ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক-রিকশা-ভ্যান বন্ধ হবে কবে

আপডেট : ০৯ জুন ২০২২, ১৮:০৫

রিকশার কাঠামোতে ব্যাটারির সাহায্যে মোটর যুক্ত করে তৈরি করা হয় ব্যাটারিচালিত রিকশা। শুধু রিকশা নয়, ভ্যানের সঙ্গেও যুক্ত করা হয় ব্যাটারি। এসব ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রাজধানীসহ সারাদেশের সড়ক-মহাসড়ক ও অলিগলিতে। এদিকে সারা দেশে অবৈধ থ্রি হুইলার ইজিবাইক চিহ্নিত ও অপসারণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। তবে এই নির্দেশ কেউই মানছে না। ইজিবাইকগুলো রাস্তায় চলাচল করায় বিভিন্ন সময় ঘটছে দুর্ঘটনা। 

সরেজমিনে রাজধানীর মুগদা, মান্ডা, বাসাবো, হাজারীবাগ, জিগাতলা, কামরাঙ্গীরচর, দক্ষিণখান, মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, বাড্ডা, জুরাইন, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, শনির আখড়া, ডেমরা, বাসাবো ও মাদারটেকসহ রাজধানীর ছোট বড় প্রায় ৫০টি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রত্যেক এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। বিভিন্ন এলাকার রিকশাচালক ও মালিকদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, এই সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর ব্যাটারিচালিত ৪০ লাখ ইজিবাইক বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে এগুলো আমদানি ও ক্রয়-বিক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন বিচারপতি মামনুন রহমানের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ। 

ছবি: সংগৃহীত

আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট আতিক তৌহিদুল ইসলাম। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত দাশ গুপ্ত। গত ১৩ ডিসেম্বর বাঘ ইকো মোটরস লিমিটেডের সভাপতি কাজী জসিমুল ইসলামের পক্ষে হাইকোর্টে রিটটি করা হয়।

পরে আইনজীবী আতিক তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ইজিবাইকগুলোতে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হয়। এই ইজিবাইকগুলো পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। এছাড়া ইজিবাইকগুলো রুট পারমিট ছাড়াই রাস্তায় চলাচল করছে। এ কারণে সারা দেশে চলা অবৈধ ইজিবাইক বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে আমরা হাইকোর্টে রিট করি। রিটের শুনানি নিয়ে আজকে আদালত ব্যাটারিচালিত অবৈধ ইজিবাইক জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে এগুলো আমদানি নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন আদালত। অবৈধ ইজিবাইক আমদানি থেকে বিরত থাকতে কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, এই মর্মে রুল জারি করা হয়েছে।’

ছবি: সংগৃহীত

এর আগে ২০১৭ সালে হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশনা উপেক্ষা করে স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশকে ম্যানেজ করে বিভিন্ন অলিতে-গলিতে এখনো চলছে এসব ব্যাটারিচালিত রিকশা। আর এসব অটোরিকশায় চড়ে প্রায় দুর্ঘটনার শিকার হয়ে সারাজীবনের জন্য কেউ হচ্ছেন পঙ্গু, কেউ হারাচ্ছেন প্রাণ।

মাঝে-মাঝে ব্যাটারিচালিত অবৈধ অটোরিকশা বন্ধে রাজধানীতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। তবে সেটা নাম মাত্র । এ বছরের ২ জানুয়ারি হতে  ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকা হতে এখন পর্যন্ত অনুমোদনহীন মোট রিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিকশা ৬৯টি পরিবহন জব্দ করা হয়েছে। এর পর আর কোন অভিযান হয়নি। আর উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) আনুষ্ঠানিকভাবেও কোন অভিযান শুরু করতে পারেনি।

ব্যাটারিচালিত অবৈধ রিকশা ও অটোরিকশা বন্ধের বিষয়ে ডিএসসিসি’র নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আফিফা খান ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার মাত্রা খুব বেশি বেড়ে গেছে। তাদের কারণে সড়কে অনেক দুর্ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। হাইকোর্ট ও মেয়রের নির্দেশনা রয়েছে এসব অটোরিকশা বন্ধের। কিছু কিছু অসাধু ব্যক্তি ব্যাটারিচালিত এসব অটোরিকশার ব্যবসা অব্যাহত রেখেছে। আমরা এসব অবৈধ যানগুলোর বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছি। আমরা এসব অবৈধ যানবাহনগুলো বন্ধ নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করবো।’

ছবি: সংগৃহীত

সচেতন যাত্রীদের অভিযোগ, পুলিশ, ট্রাফিক বা হাইওয়ে পুলিশের দায়িত্বে অবহেলার কারণে এসব যানবাহন গলি থেকে শুরু করে সড়ক-মহাসড়কে চলছে। তারা বলছেন, সড়ক-মহাসড়ককে ৩ চাকার বাহন মুক্ত রাখতে হলে কঠোর নজরদারির দরকার। এদিকে হাইওয়ে ও ট্রাফিক পুলিশ বলছে, দায়িত্বে কোনো অবহেলা নেই। বেশিরভাগ সময় চালকরা পুলিশের চোখে ফাঁকি দিয়ে মহাসড়কে এসয় গাড়ি চালায়।

রিকশা-শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘মহামারিতে মানুষ তার রুটি-রুজির বন্দোবস্ত করতে হিমশিম খাচ্ছে। এর মধ্যে ব্যাটারিচালিত রিকশা বাতিলের মাধ্যমে নতুন করে লাখ লাখ মানুষের জীবিকা বিপদের সম্মুখীন করা হয়েছে। সরকার ব্যবসায়ীদের স্বার্থ দেখতে গিয়ে শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে, এই করপোরেশনে প্যাডেলচালিত রিকশার সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ। এর মধ্যে অনুমোদিত প্যাডেলচালিত রিকশার সংখ্যার ২ লাখ ১৩ হাজার। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে, এই করপোরেশনে প্যাডেলচালিত রিকশার সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ। এর মধ্যে অনুমোদিত প্যাডেলচালিত রিকশার সংখ্যা প্রায় ২৮ হাজার।

ছবি: সংগৃহীত

ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশা উচ্ছেদ বিষয়ে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘সারাদেশে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা হবে প্রায় ২০ লাখ। এর মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রামে এর সংখ্যা সর্বাধিক। আমারা প্রায় একযুগ ধরে দাবি জানিয়ে আসছি-ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশাসহ সব অবৈধ ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন বন্ধ হোক। মনে রাখতে হবে মানুষের জীবিকা আগে না, জীবন আগে। সারাদেশে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধ করে গণপরিবহণের সংখ্যা বাড়ানো হোক।’

সড়ক পরিবহনণবিষয়ক জাতীয় টাস্কফোর্সের এক সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘আমরা লক্ষ্য করেছি সারাদেশে রিকশা-ভ্যানে মোটর লাগিয়ে রাস্তায় চলছে। শুধু সামনের চাকায় ব্রেক, পেছনের চাকায় কোনো ব্রেক নেই বা ব্যবস্থা থাকলেও তা অপ্রতুল। সেগুলো যখন ব্রেক করে, তখন যাত্রীসহ গাড়ি উল্টে যায়। এ ধরনের দৃশ্য আমরা দেখেছি। আমরা দেখেছি হাইওয়েগুলোতেও এসব রিকশা চলছে।’

প্যাডেল চালিত রিকশাকে যারা ইঞ্জিন দিয়ে রূপান্তর করেছেন সেই সব রিকশা-ভ্যান বন্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে ওই সভায় উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। 

ইত্তেফাক/এএএম