হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়, তবু জলাবদ্ধ চট্টগ্রাম

আপডেট : ২০ জুন ২০২২, ০০:১৭

চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারি কোষাগার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেও কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো নগরী তলিয়ে যাচ্ছে পানির নিচে। স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল এমনকি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়রের বাড়িও জলমগ্ন হচ্ছে। সড়কে পানি জমে থাকায় ফুটপাত, নালা ও খাল একাকার হয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। জলাবদ্ধতার কারণে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা লোকসান গুনছেন। ২০২০ সালের জলাবদ্ধতায় শুধু নগরীর খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরাই ৫১৪ কোটি টাকা ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির এক হিসাবে বলা হয়েছে।

জানা গেছে, বর্তমানে জলাবদ্ধতা নিরসনে নগরীতে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। তবে দুর্বল কর্মপরিকল্পনা, তাড়াহুড়া করে সম্ভাব্যতা যাচাই, জমি অধিগ্রহণজনিত জটিলতাসহ নানা কারণে জলাবদ্ধতা প্রকল্পটি বারবার হোঁচট খাচ্ছে। প্রকল্পটি নিয়ে নানা রকম অসঙ্গতির অভিযোগ করেছেন নগরবিদরা।

জলাবদ্ধতা প্রকল্পের টাকা অনেকটা ‘জলেই ঢালা হচ্ছে’ অভিযোগ করে তারা বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ (সিডিএ) সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় নেই। একসঙ্গে কাজ করার পরিবর্তে তারা পরস্পরের ওপর দোষারোপ করে চলেছে। চট্টগ্রাম নগরীর ৫৭টি খালের মধ্যে মাত্র ৩৬টি খাল এই প্রকল্পের আওতাভুক্ত, যা এই প্রকল্পের একটি বড় সীমাবদ্ধতা। গত চার বছরে কাজ শেষ হয়েছে মাত্র সাতটি খালের সংস্কার। সংশ্লিষ্টরা এই প্রকল্পের ৬৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে দাবি করলেও সামান্য বৃষ্টিপাতেই কেন নগরী পানিতে তলিয়ে যায়, এই প্রশ্নের সদুত্তর কেউ দিতে পারছেন না। নগরবাসী জলাবদ্ধতা প্রকল্পের দৃশ্যমান কোনো সুফল পাচ্ছেন না বলেই বিভিন্ন মহল থেকে বারবার অভিযোগ করা হচ্ছে। দিন যতই গড়াচ্ছে নগরবাসীর ভোগান্তি ততই যেন বাড়ছে। এরই মধ্যে সম্প্রতি এই প্রকল্পের মেয়াদ আরো ১৮ মাস বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে সিডিএ। যে কারণে প্রকল্পের ব্যয়ও প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা হবে বলে জানা গেছে।

কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় ও মহানগর কমিটির এক বিবৃতিতে বলা হয়, প্রকল্পের ধীরগতি ও নানা অসঙ্গতির কারণে বছরের পর বছর নগরবাসীকে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতায় নগরবাসীর ভোগান্তি। ছবি: সংগৃহীত

ক্যাব এর কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন ইত্তেফাককে বলেন, প্রকল্পের আওতায় খালে দেওয়া বাঁধ অপসারণ না করা এবং বিভিন্ন নালা-নর্দমা ময়লা-আবর্জনা ভর্তি থাকায় বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। এ কারণে জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারের উদ্যোগ ও বিপুল পরিমাণ বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে না। তিনি জলাবদ্ধতা প্রকল্পে সিডিএর সঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আরো সমন্বয় প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন। জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের কর্মকর্তা লে. কর্নেল মো. শাহ আলী ইত্তেফাককে বলেন, ইতিমধ্যে প্রকল্পের ৬৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এর সুবাদে নগরবাসী জলাবদ্ধতা থেকে পুরোপুরি মুক্তি না পেলেও আংশিক মুক্তি পেয়েছেন, এটা আমরা জোর দিয়েই বলতে পারি।

জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে ভূমিকা পালন করতে হবে উল্লেখ করে মো. শাহ আলী বলেন, চসিকের হিসাব অনুযায়ী নগরীতে মোট ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার খাল রয়েছে। এর মধ্যে আমাদের প্রকল্পের অন্তভু‌র্ক্ত খালের পরিমাণ ৩০০ কিলোমিটার। প্রকল্পভুক্ত সব খালে ইতিমধ্যে প্রতিরক্ষা দেওয়াল (রিটেইনিং ওয়াল) নির্মাণ করা হয়েছে। তাই সেসব খালে পানি আটকানোর কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু বাকি ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার খালের দায়িত্বতো সেনাবাহিনী নিতে পারে না। এটা পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। সেটা যদি না হয় তাহলে আমরা এই প্রকল্প থেকে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাব না। এছাড়া ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতায় অনেক জায়গায় কাজ থমকে আছে।

নগরবিদ প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন মজুমদার ইত্তেফাককে বলেন, সিডিএর নেওয়া প্রকল্পটি শুরু থেকেই নানা রকম অসঙ্গতি ও অপূর্ণতায় পরিপূর্ণ ছিল। এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন একটি পরিপূর্ণ সমীক্ষা সম্পন্ন করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল। কিন্তু তাদের প্রস্তাবনা অনুমোদিত না হয়ে পরবর্তীতে সিডিএর পাঠানো প্রস্তাব একনেকে অনুমোদিত হলো। কিন্তু সিডিএর প্রস্তাবটিও ছিল অপূর্ণাঙ্গ।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা এম রেজাউল করিম চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, জলাবদ্ধতা প্রকল্পের কাজ এখনো চলমান। কাজ শতভাগ শেষ হওয়ার আগে এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।

তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা সমস্যা চট্টগ্রামে অতীতেও ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। পাহাড় কাটা বন্ধ না হলে পলিমাটি গিয়ে নালা ও খাল ভরাট হয়ে নগরীতে বারবার জলাবদ্ধতা হবে। বিশ্বের অনেক বড় বড় শহরে পানি ওঠে আবার তা দ্রুত সরেও যায়। আমরাও তেমনটা চাই। আবার আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে, সারা বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। এর প্রভাবে জোয়ারের পানির উচ্চতা বাড়ছে। উপকূলবর্তী শহর হিসেবে চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ জোয়ারের পানি। এটাকেও ব্যবস্থাপনায় আনতে হবে। মেয়র আরো বলেন, চট্টগ্রামে একসময় ৭৬টি খাল ছিল। এখন আছে ৫৭টি। অনেক খাল ভূমিদস্যুরা দখল করে নিয়েছে। সেগুলো উদ্ধার করা দরকার। আমি ২২টি খাল ভূমিদস্যুদের কবল থেকে উদ্ধারের জন্য মন্ত্রণালয়ের কাছে সহযোগিতা চেয়েছি।

ইত্তেফাক/ ইআ