গোপনীয়তার সুযোগে বাড়ছে সুইস ব্যাংকে জমানো অর্থ

আপডেট : ১৮ জুন ২০২২, ০৫:০০

পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে সরকারের প্রণোদনা নিয়ে যখন আলোচনা-সমালোচনা চলছে, এই সময়ে সামনে এলো সুইস ব্যাংকের রিপোর্ট। এক বছরের ব্যবধানে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমানো অর্থের পরিমাণ প্রায় ৫৫ শতাংশ বেড়েছে। ২০১২ সাল থেকে বার্ষিক প্রতিবেদনে দেশ ভিত্তিক তথ্য প্রকাশ করছে সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি)। এর মধ্যে গেল বছর অর্থাৎ ২০২১ সালে দেশটির বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশি নাগরিকদের জমানো অর্থের রেকর্ড গড়েছে। 

২০২১ সালে বাংলাদেশি নাগরিকদের আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৭ কোটি ১১ লাখ সুইস ফ্রাঁ। দেশীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ ৮৩৩১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা (প্রতি সুইস ফ্রাঁ ৯৫.৬৫ টাকা হিসাবে)। এক বছর আগে অর্থাৎ ২০২০ সালে এর পরিমাণ ছিল ৫৬ কোটি ২৯ লাখ ফ্রাঁ (৫৩৮৩.৮৯ কোটি টাকা)। সে হিসাবে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমানো অর্থের পরিমাণ প্রায় ৫৪ দশমিক ৭৯ শতাংশ বেড়েছে। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, অনিশ্চয়তাসহ নানা কারণে বিত্তবানরা দেশকে নিরাপদ মনে করছেন না। ফলে বিভিন্ন উপায়ে অর্থ পাচার হচ্ছে। অবশ্য সুইস ব্যাংকে জমানো সব অর্থই পাচার হওয়া এমনটা নয়। অনেকেই মনে করেন, দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অর্থ রাখার ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা এবং বিনিয়োগের যথাযথ পরিবেশ না থাকায় দেশের বাইরে, বিশেষ করে সুইস ব্যাংকগুলোতে গত এক বছরে বাংলাদেশ থেকে রাখা অর্থের পরিমাণ বাড়তে পারে। 

এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর ইত্তেফাককে বলেন, সুইস ব্যাংকের জমানো অর্থ সব পাচার হয়ে দেশ থেকে গেছে এমনটি বলা যাবে না। কারণ প্রবাসী বাংলাদেশিরাও সেখানে টাকা জমা রাখছে। তাছাড়া দেশের বিভিন্ন ব্যাংক আন্তর্জাতিক লেনদেনের জন্যও অর্থ জমা রাখতে পারেন। সেখানে জমানো অর্থের কিছু অংশ পাচার হয়েও যেতে পারে। তবে আলাদা করে তথ্য প্রকাশ না করলে প্রকৃত ভাবে বলা যাবে না কত টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। এ কথা ঠিক যে, দেশ থেকে টাকা পাচার হচ্ছে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশিদের অর্থ পাচারের বড় গন্তব্য হলো পশ্চিমা দেশগুলো। তাছাড়া দুবাই, মালয়েশিয়া এসব দেশেও টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

দীর্ঘকাল যাবতৎ নাম পরিচয় গোপন রেখে অর্থ জমা রাখার জন্য ধনীদের আকর্ষণীয় গন্তব্য হলো সুইজারল্যান্ড। সুইস ব্যাংকে থাকা এই অর্থের একটি অংশ পাচার হয়ে থাকে বলে ধারণা করা হয়। নাম পরিচয় গোপন থাকায় সুইস ব্যাংকগুলোতে সারাবিশ্ব থেকেই বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ রাখা হয়। সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকিং আইন অনুযায়ী সেখানে ব্যাংক গ্রাহকদের গোপনীয়তা কঠোরভাবে রক্ষা করা হয়। তবে ২০০২ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী অর্থ পাচার রোধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ব্যাপকভাবে কার্যকর হওয়ার পর বার্ষিক ভিত্তিতে জমা টাকার হিসাব দিচ্ছে সুইজারল্যান্ড। বছর ভিত্তিতে কোন দেশের কত টাকা জমা আছে সে তথ্য তারা প্রকাশ করছে। তবে কারো ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা হয় না।

তবে কোন অপরাধের গোপনীয়তার এই নীতি প্রযোজ্য নয়। অর্থাৎ সেখানে গচ্ছিত অর্থ যদি কোন অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে গ্রাহকের পরিচয় প্রকাশে কোন বাধা নেই। সুইস ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের ওয়েবসাইটে বলা হয়, অপরাধের তদন্তের ক্ষেত্রে সুইস ব্যাংকগুলো তাদের গ্রাহকদের পরিচয় প্রকাশে বাধ্য, সেই অপরাধ সুইজারল্যান্ডেই হোক, আর অন্য কোন দেশেই হোক। তবে সেজন্য সেসব অপরাধে ঐ গ্রাহকের সম্পৃক্ত থাকার প্রমাণ দেখাতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, সুইজারল্যান্ডের আইনি ব্যবস্হার কারণে সেদেশের ব্যাংকগুলোয় কাদের কি পরিমাণ অর্থ রয়েছে, এমন তথ্য বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের কাছে নেই। তবে অনেকেই অবৈধ পথে অর্জিত কালোটাকার মালিকরাই মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে দেশের বাইরে টাকা নিয়ে গিয়ে সুইস ব্যাংকে জমা করতে পারেন। সুইস ব্যাংকগুলো সেখানে জমানো টাকার উৎস জানতে চায় না, অর্থ বৈধ নাকি অবৈধ পথে উপার্জিত সেটা জানতে চায় না, গ্রাহকের পুরোপুরি গোপনীয়তা রক্ষা করে, ফলে শুধু বাংলাদেশ নয়, উন্নত দেশগুলোর বাসিন্দাদেরও কর ফাঁকি বা অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ এসব ব্যাংকে তারা জমা রাখেন।

উল্লেখ্য, এর আগে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দিয়ে তাগাদা দেওয়া হয়েছিল যেন তারা ভারত বা যুক্তরাজ্যের মতো সুইস ব্যাংকের সঙ্গে তথ্য বিনিময়ের একটি সমঝোতা স্মারক করে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, সেরকম কোন সমঝোতা এখনো সুইস ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের হয়নি। কয়েক বছর ধরে সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে তথ্য চাওয়া হলেও তারা কোন সাড়া দেয়নি। এদিকে ভারত সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে ‘অটোমেটিক এক্সচেঞ্জ অব ইনফরমেশন’ চুক্তি করার মাধ্যমে ভারতীয় নাগরিকদের সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হচ্ছে। বাংলাদেশ এ ধরনের কোন চুক্তি না করলে আদৌ কোন তথ্য পাবে না।

ইত্তেফাক/এএইচপি