প্রতি বছর বর্ষা আসলেই প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ বসতি সরাতে অভিযান শুরু করে। এভাবে বছরের পর বছর ধরে অভিযানের পরেও চট্টগ্রামে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি সরানো যায়নি। দেখা গেছে, দিনে উচ্ছেদ অভিযান চালালে রাতেই আবার ফিরে আসেন ঐসব বাসার বাসিন্দারা। এভাবে চলছে প্রশাসন ও বাসিন্দাদের মধ্যে পাহাড়ে বসতি ভাঙা ও গড়ার খেলা।
শুধু চট্টগ্রাম মহানগরী এলাকাই নয়, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পাহাড়ি এলাকাতেও অবৈধ বসতি বেড়েই চলছে। নদীভাঙনে বসতভিটা হারানো ও ভূমিহীন মানুষ মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে পাহাড়ে বসতি গড়ে তুলছে। জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, স্থায়ী পুনর্বাসন করা না গেলে পাহাড়ে অবৈধ বসতি ঠেকানো যাবে না।
চট্টগ্রামে ২০০৭ সালে ১১ জুন ভয়াবহ পাহাড় ধসের ঘটনায় ১২৭ জন মারা যান। তারপর থেকে আরো একাধিকবার পাহাড় ধসে অসংখ্য নারী, পুরুষ ও শিশু মারা গেছে। সর্বশেষ গতকাল শনিবার পাহাড় ধসে চার জন মারা গেছে। চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে একটি পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি রয়েছে। গত ১০ ফেব্রুয়ারি কমিটি বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল পাহাড়ে অবৈধ ঝুঁকিপূর্ণ বসতিতে পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজ উদ্যোগে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু কার্যত কোনো উদ্যোগ নেয়নি প্রতিষ্ঠানগুলো।
চট্টগ্রাম নগরীতে পাহাড়গুলোর মালিকানায় রয়েছে সিটি করপোরেশন, রেলওয়ে, ওয়াসা ও গণপূর্ত বিভাগ। এছাড়া অনেক পাহাড় বেসরকারি মালিকানাধীন রয়েছে। কিছু পাহাড় নিয়ে আদালতে মামলাও রয়েছে। জেলা প্রশাসনের করা তালিকামতে চট্টগ্রাম মহানগরী এলাকায় ১৭টি পাহাড়ের মধ্যে ১০টি ব্যক্তি মালিকানাধীন ও সাতটি সরকারি বিভিন্ন সংস্থার। সরকারি ও বেসরকারি এসব পাহাড়ে ৮৩৫টি ঝুঁকিপূর্ণ বসতি চিহ্নিত করে তালিকা তৈরি করা হয়। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে অবৈধ বসতি আরো কয়েক গুণ বেশি হবে।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, এসব বসতি যারা নিয়ন্ত্রণ করেন তারা প্রভাবশালী। কিন্তু বসবাসকারী মানুষগুলো নিঃস্ব। তাদের থাকার জায়গা নেই। নিম্ন আয়ের এসব মানুষ কম টাকায় ভাড়ায় নিয়ে বসবাস করছেন। আর ভূমিদস্যুরা পাহাড় অবৈধ দখলে রাখার জন্য অসহায় মানুষগুলোকে ব্যবহার করছে। নগরীর মতিঝরনাসহ বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ে পাকা বিল্ডিং নির্মিত হয়েছে। এখানে বসতিগুলোতে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সংযোগও রয়েছে। এসব সুবিধার ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন পাহাড় দখলে রাখা ব্যক্তিরা।
নগরীতে পাহাড়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বসতি রয়েছে লালখান বাজার, খুলশী, পাহাড়তলী, আকবর শাহ, বায়েজিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের পাহাড়ি এলাকায়।
প্রতি বছরের মতো এবারও ঝুঁকিপূর্ণ বসতি থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নিরাপদে রাখার জন্য জেলা প্রশাসন ১৯টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করেছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু বসবাসকারীদের আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া যাচ্ছে না।
জেলা প্রশাসনের সিনিয়র নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগে থেকে মাইকিং করেছি। পাহাড়ের বাসাবাড়ি ছেড়ে তাদের আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বলেছি। তিনি বলেন, দুর্ঘটনাকবলিত এলাকায় প্রায় ১২০টির মতো ঝুঁকিপূর্ণ বসতি রয়েছে। শনিবার সন্ধ্যার মধ্যে ঐসব বসতিতে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হবে। যে পাহাড় ধসে চার জন মারা গেছে সেগুলো রেলওয়ের মালিকানাধীন।
এদিকে জেলার উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন পাহাড়ে অবৈধ বসতি বেড়েই চলছে। জেলার সাতকানিয়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, পটিয়া, বোয়ালখালী, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি, হাটহাজারী ও সীতাকুণ্ড এলাকায় বিভিন্ন পাহাড়ে অসংখ্য অবৈধ বসতি গড়ে উঠেছে।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফাতেমা তুজ জোহরা বলেন, সাতকানিয়া উপজেলায় কিছু পাহাড়ে বসতি রয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বসতি নিয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তথ্য পেলেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চন্দনাইশ উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাছরীন আকতার বলেন, আমার এলাকায় বড় ধরনের কোনো পাহাড় নেই। তবে টিলা রয়েছে। আমরা ঝুঁকিপূর্ণ বসতি নিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছি।
