বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

লেসলি হিলটন, মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ইতিহাসের প্রথম ক্রিকেটার

আপডেট : ২০ জুন ২০২২, ২৩:২৩

ক্রিকেটের জন্মলগ্ন থেকেই ক্রিকেট মাঠে ক্রিকেটাররা একের পর এক আলোচিত ঘটনার জন্ম দিয়ে গেছেন। সেই সব ঘটনার বেশিরভাগই ইতিবাচকভাবে সংবাদের শিরোনাম হয়ে হয়েছে। সমর্থকদের মনে জায়গা করে নিয়েছে। তবে এদের মধ্যে কেউ কেউ ক্রিকেট মাঠ থেকেও বাইরের ঘটনায় বেশি স্মরণীয় হয়ে আছেন। তাদেরই একজন ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটার লেসলি হিলটন।

যদিও তার ক্রিকেট ক্যারিয়ার অতটা বর্ণিল ছিল না। ক্যারিয়ারে মোট ছয় টেস্ট খেলে ৭০ রান আর ১৬ উইকেট অর্জন। ঘরোয়া  ক্রিকেটে জ্যামাইকার হয়ে খেলতেন লেসলি। তিনি ছিলেন ফাস্ট বোলার। পাশাপাশি লোয়ার অর্ডারে ব্যাটিং করতে পারতেন। ভালো ফিল্ডার হিসেবেও সুনাম ছিল। মোটকথা একজন অলরাউন্ডার। ঘরোয়া ক্রিকেটে অসাধারণ পারফরম্যান্সের সুবাধে জাতীয় দলে ডাক পেয়ে যান। ৩০তম জন্মদিনের কাছাকাছি সময়ে অর্থাৎ ৮ জানুয়ারি ১৯৩৫ সালে, লেসলির ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্টে অভিষেক ঘটে। পরবর্তীতে, দুর্বল ক্রীড়াশৈলীর অজুহাতে টেস্ট দলের বাইরে পাঠানো হয় তাকে। এরপর দেশে ফিরে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

লেসলির ক্যারিয়ারের মতো তার শুরুর জীবন তেমন রঙিন ছিল না। ঘন নীল আটলান্টিক মহাসমুদ্রের মাঝে ভেসে থাকা সবুজে ঘেরা দ্বীপ জামাইকার এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম লেসলির। এ জন্য ছেলেবেলায় প্রতি পদেই ধুকতে হয়েছে। জন্মেরও আগেই বাবা মারা যায়। লেসলির যখন মাত্র তিন বছর বয়স তখন সে তার মাকেও হারায়। পরবর্তীতে, সে তার বড় বোনের কাছে বেড়ে উঠতে থাকেন। একটা সময় তার সেই বোনও না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। লেসলির আশ্রয় হয় খালার বাড়ি। কয়েক বছর পর খালাও মৃত্যুবরণ করেন। অর্থ অভাবে ভুগতে থাকা লেসলি পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। কাজ নেয় একটি দরজির দোকানে।

লেসলি হিলটন

লেসলি হিলটনের পরের গল্পটা শুধুই রোমাঞ্চে ভরপর। জাতীয় দলের হয়ে খেলার সুবাধে তার সুনাম এবং মর্যাদা সর্বত্র ছড়িয়ে যায়। ১৯৩৯ সালে সব ধরনের ক্রিকেট থেকে অবসর নেন। এরপর জামাইকার সিভিল সার্ভিস পূর্ণবাসন অধিদফতরে উচ্চপদে যোগদান করেন। সেখানেই তার জীবনে নতুন বসন্তের আগমন ঘটে। জীবন নতুন দিকে বাঁক নেয়।

১৯৪০ সালে তার সঙ্গে পরিচয় হয় লার্লিন রোজ নামে এক বিত্তশালী নারীর সঙ্গে। শুরুতে তাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠে। ধীরে ধীরে সেটা প্রেমে রুপ নেয়। রোজের বাবা ছিলেন একজন ইন্সপেক্টর। তিনি কিছুতেই চাইতেন না তার মেয়ে লেসলির সঙ্গে সম্পর্ক রাখুক। কারণ, লেসলি দরিদ্র।

লার্লিন রোজের বাবার বিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও ১৯৪২ সালে তাদের সম্পর্ক বিয়েতে গড়ায়। বিয়ের পর থেকে সবকিছু খুব ভালোভাবেই চলছিল। ১৯৪৭ সালে তাদের দাম্পত্য জীবনকে আলোকিত করে এক সন্তানের আগমন ঘটে।

এর পরের গল্পটা শুধুই আবেগ, ভালোবাসায় ও প্রতারণায় ভরপুর। বরা বরই রোজ উচ্চভিলাসী ছিলেন। তাই তার ছোটবেলার স্বপ্ন ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়াকে বাস্তবে রুপ দিতে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে। সেখানে গিয়ে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে  প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। আটলান্টিকের জলরাশি মাঝে মাঝে হয়ে উঠে উত্তাল ও প্রলয়ঙ্কারী। তেমনি মিসেস হিলটন তার উচ্চাভিলাসীতার কারণে সম্পর্কে বয়ে আনেন দুর্যোগ। ১৯৫৪ সালের এপ্রিলে মাসে নিউ ইয়র্ক থেকে একটি বেনামী চিঠি পান লেসলি। সেই চিঠিতে তার স্ত্রীর পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ার কথা লেখা ছিল। নিউ ইয়র্কে থাকাকালীন সময়ে রয় ফ্রান্সিস নামের এক অভিজাত ঘরের সন্তানের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন লার্লিন রোজ।

সঙ্গে সঙ্গেই লেসলি তার স্ত্রীকে জামাইকায় ফিরে আসতে বলেন। মে মাসে লার্লিন ফিরে আসলে লেসলি তার কাছে রয় ফ্রান্সিস সম্পর্কে জানতে চান। রোজ শুরুতে বলেন তাদের মধ্যে চেনাজান ছাড়া আর কোনো সম্পর্ক নেই। পরবর্তীতে লার্লিন রোজের মালী ডাকঘরে চিঠি নিয়ে যাওয়ার সময় লেসলির হাতে ধরা পড়েন। চিঠির লেখায় স্পষ্ট হয়ে যায় রোজের প্রেমের সম্পর্ক থাকার বিষয়। রোজ তা স্বীকার করতে বাধ্য হন। জানান, গর্ভে রয় ফ্রান্সিসের সন্তানও ধারণ করছেন। 

তাৎক্ষণিকভাবে লেসনি তার মেজাজ হারিয়ে ফেলেন। নিজেকে আর স্থির রাখতে পারেননি। সঙ্গে থাকা রিভলবার দিয়ে সাতটি গুলি করেন প্রিয়তমা স্ত্রীর বুকে। মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েন লেসলির ভালোবাসার প্রিয় রোজ। পরবর্তীতে সে নিজেই পুলিশকে ফোন করে ডেকে আনেন। প্রথমে লেসলি পুলিশের কাছে দাবি করেন, তিনি নিজেই আত্নহত্যার জন্যে রিভলবারে গুলি ঢুকিয়েছিলেন। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে স্ত্রীর গায়ে গুলি লেগে যায়।

১৯৫৪ সালের অক্টোবর মাসে মামলার শুনানি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। লেসলি হিলটনের সময়কার জাতীয় দলের অধিনায়ক নোয়েল নেদারসোল তার সাবেক সতীর্থের জন্যে ভিভিয়ান ব্ল্যাককে উকিল হিসেবে নিযুক্ত করেন। তাতে অবশ্য কোনো কাজ হয়নি। বিচারকদের রায়ে যে লেসলিই দোষী। পরে তার আইনজীবীরা জ্যামাইকার সর্বোচ্চ আদালত, লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিলে যান। অসংখ্য মানুষের স্বাক্ষরসম্বলিত আবেদনও ঔপনিবেশিক গভর্নরকে দেওয়া হয়। কিন্তু সব জায়গায় এসব আবেদন বাতিল হয়ে যায়।

কোনো কিছুই তাকেই ফাঁসির হাত থেকে বাঁচাতে পারলো না। বিচারকমণ্ডলীর রায়ে ১৯৫৫ সালের ১৭ মে লেসলিকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে রায় কার্যকর করা হয়। এভাবেই লেসলি হয়ে যান ইতিহাসের একমাত্র মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত ক্রিকেটার।

ইত্তেফাক/টিএ