বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ঢাকা উত্তর বিএনপির বহিষ্কৃত নেতাদের দেওয়া হয়নি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ

আপডেট : ১৪ জুন ২০২২, ০০:৫৩

ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ওয়ার্ড সম্মেলনে ‘বিশৃঙ্খলা’ সৃষ্টির অভিযোগে স্থানীয় ১৪ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই ঘটনায় দলের অঙ্গ এবং সহযোগী সংগঠনের আরও ১২ থেকে ১৫ জন নেতাকে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাদের চিঠিও সংশ্লিষ্ট সংগঠনের মাধ্যমে যেকোনো সময় দেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে। 

একাধিক সূত্র এটি নিশ্চিত করেছে যে, এই পুরো বহিষ্কারের প্রক্রিয়াটি দলীয় গঠনতন্ত্রের পরিপন্থি হয়েছে। এদের কাউকেই কারন দর্শানোর নোটিশ এমনকি তদন্ত কমিটির পক্ষ থেকে তাদের সাথে কথা বলা বা আত্মপক্ষ সমর্থনের ন্যূনতম অধিকারটুকুও দেওয়া হয়নি। 

উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমান উল্লাহ আমান ও সদস্য সচিব আমিনুল হক এই বহিষ্কারাদেশ অনুমোদন দিয়েছেন। যদিও এই বহিস্কার আদেশের উদ্দেশ্য নিয়ে যথেষ্ঠ প্রশ্ন উঠেছে। বহিষ্কার হওয়া নেতাদের দাবি, ইউনিট কমিটি গঠনে নগরের দেওয়া নির্দেশনা না মেনে একতরফা ভাবে কিছু নেতাকে সুবিধা দিতে গিয়ে প্রতিবাদের মুখে পড়েন নগর উত্তর বিএনপির সদস্য সচিব আমিনুল হক। প্রতিবাদের সময় মারধর বা লাঞ্চিত করার মত কোনও ঘটনা ঘটেনি। প্রতিবাদের মুখে আমিনুল হক ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে চাইলে প্রতিবাদকারীরা তার গাড়ীর সামনে শুয়ে পড়ে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখেন। যার স্পষ্ট ভিডিও ফুটেজ রয়েছে। শুধুমাত্র প্রতিবাদ করার কারনে এতজন নেতার বহিস্কার উচিত হয়নি। 

বহিষ্কার হওয়া দুই নেতা ঘটনার বর্ণনা করে বলেন, উত্তরা-৭ নম্বর সেক্টরে বিএনপির এক নেতার বাসায় গত ৫ জুন ছিল পূর্বনির্ধারিত উত্তরা পশ্চিম জোনের সাংগঠনিক ওয়ার্ড ১, ৫১ এবং বিমানবন্দর সাংগঠনিক ওয়ার্ড সম্মেলন। ওই সম্মেলনের বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই একতরফাভাবে ওয়ার্ডসহ সংশ্লিষ্ট ইউনিটের কমিটি গঠন এবং কাউন্সিল করার ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরে সব পক্ষকে সমন্বয় করতে বলা হয়েছিল এবং সমাধান চেয়ে বারবার চিঠিও দেওয়া হয়েছে। নগরের নির্দেশনায় প্রতিটি ওয়ার্ডের ইউনিট কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে আহবায়ক, প্রথম ও দ্বিতীয় যুগ্ম আহবায়ক-এর স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। কিন্তু নগর নেতারা নিজেদের ঘোষিত রেজ্যুলেশন ভেঙ্গে একতরফাভাবে কিছু নেতাকে সুবিধা দিয়ে কমিটিগুলো ঘোষনা করে দেয়। যাতে ভোটের মাঠ সমতল না হওয়ার জোরালো অভিযোগ মহানগর উত্তরের নেতারা আমলে নেননি। এছাড়া অনুষ্ঠিত ওয়ার্ড সম্মেলনের ভোট গননার সময় প্রার্থীর এজেন্টকে গননার বাক্স থেকে দূরে সরিয়ে দিয়ে রেজাল্ট ঘোষণারও অভিযোগ উঠে। বারংবার অনুরোধ করা সত্বেও প্রার্থীদের কোন এজেন্টকেই গননার সময় থাকতে দেওয়া হয়নি।

নেতারা আরো বলেন, ক্ষুব্ধ কয়েকশ নেতাকর্মী ওই ঘটনার নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদ করে সেদিন স্লোগান দিচ্ছিল। ওই সময় মহানগর উত্তরের সদস্য সচিব আমিনুল হক সেখানে উপস্থিত হন। প্রতিবাদ ও স্লোগানের মুখে আমিনুল হক চলে যেতে চাইলে নেতাকর্মীরা আমিনুল হকের গাড়ির সামনে শুয়ে পড়ে। সেখানে বিক্ষোভরত নেতাকর্মীরা সম্মেলনের আগে সমন্বয়ের দাবীতে স্লোগান ও শুয়ে পড়া ছাড়া কোনও প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা নিশ্চিত করেছেন। মুলত পাতানো কাউন্সিলের এবং সমন্বয়হীন কমিটি গঠনের অভিযোগ থেকে রেহাই পেতেই এমন গণ বহিস্কারের ঘটনা ঘটিয়ে মূল ঘটনা ধামাচাপা দেবার চেষ্টা করা হয়েছে। 

এ দিকে নগর উত্তর বিএনপির একজন প্রভাবশালী নেতা প্রতিবেদককে বলেন, বহিষ্কার আদেশের চিঠি দিতে গিয়ে সদস্য সচিব আমিনুল হক জেদের বশবর্তী হয়ে কাজ করেছেন তা স্পষ্ট প্রতিয়মান। এ ধরনের আদেশ বা বিজ্ঞপ্তি বিএনপিতে নজিরবিহীন এবং গঠনতন্ত্র পরিপস্থি। তিনি বলেন, গত ১১ জুন নগরের দেওয়া চিঠিতে সংশ্লিষ্ট ১৪জন নেতাকে বিএনপি থেকে বহিস্কার না করে তাদের উত্তর বিএনপির সাংগঠনিক পদ থেকে বহিস্কার করা হয়েছে, অথচ বহিস্কৃত ১৪ নেতা বহিস্কারের দিন কোন পদেই ছিলেন না। তারা সবাই বিভিন্ন ওয়ার্ড এবং থানার সাবেক নেতা। তাই সাংগঠনিক পদ থেকে কিভাবে বহিস্কার করলেন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, এটি আসলে বহিস্কার নয় বরং অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে একতরফা ও সমন্বয়হীন কমিটি গঠনের ঘটনা চাপা দেবার প্রতিফলন মাত্র। তাছাড়া প্রাথমিকভাবে দলীয় মনোনয়ন প্রাপ্ত এক নেতাকে বিএনপির কেউ নয় বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রচার করলেও জাতীয় নির্বাচন-২০১৮ তে ঢাকা-১৮ আসনে তিনি দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাক্ষরিত প্রাথমিক মনোনয়নের চিঠি পেয়েছিলেন। এখানে মহাসচিব এবং দলীয় চেইন অফ কমান্ডও ভঙ্গ হয়েছে বলে অভিযোগ এসেছে।  

সেদিন ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন উত্তরা পশ্চিম থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল হৃদয়। তিনি বলেন, ‘আমরা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনা মেনে রাজনীতি করি। কাউকে বাদ দিয়ে নয়; সবাইকে নিয়ে রাজনীতিতে বিশ্বাসী তিনি। কিন্তু উত্তরাতে যা হয়েছে তা একতরফা হয়েছে। আমরা কয়েক’শ নেতাকর্মী উপস্থিত হয়ে সমন্বয় করতে বলেছিলাম। সেখানে আমিনুল ভাইয়ের সঙ্গে কেউ কোনো অসৌজন্যমূলক ব্যবহার করেনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের বিশ্বাস, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের মাধ্যমে তদন্ত করে সঠিক তথ্য জানতে পারলে তিনি বিগত আন্দোলন সংগ্রামে আমাদের ভূমিকার কারণে বহিষ্কার নয়; পুরষ্কৃত করবেন।’

এদিকে, ওই ঘটনায় উত্তরের যুগ্ম আহ্বায়ক আক্তার হোসেনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেই তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই শাস্তি দেওয়া হয়েছে। যদিও তদন্ত কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বহিষ্কৃত নেতারা। তদন্ত কমিটি অভিযুক্ত কারও বক্তব্য নেন নি এবং কাউকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও দেননি। একতরফা ভাবে তড়িঘড়ি করে ম্যাডামের অসুস্থতার প্রথম দিনের সংকটকালীন সময়ের সুযোগ নিয়ে বহিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে বলেও তারা দাবী করেন।

ইত্তেফাক/ ইআ