বন্যা: বাংলাদেশের ললাট লিখন

আপডেট : ২১ জুন ২০২২, ০৫:০০

নদীমাতৃক বাংলাদেশে বন্যা নতুন কিছু নয়। উজান থেকে নেমে আসা ঢল এবং অতিবৃষ্টির কারণে প্রতি বছরই এই দেশে বন্যা হয়। তবে কোনো কোনো বছর পানির মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় মানুষের দুর্দশা বাড়ে। বাংলাদেশে সাধারণত বেশ কয়েকটি কারণে বন্যা হয়। প্রধান কারণটি হচ্ছে অতিবৃষ্টি। বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে পানি সরতে বেশ কয়েক দিন লেগে যায়। আবার উজান থেকে নেমে আসা বৃষ্টির পানিও অনেক সময় বন্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের অবস্থান সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র পাঁচ মিটার ওপরে। পাহাড়ি ঢল এবং অতিবৃষ্টির কারণে পানি দ্রুত সরতে না পারলে বন্যার তীব্রতা বাড়ে।

বৃষ্টির পানি সমুদ্রে নেমে যাওয়ার জন্য যে সহজ পথ, সেগুলোতে নানা কারণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে, নিচু জমিগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে পানির আধারগুলো নষ্ট হয়েছে। পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে আসা পলিমাটির কারণে বিভিন্ন নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় বন্যার তীব্রতা বাড়ে। প্রায় প্রতি বছরই বাংলাদেশ বন্যায় আক্রান্ত হচ্ছে। বাংলাদেশের মোট আয়তনের শতকরা ৮০ ভাগই বন্যাপ্রবণ। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা গেছে, বাংলাদেশের এই ৮০ ভাগ এলাকা কোনো না কোনো সময় বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। বিশেষ করে, জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসে এ প্রবণতা বেশি দেখা যায়। তবে বন্যা কম বা বেশি তা নির্ভর করে বর্ষার তীব্রতার ওপর। এক হিসেবে দেখা গেছে, প্রতি বছরই বাংলাদেশের অন্তত ১৬ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। গড়ে প্রতি বছর ৫ হাজার লোক মারা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা এসব বন্যাকে নানাভাবে শ্রেণিবিভাগ করেছেন। এসবের মধ্যে রয়েছে আকস্মিক বন্যা, অতিরিক্ত বৃষ্টিতে বন্যা, নদীভাঙনের কারণে সৃষ্ট বন্যা।

ইতিহাসে বন্যা
বন্যা বাংলাদেশে নতুন নয়। প্রায় প্রতি বছরই হচ্ছে এটি। উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে,ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি বড় বন্যা হয়। এই শতাব্দীতে মোট ছয়টি বড় বন্যা রেকর্ড করা হয়েছে। ১৮৮২, ১৮৫৮, ১৮৭১, ১৮৭৫, ১৮৮৫ এবং ১৮৮৮ সালে সৃষ্ট বন্যা ছিল দীর্ঘস্থায়ী। বিংশ শতাব্দীতে এসে ১৮টি বড় বন্যা বাংলাদেশে আঘাত হানে। ১৯৫১, ১৯৮৭, ১৯৮৮, ২০০৪ এবং ২০১০ সালের বন্যা ছিল ভয়াবহ। এর মধ্যে ১৯৮৭ সালের বন্যা ছিল দীর্ঘস্থায়ী। জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত স্থায়ী এ বন্যায় ৫৭ হাজার ৩০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা গ্রাস করেছিল, যা ছিল দেশের মোট আয়তনের ৪০ শতাংশ। ১৯৮৮ সালের বন্যা ছিল আরো ভয়াবহ। এ বন্যায় ৮২ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা তলিয়ে যায়। আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী এ বন্যায় রাজধানী ঢাকাকেও গ্রাস করে। ২০ দিনব্যাপী স্থায়ী এ বন্যায় ব্যাপক জানমালের ক্ষতি হয়। ১৯৯৮ সালের বন্যাও ছিল ভয়াবহ। এ সময় দেশের ৭৫ শতাংশ এলাকা তলিয়ে যায়। এ বছর অতিবৃষ্টির কারণে বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হয়। প্রায় ৩ কোটি লোক এ বন্যায় ঘরবাড়ি হারায়। ১ হাজারের বেশি লোক মারা যায়। ৭ লাখ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়। ৪০০ কলকারখানা বন্ধ হয়ে যায়। সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়। অর্থনীতির ক্ষতি হয় ২০ শতাংশ। ১৯৯৯ সালে আবার হানা দেয় বন্যা। ৬৫ দিন স্থায়ী এ বন্যায় বহু লোক ঘরবাড়ি হারায়। সরকার বৈদেশিক সহায়তা দিয়ে এ বন্যা মোকাবিলা করে। ২০০৪ সালের বন্যাও ছিল ১৯৮৮ মতো ভয়াবহ। দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। ২০০৫ সালের বন্যার কারণটি ছিল অতিবৃষ্টি। নদনদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় ৪০টি জেলার ২৫২টি গ্রাম পানির নিচে তলিয়ে যায়। কয়েক লাখ লোক ঘরছাড়া হয় এ বন্যায়।

বন্যার কারণ
বেশ কয়েকটি কারণে বাংলাদেশে বন্যা হয়ে থাকে। এর কোনোটা মানবসৃষ্ট আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক। দ্রুত নগরায়ণের ফলে বিভিন্ন নিচু জমি ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে পানির আধারগুলো নষ্ট হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে দেশ নগরায়ণের দিকে ঝুঁকছে। বাড়িতে জনসংখ্যার জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। এছাড়া সরকারের বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের কারণেও বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে, দেশব্যাপী রাস্তাঘাট এবং অন্যান্য নির্মাণকাজের ফলে পানি আটকে যাচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বন্যার প্রধানতম কারণ হচ্ছে নদনদী ভরাট হয়ে যাওয়া। উজান থেকে নেমে আসা ঢলের সঙ্গে পলিমাটি এসে নদীর তলদেশ ভরাট করে দিচ্ছে। এতে পানির আধার ছোট হয়ে আসছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন জায়গায় দখলের কারণে নদীর ব্যাস কমে যাচ্ছে। এতে বন্যা আরো তীব্র হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে বলে অনেকে মনে করেন।

বন্যার ক্ষয়ক্ষতি
বন্যার ক্ষয়ক্ষতি বহুবিধ। একসময় মনে করা হতো বন্যায় শুধু ফসলি জমি তলিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দেশের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির বহুবিধ ধারণা মিলছে। বিশেষ করে, গরিব খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের জন্য বন্যা অভিশাপ নিয়ে আসে। ব্রিটেনের গার্ডিয়ান পত্রিকায় ২০১৮ সালে একটি আর্টিকেল প্রকাশ করা হয়। এতে দেখানো হয়—বন্যার কারণে কীভাবে গরিব মানুষ আরো গরিব হচ্ছে। ফসলহানি এবং অন্যান্য কারণে তাদের কর্মসংস্থান থাকে না। ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়, জীবন চালিয়ে নেওয়ার জন্য গরিবদের অনেকে ঋণ নিতে বাধ্য হন। বন্যার কারণে কৃষকরা উৎপাদিত ফসল বাজারে বিক্রি করতে পারে না। রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ার কারণে যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বন্যার কারণে বাংলাদেশের শিশুরা অপুষ্টির শিকার হয় বলেও গার্ডিয়ানের ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এতে বলা হয় বন্যার সময় বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকার ৯০ শতাংশ লোক প্রয়োজনের তুলনায় কম খায়। এতে করে তারা প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায় না। আরেক হিসেবে দেখা যায়, বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুরা। মায়ের পুষ্টি নিশ্চিত না হওয়ায় প্রায় ৫০ শতাংশ শিশু কম ওজন নিয়ে জন্মায়। কৃষির পাশাপাশি মত্স্যসম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয় বন্যায়। বন্যার কারণে পুকুর, ঘের, এবং অন্যান্য জলাশয়ের মাছ ভেসে যায়। এতে ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হন কৃষকরা। তবে বন্যায় ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি যেমন আছে, সঙ্গে সঙ্গে এর উপকারও আছে। পাহাড়ি ঢলের কারণে প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রবেশ করছে উর্বর পলিমাটি। এর ফলে সারের ব্যবহার কিছুটা হলেও কমছে। ফসল উৎপাদন বাড়ছে।

ইত্তেফাক/ইআ