বুধবার, ১৭ আগস্ট ২০২২, ১ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বিএনপির কারণে হারলেন সাক্কু!

আপডেট : ১৭ জুন ২০২২, ০০:৫৮

কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে নগরজুড়ে চলছে নানা আলোচনা। গত দুইবারের মেয়র মো. মনিরুল হক সাক্কুর পরাজয়ের কারণ নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণও।

স্হানীয়রা বলছেন, নিজ দলের কারণেই হেরে গেছেন বিগত দুইবারের মেয়র ও বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত মো. মনিরুল হক সাক্কু। তারই প্রতিদ্বন্দ্বী স্বেচ্ছাসেবক দল থেকে বহিষ্কৃত নিজাম উদ্দিন কায়সারের জন্য তিনি হেরেছেন। কারণ তাদের দুইজনের (সাক্কু-কায়সার) একত্রিত ভোট সংখ্যা নৌকার প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটের প্রায় দেড়গুণ। একই মেরুর দুই প্রার্থীর কারণে এখানে বিএনপির নেতাকর্মীরা বিভক্ত ছিল, যে কারণে নৌকার প্রার্থীর ভাগ্য প্রসন্ন হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। গত বুধবার সাক্কুকে মাত্র ৩৪৩ ভোটে পরাজিত করে কুমিল্লার মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের আরফানুল হক রিফাত।

ভোটার বলছেন, ভোটের মাঠে সরকার দলীয় প্রার্থীর পাশাপাশি নিজদলের বহিষ্কৃত প্রার্থীর বিরুদ্ধে লড়াই করে পেরে উঠেননি সাবেক দুইবারের মেয়র। মূলত বিএনপির ভোট দুভাগে বিভক্ত, নিজের পক্ষের ঘনিষ্ঠ নেতাদের প্রকাশ্যে মাঠে না নামাতে পারা, সাংগঠনিক ব্যর্থতা, কিছু কেন্দ্রে এজেন্ট না থাকা সাক্কুর জন্য কাল হয়েছে। এদিকে কুমিল্লা সিটির ১০৫টি ভোটকেন্দ্রের ফলাফলে ৫৬টিতেই ছিল নৌকার আধিপত্য। ৪৯টি কেন্দ্রে জিতেছেন সাক্কু। আর প্রতিটি কেন্দ্রেই তৃতীয় হয়েছেন বিএনপির বহিষ্কৃত আরেক প্রার্থী কায়সার।

সাক্কুর হারের আরো কিছু কারণ

কুমিল্লা সিটি নির্বাচনে পাঁচজন মেয়র প্রার্থী প্রাতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী তিনজনের দুইজনই বিএনপির রাজনীতির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীন কোন নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। দলীয় সেই সিদ্ধান্ত অমান্য করে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক সাক্কু ও কুমিল্লা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি নিজামউদ্দিন কায়সার স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নেন। পরবতী‌র্তে বিএনপি সাক্কু এবং কায়সারকে দল থেকে বহিষ্কার করে। এরপরও নির্বাচনে মাঠে নামেন সাক্কু আর কায়সার। এই কারণে বিএনপির ভোট সাক্কু আর কায়সারের বাক্সে ভাগ হয়ে যায়। তবে সাক্কু যে ভোট পেয়েছেন, তার অধিকাংশ সাধারণ ভোটারের ভোট। আর নিজাম উদ্দিন কায়সারের বাক্সে গেছে বিএনপির অধিকাংশ ভোট। দল থেকে সাক্কুকে আজীবন বহিষ্কারের পাশাপাশি তার পক্ষে কোনো ধরনের প্রচারণায় অংশ না নিতে দলের কড়া নির্দেশনাও ছিল। 

এছাড়া দুইবার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সাক্কুর বিরুদ্ধে সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন কাজে অনিয়মের অভিযোগও আছে। জলাবদ্ধতা ও যানজট নিরসনে ব্যর্থতা, নতুন ভোটারদের কাছে টানতে না পারা এবং এবারের নির্বাচনে আগের মতো স্হানীয় আওয়ামী লীগের একটি অংশের আনুকূল্য না পাওয়া সাক্কুর পরাজয়ের কারণের তালিকায় আছে। এছাড়া সাংগঠনিক ব্যর্থতা, কর্মীর অভাবও সাক্কুর পরাজয়ের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্হানে ছিলেন নৌকার প্রার্থী আরফানুল হক রিফাত। বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের যে অংশটি সাক্কুর পক্ষে ছিল বলে প্রচারণা রয়েছে, সেই অংশটির প্রার্থী ছিলেন রিফাত। তাই একদিকে বিএনপির সমর্থন না পাওয়া এবং অন্যদিকে অনেকটা বিদ্রোহী হিসেবে ভোটের মাঠে একই আদর্শের কায়সারের প্রার্থিতা মিলিয়ে সাক্কুর জন্য এবারের নির্বাচনটা এমনিতেই জটিল ছিল।

কুমিল্লার বিভিন্ন পর্যায়ের লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সাক্কুর পরাজয়ের পেছনে স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী নিজাম উদ্দিনের প্রায় ৩০ হাজার ভোটপ্রাপ্তি একটি বড় কারণ। ধারণা করা হচ্ছে, ভোট এভাবে ভাগ না হলে অধিকাংশ ভোট যেত সাক্কুর বাক্সে। সে ক্ষেত্রে তার পাওয়া ৪৯ হাজার ৯৬৭ ভোটের সঙ্গে আরও ভোট যুক্ত হতো। মেয়র পদে বেসরকারিভাবে জয়ী রিফাত ৫০ হাজার ৩১০ ভোট পেয়েছেন। তাদের দুজনের ভোটের পার্থক্য মাত্র ৩৪৩।

এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের-সুজন কুমিল্লা জেলার সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খান বলেন, বিএনপির ভোট দুই ভাগ হয়ে যাওয়ায় মূলত সাক্কুর পরাজয় হয়। সাক্কু যে ভোট পেয়েছেন, তার অধিকাংশ সাধারণ ভোটারের ভোট। একই ঘরানার কায়সারের বাক্সে গেছে বিএনপির অধিকাংশ ভোট। বিএনপির সরব-নীরব সমর্থন না থাকায় এবার সাক্কু হেরেছেন বলেই মনে করা হচ্ছে।

কেন্দ্রভিত্তিক ফল বিশ্লেষণ

১০৫টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ৪৯টিতে নৌকার প্রার্থী প্রথম হতে পারেননি। এর মধ্যে নগরীর দক্ষিণাংশের ৯টি ওয়ার্ডের ৭টি কেন্দ্রে এবং আদর্শ সদরের ১৮টি ওয়ার্ডের ৪২টি কেন্দ্রে নৌকার প্রার্থী দ্বিতীয় অবস্হানে রয়েছেন। অপর ৫৬টিতে সাক্কু নৌকার প্রার্থীর চেয়ে কম ভোট পেয়েছেন। তবে ঘোড়া প্রতীকের স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী নিজাম উদ্দিন কায়সার সবগুলো কেন্দ্রেই তৃতীয় অবস্হানে রয়েছেন। ভোট পড়েছে ৫৮.৭৪ শতাংশ। ২০১৭ সালে ভোট পড়েছিলো ৬৫ শতাংশ।

ফল পালটানোর সুযোগ নেই রিটার্নিং অফিসারের: ইসি আলমগীর

ভোটের ফলাফল বদলানোর সুযোগ রিটার্নিং অফিসারের নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর। তিনি বলেছেন, ফলাফলে রিটার্নিং অফিসারের তো পরিবর্তন, পরিবর্ধন করার সুযোগ নেই। কেন্দ্র থেকে প্রিজাইডিং অফিসার ডাটা দিয়েছেন, সেটা উনি ঘোষণা করেছেন। এখানে রেজাল্ট ম্যানিপুলেট করার কোনো সুযোগ নেই। এ ফলাফল প্রার্থী, তাদের এজেন্ট, ও অন্যদের কাছেও আছে। গতকাল বৃহস্পতিবার নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে একথা বলেন তিনি।

রিটার্নিং অফিসার যা বলেন

গতকাল দুপুরে জেলা নির্বাচন কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন রিটার্নিং অফিসার মো. শাহেদুন্নবী চৌধুরী। ফলাফল ঘোষণার সময়ের পরিস্হিতির বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ফলাফল ঘোষণার সময় দুই পক্ষের নেতাকর্মী ও অনুসারীদের মুখোমুখি অবস্হানের কারণে তখন যে পরিস্হিতি সৃষ্টি হয়েছিল, সেই পরিস্হিতি সম্পর্কে আমি ফোনে কথা বলছিলাম সিইসি, ডিসি ও এসপির সঙ্গে। অন্য কারও ফোন আসেনি। একটি ফোনের কারণে ফলাফল ম্যানিপুলেশন হয়েছে, একজন প্রার্থীর পক্ষ থেকে যে ইঙ্গিত করা হচ্ছে, সেটা ঠিক নয়। 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি