সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

আপডেট : ১৭ জুন ২০২২, ১০:৫৫

আষাঢ় মাসের প্রথম দিনটিকে সংস্কৃতভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ কবি কালিদাস অমর করে রেখে গেছেন তাঁর ‘মেঘদূতম’ কাব্যটি রচনার মাধ্যমে। কালিদাসের জন্মকাল ও জন্মস্থান, বা তাঁর জীবনের প্রায় কোনো তথ্য-ই জানা নেই আমাদের। কিন্তু আশ্চর্য এটাই যে কালিদাস-অনুষঙ্গে পয়লা আষাঢ় এতটাই খ্যাতি পেয়ে গেছে যে এই দিনটিকেই তাঁর জন্মদিনরূপে ভারতের বিভিন্ন স্থানে উদযাপন করা হয়।

পয়লা আষাঢ় ও মেঘদূত ওতপ্রোত হয়ে আছে। কীভাবে? তা জানবার আগে মেঘদূত কাব্যটির প্রতি বিহঙ্গাবলোকন জরুরি। কালিদাসের রচনা মূলত সাতটি গ্রন্থ, যা পণ্ডিতমণ্ডলীর দ্বারা স্বীকৃত। এর মধ্যে তিনটি নাটক—অভিজ্ঞানশকুন্তলম, মালকাগ্নিমিত্রম ও বিক্রমোর্বশীয়ম। সংস্কৃতে নাটককে বলা হয়— দৃশ্যকাব্য। কাব্য শব্দটি যেহেতু ক্লীবলিঙ্গ, তাই এ-ভাষায় যত সাহিত্য রচিত হয়েছে, সেসবের নাম ক্লীবলিঙ্গেই হয়। আমরা কিন্তু অতঃপর বাংলায় ক্লীবলিঙ্গ বাদ দিয়েই লিখব।

কালিদাসের অন্য চারটি গ্রন্থ— রঘুবংশ, কুমারসম্ভব, ঋতুসংহার ও মেঘদূত। প্রথম দুটি মহাকাব্য পর্যায়ের, আর অন্য দুটিকে বলা হয় খণ্ডকাব্য। মেঘদূত আবার ‘দূতকাব্য’ নামেও আখ্যাত। সমগ্র পুরস্কৃত সাহিত্যে ‘মেঘদূত’ যে কতখানি জনপ্রিয় তার প্রমাণ—প্রায় পঞ্চাশজন ব্যক্তি এর টীকা রচনা করেছেন। পুরস্কৃত সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য হলো, বিখ্যাত সব গ্রন্থের টীকা রচনা। টীকা হলো গ্রন্থকার ও পাঠকের মধ্যে সেতু। পাঠক কোনো গ্রন্থের টীকা না পড়লে কবির যথার্থ অভিপ্রায় বুঝতে পারেন না। এজন্যই টীকার গুরুত্ব। আবার টীকার মধ্যে যদি অসম্পূর্ণতা বা ত্রুটি থাকে, সেজন্য লেখা হতো টিপ্পনী। সাধারণত কোনো গ্রন্থের দু-তিনটির বেশি টীকা লেখা হয় না। ‘মেঘদূত’-এর হয়েছে পঞ্চাশেরও অধিক। অর্থাত্ বলা যায়, পঞ্চাশোর্ধ সাহিত্য সমালোচক ‘মেঘদূত’, তার প্রতিটি শ্লোকের-ই নয়, প্রতিটি পদের ব্যাখ্যা করেছেন। কাব্যটি কতটা রসোত্তীর্ণ হলে তা সম্ভব, আশা করি তা এই তথ্যের মাধ্যমেই উপলব্ধি করা গেছে। শেক্সপিয়রের একেকটি নাটক নিয়ে পঞ্চাশ বা তার বহুগুণ বেশি বই লেখা হয়েছে, তবে প্রতিটি পদ ধরে আলোচনা হয়নি। রবীন্দ্রনাথের কোনো একক বই নিয়ে কি পঞ্চাশটি আলোচনাগ্রন্থ (গ্রন্থ, প্রবন্ধ নয় কিন্তু) বেরিয়েছে? না।

‘মেঘদূত’ বাংলাভাষাতেই অনূদিত হয়েছে শতাধিক অনুবাদকের হাত দিয়ে—রঙ্গলাল বন্দ্যােপাধ্যায় থেকে বুদ্ধদেব বসু ও তাঁর পরবর্তীদের হাতে। ইংরেজিসহ ইউরোপীয় নানা ভাষায় এটি অনূদিত হয়েছে। এর মাধ্যমেও ‘মেঘদূত’-এর জনপ্রিয়তা ও কাব্যমূল্য বোঝা যায়। মেঘদূত ও পয়লা আষাঢ়, সামীপ্য কোথায়? বইটিতে আছে স্বর্গনিবাসী কুবেরের অভিশাপে তার উদ্যানপরিচারক যক্ষের এক বছরের জন্য পৃথিবীতে নির্বাসনলাভ। কুবের দেবতা না হলেও স্বর্গের দেবতাদের ধনরক্ষক হেতু স্বর্গে বাস করার অধিকারী। কুবেরের মালী বলে যক্ষও তাই। যক্ষের অপরাধ যে খুব গুরুতর, তা কিন্তু নয়। কুবেরের উদ্যান পরিচর্যাকালীন সে তার স্ত্রীর কথা ভাবছিল। বাগান ও ফুলের অনুষঙ্গে যক্ষের এই ভাবনাটি তো আমাদের কাছে নন্দনানুমোদিতই মনে হয়। অভিসম্পাৎ দেবার মতো অপরাধ কি এটি? তা প্রভুরা তো দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, অতএব—!

যক্ষকে একমাস নির্বাসনে কাটাতে হবে যে সে জায়গায় নয়, কুবের নির্দেশিত রামগিরিতে। রামগিরি কেন? কারণ যক্ষের কান্তাবিরহ আরো বেশি হবে এখানে নির্বাসিত জীবনযাপনে। বনবাসকালে রামসীতা যে এখানে বাস করেই রাজসুখ বিসর্জন দিয়েও সুখী ছিলেন, সেজন্য।

একবছরের মধ্যে আট আটটি মাস প্রিয়াবিরহী হয়ে কাটল যক্ষের। এর পরেই এলো আষাঢ় মাস, যে মাসের প্রথম দিনটিতে রামগিরি পাহাড় বেয়ে বৃষ্টিধারা নেমে এসে দ্রব করে দেবে যক্ষের মন। তার মনে হলো, এক মত্ত হাতি যেন তার শুঁড়ের আঘাতে আঘাতে ভূমি খননের খেলায় মেতেছে। যক্ষের হূদয়ে যে পত্নীবিরহের সঞ্চিত বেদনা, পয়লা আষাঢ়ের ধারাপাত যেন তাকে অর্গলমুক্ত করে দিল। এইভাবে কালিদাস সমগ্র মানবজাতির ভাষ্যকার হয়ে বলছেন, মেঘদর্শনে সুখী ব্যক্তির চিত্তও ব্যাকুল হয়, আর কণ্ঠ-আলিঙ্গনে উত্সুক যার প্রিয়া এ-মুহূর্তে দূরবর্তী, তার অবস্থা তো শোচনীয় হবেই।

যার কথা বলা হচ্ছে, যক্ষ জায়া একাধারে স্ত্রী ও প্রেমিকা। কণ্ঠে কণ্ঠে আলিঙ্গনের নাজুক মরমিয়া অনুভূতি নিয়ে এসে প্রেমের যে-ছবি আঁকলেন, আর সেইসঙ্গে পয়লা আষাঢ়কে যেভাবে গ্রথিত-সংযুক্ত-মাত্রান্বিত করে দিলেন, বিশ্বের কাব্যেতিহাসেই তা তুলনারহিত, মধুময়, অপার্থিব ও আবহমানকালের নন্দনানুমোদিত। বিরহ, বিরহের ঐশ্বর্য ও সম্ভান্ততা যেন এখানে মূর্ত হয়ে উঠল। সন্তকবি কবীর বলেছেন, ‘বিরহ হ্যায় এক সুলতান!’ সেই সুলতানের সুলতানিয়াতের আওতায় চলে এলো কালিদাসের এই শ্লোকটি।

বিরহের সঙ্গে বর্ষা ঋতুর নিবিড় যোগ রয়েছে। বৈষ্ণবকবি বিদ্যাপতির অমর পদাবলি ‘এ ভরা বাদর, মাস ভাদর, শূন্য মন্দির মোর‘ মনে পড়ে আমাদের। ভরা বাদরকে যে শূন্যতার বেদনা ভরা নিশ্বাস দিয়ে ভরিয়ে তুলেছেন কবি, তার নিবিড় ও মরমি বেদনা যুগের পর যুগ পার হয়ে আজকের দিনের মানুষকেও বিষাদে মর্মরিত করে। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের বর্ষা বিষয়ক কবিতা ও বিশেষ করে গানে বর্ষার যে মহিম্নস্তোত্র, সেখানে ‘দাও আর আকুলিয়া ঘন কালো কেশ,/পরো মেঘনীল বেশ’-এর মধুর আহ্বান যেমন আছে, তেমনি আছে বর্ষার আবহে বিধুরতা, বেদনা, দুঃখাভিভব ও অরুন্তুদ হূদয়মথিত দীর্ঘশ্বাসের ছবিও, ‘শ্যামল তমালবনে যে পথে সে চলে গিয়েছিল বিদায়গোধুলিখনে/বেদনা ছড়ায়ে আছে, তারি ঘাসে, কাপে নিঃশ্বাসে!/সেই বারেবারে ফিরে ফিরে চাওয়া/ধুলায় রয়েছে লেগে, মেঘে মেঘে!’

শেক্সপিয়র যে জেনেছিলেন, Rain is nature's way of washing the world clean, সে হলো বর্ষানুভবের আরেক পাঠ।

অতএব বর্ষা বিরহকে অতল আয়তন দেয়। কালিদাস ‘মেঘদূত’-এ দুঃখের মায়াবী আখরে তা লিখে গেছেন। আষাঢ়ের ঠিক প্রথম দিনটিতেই যে বর্ষার আবির্ভাব ঘটে, তা হয়তো নয়। তবে কালিদাস তাঁর কল্পনায় আষাঢ়ের সূচনা দিবসটিকেই নববর্ষার আগমনলগ্নরূপে মাহাত্ম্য দিয়ে গেছেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘মেঘদূত’ কবিতায় সেই কবিপ্রসিদ্ধিকেই মান্যতা দিয়ে লিখলেন, ‘কবির! কবে কোন বিস্মৃত বর্ষে/কোন পুণ্য আষাঢ়ের প্রথম দিবসে/লিখেছিলেন মেঘদূত!’

এ-কাব্যের ১১২টির মতো শ্লোক যে একদিনের মধ্যেই লিখে শেষ করা হয়েছিল, তা অবশ্যই নয়। বা আষাঢ় মাসেই কাব্যটি লেখা হয়েছিল, এমন কোনো পাথুরে প্রমাণও নেই। তাই এখানেও সেই পয়লা অষাঢ়কে মান্যতা দেওয়া। এইভাবে রবীন্দ্রনাথও জয় ঘোষণা করলেন পয়লা আষাঢ়ের।

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

রস 

পরম্পরা 

বঙ্গবন্ধু ও চলচ্চিত্রের একটি অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থ

তামাশা 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

কালো সূর্য

থাই মহাকাব্য রামাকীইন-কথা

পথের শেষ কোথায়? ঘৃণার শেষ কোথায়?

বাংলাদেশপ্রেমিক একজন কবি