সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

‘বন্ধ কোরো না পাখা’

আপডেট : ১০ জুন ২০২২, ১১:২৯

মা নুষের মানবিকতা শুধু মানবকেন্দ্রিক নয়। মানুষ চাইলে আরো বেশি মানবিক হয়ে উঠতে পারে পশুপাখি ও গাছপালার সঙ্গে আচরণে। একটি বেড়াল বা একটি কুকুর কিংবা একটি পতঙ্গের সঙ্গে তুমি কী আচরণ কর, তাকে তুমি বাঁচাও না মারো, তার ওপর নির্ভর করছে তোমার মানুষ হওয়া-না হওয়ার দাখিলানা। একটি পক্ষীশাবকের সঙ্গে কেমন সহানুভূতিপূর্ণ আচরণ করতে হবে তা নিয়ে নির্দেশ রয়েছে হজরত মহম্মদ (স.)-এর তরফে হাদিসনামায়। তিনি তার উষ্ট্রীকে সঙ্গে না নিয়ে বেহেশতে প্রবেশ করবেন না। আরব জাতির ইতিহাসের প্রধানতম উপাদানই হলো উট।

আরবদের মূল লড়াই ছিল তিনটি পদার্থকে ঘিরে—উটের দুধ, খেজুর আর মরুকূপের কালো পানি। তারই অধিকার নিয়ে লড়াই করত তারা। তৃষ্ণার্ত জীবকে পানি খাওয়ানো মরুভূমিতে সবচেয়ে পুণ্যময় কাজ। জলসত্র করে জলদান ভারত উপমহাদেশেরও মানবিক ধর্ম।

কলকাতার একটি দৈনিকের এক পত্রলেখক লিখেছেন— ‘এখন ভরা গ্রীষ্ম। চড়ছে উত্তাপের পারদ। খাল-বিল দ্রুত শুকনো হচ্ছে। এই মরসুমে বিপদে পড়ে পাখিকুল। সময়ের সঙ্গে অনেক পাখিই আজ বিরলের তালিকায়। বিশেষ করে শহরের দিকে পাখিদের কলতান তেমন শোনা যায় না। তবু যেসব পাখি এখনো আমাদের চারপাশে টিকে আছে, এই গরমে পানীয়জলের অভাবে যাতে তাদের অকালপ্রয়াণ না ঘটে, সেই জন্য আমাদের একটু সহায়তা করতে হবে। ছাদে, উঠোনের খোলা জায়গায় বা বারান্দায় বড় মুখওয়ালা (গামলা জাতীয়) পাত্রে ওদের জন্য জল রাখতে হবে। ওদের জন্য প্লাস্টিকের দুই লিটারের বোতলে জল ভরে বড় মুখওয়ালা জলদান পাত্রে উলটো করে রেখে দিয়ে ‘বার্ড ওয়াটার ফিডার’ করে নিলে একবার বোতলে জল ভরে দিলেই দু-তিন দিন আর জল দিতে হবে না। সামান্য জলের ব্যবস্হা করে ওদের বেঁচে থাকতে সহায়তা করলে আমাদেরই বাস্ত্ততন্ত্রের ভিত সুদৃঢ় হবে।’

পাখি না হলে মানুষের গল্প জমে না। ছেলেবেলায় দাদিমা-নানিমা যেসব রূপকথার গল্প শুনিয়ে গল্পের নেশা ধরিয়েছিলেন, সেইসব গল্পে পাখির ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সেই শৈশবেই মনের মধ্যে মুদ্রিত হয়ে গিয়েছিল, পাখিরা বুদ্ধিমান আর চমত্কার জীব; তাদের জ্ঞানেরও বহর রয়েছে। আমাদের সাহিত্যে পাখি আর মানুষে একেবারে মাখামাখি হয়ে রয়েছে। বিজ্ঞানী ডারউইনের বিবর্তনতত্ত্বের গবেষণার কাজে পাখিই হয়েছে বিশেষ অবলম্বন। সে পাখিটা সম্ভবত মুনিয়া জাতের পাখি, বা মতান্তরে সে পাখিগুলো ছিল মকিং বার্ড বা যাকে বলে হরবোলা পাখি। ‘মকিং বার্ড’ নামে একটি জনপ্রিয় উপন্যাস আছে ইংরেজি ভাষায়, যার লেখিকার নাম হারপার লি। কালোর প্রতি ধলোর বিদ্বেষ নিয়ে হিউমার রসের উপন্যাসটি জগদ্বিখ্যাত। পাখিটি বস্ত্তত ‘জেম ফিঞ্চ’; তবে পুরো ফিঞ্চ জাতির পাখিরা ডারউইনের দৌলতে ডারউইন ফিঞ্চ বা ডারউইন হরবোলা নামে অধিক খ্যাত।

আমার বাড়ির কাছাকাছি রয়েছে বিখ্যাত এক পাখিরালয়। আমার বাড়িটা যেখানে, সেখানেও চারদিকে গাছপালা আর পাখির সমাবেশ। কাছেই, খুব কাছে, বিভূতিভূষণের নিশ্চিন্দিপুর; জোরে হাঁকলে সহজেই গলা পৌঁছে যায়। এখানে অগুনতি শ্যামা-খঞ্জনা-দোয়েল এই জ্যৈষ্ঠ মাসেও সুরেলা স্বরলিপি পেশ করে চলেছে। মনে রাখতে হচ্ছে নিশ্চিন্দিপুর দুটো উত্তরে আর দক্ষিণে। দুই নিশ্চিন্দিপুরের সঙ্গেই বিভূতিভূষণের প্রত্যক্ষ সম্বন্ধ ছিল। উত্তর আর দক্ষিণ ২৪ পরগনার অরণ্য প্রকৃতি হুবহু এক নয়। আমি থাকি দক্ষিণে, যদিও তা এখন কলকাতার অংশ হয়ে গেছে; কিন্তু জায়গাটা আদি গঙ্গার অববাহিকা বলে তা অত্যন্ত উর্বর। আদি গঙ্গার মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু তার উর্বরতার আশীর্বাদ পাখিদের ‘আলয়’ গড়ে তুলতে আহ্বান করে চলেছে আজো।

পক্ষী বিশারদ বা বলা যায় পক্ষী-জীবনের ব্যাখ্যাতা ও নিসর্গ-দার্শনিক সেলিম আলির বইতে স্পষ্টত লেখা রয়েছে, শ্যামা পাখি আসলে দোয়েলের আরণ্যক সংস্করণ। খঞ্জনা ও দোয়েলেরই জাতি; কিন্তু কবি জীবনানন্দ দাশ শ্যামা আর খঞ্জনা স্পষ্টত আলাদা করে চিনতেন। খঞ্জন লেজ নাফিয়ে গায়। দোয়েল সর্বদা লেজ খাড়া ও স্হির করে রাখে। ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রম্হে জীবনানন্দ লেখেন, ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে চাই না আর : অন্ধকারে জেগে উঠে ডুমুরের গাছে চেয়ে দেখি ছাতার মতন বড় পাতাটির নিচে বসে আছে ভোরের দোয়েল পাখি’

— এই কবিতাটি বাংলাদেশের নৈসর্গিক প্রাণসত্তার গূঢ় পরিচয় বহন করছে; জাতীয় পাখিটির অপূর্ব অপরূপ ছবি এখানে আবহমান হয়ে আছে। এই কবিতাটিই গান হয়ে ধ্বনিত হতো বাংলাদেশে। মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণায় বাঙালির কণ্ঠে। আমার বয়স তখন উনিশ-কুড়ি হবে। এমন একটি নরম গানের মধ্যে এত প্রখর প্রাণপ্রাচুর্য আর মাতৃভাষার জন্য সেই প্রাণ বিসর্জন দেবার প্রেরণা বাঙালি পেয়েছিল নির্জন এক কবির কাছ থেকে—ভাবলে অবাক লাগে। ঐ কবিতারই মধ্যে দোয়েলের দুই প্রজাতি শ্যামা আর খঞ্জনের কথা আশ্চর্য দুই বৈশিষ্ট্য সহকারে তুলে ধরেছেন কবি।

পরণকথার ভেতর দিয়ে চলেছে কবিতাটি। জাম বট কাঁঠালের হিজলের অশত্থের ছায়ার মধ্যে গেয়ে ওঠার প্রতীক্ষায় রয়েছে দোয়েল ডুমুরের প্রকাণ্ড পাতার আড়ালে। ফণীমনসার ঝোপে এবং শটিবনে সেইসব গাছেদের ছায়া এসে পড়েছে—এমনই অমৃত ছায়ার মধ্যেই ভেসে চলেছিল বেহুলার ভেলা। গাছেরা সেদিন আশ্চর্য বাঙ্ময় হয়ে উঠেছিল। বেহুলা ভেসে যেতে যেতে শুনেছিল শ্যামার নরম গান। তারপর?

মৃত স্বামীর প্রাণ ফিরে পেতে কী করেছিল বেহুলা? অমরায় গিয়ে লখিন্দরের প্রাণ ভিক্ষা চেয়ে দেবতাকে খুশি করতে যেভাবে নেচেছিল, তা ছিল খঞ্জনায় নাকের মতো ছন্দমধুর—সেই নাচের মধ্য দিয়েই বাংলার কান্না জাগিয়ে তুলেছিল—নদী-মাঠ-ভাঁটফুল বেহুলার পদবিক্ষেপে ঘুঙুরের মতো সংগত করেছিল সেই কান্নাকে। দোয়েলেরই দুটি রূপ শ্যামা আর খঞ্জনা; তারা একজন নেচে গায়, অন্যজন শুধুই গায় অফুরন্ত তালে; সে তান স্বর্গলোকের সামগ্রী হয়ে ভরিয়ে তোলে বাংলাকে। তা হলে, কথা হলো এই যে, দোয়েল-শ্যামা-খঞ্জনার জন্য জলসত্র কি দেবে না বাঙালি?

আমার তিনতলার ছাদে জলের ট্যাংকের লম্বা রডের টি-এর মাথায় বসে যে আমাকে মত্ত গলায় গান শোনায় সে যে শ্যামা, তা আমি জানি। আমাকে ভোরবেলা ছাদে দেখলেই ও চলে আসে কোনো আড়াল থেকে। ট্যাংকের জল উপচে পড়লে, শালিক আর ছাতারে পাখির আহ্লাদে পান করাটা থামতেই চায় না। নানান পাখির বিচিত্র কলরবে ভরে আছে পরিবেশ; তাদের সুরে যেন আমার প্রত্যহ পুনর্জন্ম হয়—এদের আমি জল দেব না, তা কী করে হয়?

পাখি না থাকলে কলকাতা তার নৈসর্গিক ও নাগরিক সমৃদ্ধি থেকে হয়ে যায় নিঃস্ব আর গরিব। এমনই মনে করতেন কবি জীবনানন্দ। তিনি ভাবতেন, পাখিই তাঁর সবচেয়ে বড় ক্যাপিটাল। কথাটা সত্য যে, জীবনানন্দের সমগ্র কাব্য পাখিময় এক পাখিরালয়। তবে সব পাখিই বাংলার। পাখি থেকেই তো কাব্যের শুরু। বকের তিরবিদ্ধ মৃত্যু, তার থেকে যে শোক, তাইই বাল্মীকির গলায় শ্লোক হয়ে জাগিয়েছে বেদনা; সংবেদনই কাব্যের মূল। পাখির প্রতি ভালোবাসা আর দয়াই মানুষের অশেষ মানবতার পরিচয়। রবিন পাখির অকালমৃত্যুর প্রতিবাদ থেকেই র্যাফেল কারসন লিখেছিলেন দূষণবিরোধী বই ‘সাইলেন্ট স্পি্রং’ ডিডিটি স্পে্র করাতেই রবিনদের মৃত্যু হচ্ছিল, গভীর পর্যবেক্ষণ থেকে সে কথা ধরতে পেরেছিলেন শ্রীমতী কারসন—তাকে বলা যেতে পারে, ইকো-ফেমিনিজমের প্রথম প্রবক্তা। পরিবেশ রক্ষার প্রথম রচনাকার তিনি। এসো তাঁর সম্মানেও আমরা পাখিকে জল দিই এই গ্রীষ্মে। দোয়েল তো রবিনেরই কোনো এক দূর বা নিকট প্রজাতি। দোয়েলকে বলা হয়, দ্য ম্যাজিক রবিন। এসো জল দিই। পানি দিই বাংলার পাখিকে। নজরুলের জন্মদিনে বুলবুল গেয়েছে, শ্যামাও গেয়েছে। সমস্ত শহরে ও গ্রামে। এখন দুঃসময় পৃথিবীর। ‘দুঃসময়’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন: ‘ওরে বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,/এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা।’ পৃথিবীর পাখিরা যেন তাদের পাখা বন্ধ করতে বাধ্য না হয়।

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

রস 

পরম্পরা 

বঙ্গবন্ধু ও চলচ্চিত্রের একটি অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থ

তামাশা 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

কালো সূর্য

থাই মহাকাব্য রামাকীইন-কথা

পথের শেষ কোথায়? ঘৃণার শেষ কোথায়?

বাংলাদেশপ্রেমিক একজন কবি