, চক্রটি নকল দুধ উৎপাদন করে শুধু সিলিং সেন্টারগুলোতে সরবরাহ করছে না। এ দুধের ক্রিমে তৈরি হচ্ছে খাঁটি গাওয়া ঘি। আর দুধের ছানা থেকে তৈরি হচ্ছে রসনা-বিলাসে বাহারি সব মিষ্টান্ন দ্রব্য।

এ প্রসঙ্গে কথা হয় তালা উপজেলার জেয়ালা, আটারই, মহান্দী ও জেয়ালা নলতার কয়েকজন খামারির সঙ্গে। তাদের দেওয়া তথ্য অত্যন্ত লোমহর্ষক ও ভয়ংকর। দেশের অন্যতম প্রধান গবাদি পশু পালন সমৃদ্ধ ও দুগ্ধ পল্লীকে পুঁজি করে প্রত্যন্ত এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে ভয়ংকর নকল দুধের রমরমা ব্যবসা।

মূলত তাদের দেওয়া সূত্র ধরে জেয়ালা ঘোষপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানকার অধিকাংশ পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে গবাদিপশু পালনের সঙ্গে জড়িত। মূলত খামারিদের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহকারী বা ব্যবসায়ীদের সরাসরি সম্পৃক্তায় গড়ে উঠেছে কৃত্রিম দুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঘুরে ঘুরে দেখা হয় নকল দুধ উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়া।

এই ফড়িয়া বা ব্যবসায়ীর ভেজাল বা নকল দুধ তৈরির উপকরণগুলো অত্যন্ত ক্ষতিকারক। প্রথমে একটি ব্লেন্ডার মেশিনে হাফ কেজি খাঁটি দুধ নেওয়া হয়। তার সঙ্গে পরিমাণ মতো জেলির সঙ্গে ডিটারজেন্ট (কাপড় কাচা) পাউডার অথবা সোডা, হাফ কেজি সয়াবিন তেল, পরিমাণ মতো চিনি, স্যালাইন, লবণ, গুঁড়া দুধসহ পরিমিত মাত্রায় বিভিন্ন কেমিক্যাল মিশিয়ে ১৫ মিনিট ধরে বিলিন্ডারে সব উপকরণ ভালোভাবে মিশিয়ে নেওয়া হয়। একই উপায়ে ব্লিডিং হয় আরও অন্তত ৩ বার। এরপর সব দুধ একটি পাতিলে ঢেলে তার সঙ্গে এক মণ সাদা পানি মিশিয়ে প্রস্তুত করা হয় খাঁটি দুধের আদলে ভেজাল দুধ।

সূত্র জানায়, এভাবে এক মণ দুধ তৈরিতে খরচ হচ্ছে প্রায় ২০০-২৫০ টাকা পর্যন্ত। আর তা সিলিং পয়েন্টসহ বিভিন্ন কারখানায় বিক্রি করা হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত। দুধে প্রস্তুতকৃত ফ্যাটের উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে দুধের দাম। যা উৎপাদন খরচের চেয়ে প্রায় ৭ গুণ বেশি। এভাবে একজন উৎপাদক দিনে ২ মণ ভেজাল দুধ উৎপাদন করেন। ওই উৎপাদক বা মুনাফাভোগী ব্যবসায়ী খামারিদের কাছ থেকে আরও ৬ মণ খাঁটি দুধ সংগ্রহ করে সব মিলিয়ে খাঁটি হিসেবে মোট ৮ মণ হিসেবে দুধ সরবরাহ করেন সিলিং সেন্টারে।

এ প্রসঙ্গে একাধিক ব্যবসায়ী জানান, খামার থেকে তারা প্রতি লিটার দুধ ৪০ টাকায় কিনে আবার ৪০ টাকায় বিক্রি করেন। ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্য এসব কথা জানান দিলেও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। মূলত আসল দুধের সঙ্গে নকল দুধের সংমিশ্রণের প্রয়োজনেই তারা খামার থেকে ৪০ টাকা দরে দুধ সংগ্রহ করেন।

তারা আরও জানান, ব্যবসার একটি অংশ চলে যায় সিলিং সেন্টারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে। মূলত সেন্টারের গ্রেটাররা দুধের ঘনত্ব (ননির ফ্যাট) মেপে টাকা দেন। আর নকল দুধের পরিমিত রাসায়নিক সংমিশ্রণের উপর নির্ভর করে দুধের ঘনত্ব।

এদিকে, দুধের ভেজাল কারবারিরা রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেলেও খামারিরা পড়েছেন বিপাকে। অপেক্ষাকৃত কম দামে দুধ বিক্রি করে উচ্চ মূল্যে গো-খাদ্য কিনে পশুপালন লাভের পরিবর্তে প্রতিনিয়ত লোকসানের দিকে যাচ্ছেন তারা। ইতোমধ্যে অনেক খামারি ব্যবসা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ারও চিন্তা করছেন।এদিকে, বাজারের পাশাপাশি সিলিং সেন্টারসহ সেখানকার দুধের মান মনিটরিংয়ের দাবি জানিয়েছেন প্রকৃত খামারিরা।

এবিষয়ে সাতক্ষীরা জেলার মিল্কভিটার সভাপতি তালার জেয়ালা গ্রামের প্রশান্ত ঘোষ বলেন, ‘আগে কেউ কেউ ভেজাল দুধের কারবারে জড়িত থাকলেও এখন সেটি নেই। বিশেষ করে ক্রিম, গুঁড়ো দুধসহ বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় তারা ওসব ছেড়ে দিয়েছেন।’

উপজেলার ভারপ্রাপ্ত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মাছুম বিল্লাহ জানান, অনেক খামারির কাছ থেকে ভেজাল দুধ তৈরির ভয়ংকর তথ্য তিনি পেয়েছেন। ভেজাল দুধ মানব শরীরের জন্য খুবই ক্ষতিকারক। অসাধু চক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করা হবে।

তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রশান্ত কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘এমন একটি বিষয় আমার কানে এসেছে। কোথাও ভেজাল দুধের কারবারির খবর পেলে প্রশাসনকে অবহিত করবেন সবাই।’ দ্রুত এসব অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে জানান তিনি।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সাতক্ষীরার উপ-পরিচালক মো. নাজমুল হাসান জানান, এ বিষয়ে তাদের সজাগ দৃষ্টি রয়েছে। ভেজাল দুধের খবর জানতে পেরে প্রত্যেকটি সিলিং পয়েন্ট ভিজিট করা হয়েছে। সর্বশেষ পরিস্থিতি সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক ও তালা উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে লিখিতভাবে অবহিত করা হয়েছে।

সাতক্ষীরা জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মো. মোকলেছুর রহমান বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে বিভিন্ন সিলিং সেন্টার পরিদর্শন করেছি। এ সময় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দুধ কেনার জন্য বিভিন্ন সিলিং সেন্টারকে বিশেষভাবে অবহিত করা হয়েছে। আমাদের মনিটরিং অব্যাহত রয়েছে।’

আকিজের আরএম (রিজিওনাল ম্যাজোর) মুরাদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের সিলিং সেন্টারে মাঝে মাঝে ভেজাল দুধ আসে। আমরা পরীক্ষা করে সেটা সাথে সাথে ব্যাক করে থাকি। তবে আকিজ কোম্পানির দুধের  গুণগত মান অনেক ভালো।’

ইত্তেফাক/মাহি