দেহ ও মনের প্রশান্তিতে ‘যোগ’

আপডেট : ২১ জুন ২০২২, ০৩:৩১

শরীরের সুখ মহাসুখ। শরীর ঠিক থাকলে সবকিছু ভালো লাগে। একটু জ্বর, মাথাব্যথা বা রক্তচাপ বেশি হলে সব আনন্দে ভাটা পড়ে। আবার শরীর ঠিক আছে; কিন্তু কোনো ঘটনায় বা কারো ব্যবহারে মন খারাপ হলেও পরিচিত পৃথিবীটা হয়ে ওঠে অশান্তির আকর। বিস্বাদ লাগে জীবনের সবকিছু। এই শরীর ও মন ঠিক রাখতে প্রাচীন ভারতে এক বিশেষ ধরনের চর্চা হতো, যার নাম ‘যোগ’। সংস্কৃত শব্দ ‘যুজ’ থেকে ‘যোগ’ শব্দের উত্পত্তি। যোগ শব্দের অর্থ যুক্ত হওয়া, মিলিত হওয়া ও উন্নীত হওয়া। জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলনকে প্রকৃতপক্ষে ‘যোগ’ বলা হয়। এটি একদিকে বিশেষ্য আরেক দিকে ক্রিয়া পদ।

পরমাত্মার সঙ্গে যুক্ত হতে হলে পরমাত্মাকে জানতে হবে। এই যে জানার প্রক্রিয়া এটাই যোগ সাধনা বা যোগক্রিয়া। মহর্ষি পতঞ্জলি প্রায় ২ হাজার ২০০ বছর পূর্বে ‘যোগসূত্র’ নামক বইয়ে যোগের আদ্যোপান্ত বিশ্লেষণ করেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মনীষী বিভিন্নভাবে যোগের পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও সংযোজন করেন। তৎসত্ত্বেও পতঞ্জলির অষ্টাঙ্গ যোগই মূল যোগধারা হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। পতঞ্জলির অষ্টাঙ্গ যোগকে অনেকে অষ্টসিদ্ধি, আবার অনেকে অষ্টাঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করেন। আমার মতে, প্রথমটাই প্রাধান্য পাবে। কারণ, প্রথম সিঁড়ি পার না হলে দ্বিতীয় সিঁড়ি যেমন পার হওয়া যায় না, তেমনি পতঞ্জলির এই অষ্টাঙ্গ হলো—শ ম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধি।

শম—অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য্য ও অপরিগ্রহ।

নিয়ম—শরীর ও মনের বিশুদ্ধতা, সন্তুষ্টি, স্বাস্থ, স্বাধ্যায় ও আধ্যাত্মিক ভাবনা।

আসন—বিভিন্ন অঙ্গের জন্য বিভিন্ন আসন। যেমন :পদ্মাসন, সুখাসন, কুর্মাসন, ভুজঙ্গাসন, পদ্মহস্তাসন ইত্যাদি (হটযোগ)।

প্রাণায়াম—যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ প্রাণ। নিশ্বাসের আরেক নাম প্রাণ। প্রাণের আরামকে বলা হয় প্রাণায়াম। নিশ্বাস গ্রহণ (পুরক), ধারণ (কুম্ভক) ও ত্যাগ (রেচক) করার বিভিন্ন পদ্ধতিকে বলা হয় প্রাণায়াম।

প্রত্যাহার—ইন্দ্রিয়গুলোকে বহির্মুখ থেকে অন্তর্মুখী করা এবং অপ্রয়োজনীয় বিষয় বাসনা পরিত্যাগ করা।

ধারণা—ধ্যানের বিষয়বস্ত্ত। যেমন :সৃষ্টিকর্তার গুণ বা রূপ চিন্তন, কোনো মন্ত্র অথবা কোনো মনোহর প্রাকৃতিক দৃশ্য, যা দেখে মনে প্রশান্তি আসবে।

ধ্যান—রূপ বা গুণের ছবি বা শব্দের মাধ্যমে একাগ্রতার সঙ্গে অবিচ্ছিন্নভাবে চিন্তা করা।

সমাধি—ধ্যেয়র সঙ্গে ধ্যানীর একাত্ম হয়ে যাওয়া।

অষ্টাঙ্গের প্রথম চারটি বিষয় শরীরবৃত্তিক, পঞ্চমটি সংকল্প, ৬ষ্ঠ ও ৭ম মানসিক আর সর্বশেষটি বর্ণনার অতীত। অনেকে বিভিন্ন যোগাসনকেই (হটযোগ) সম্পূর্ণ যোগ মনে করেন, যা সত্যি নয়। যোগের ক্লাসিক্যাল ও পোস্ট ক্লাসিক্যাল পিরিয়ডে (খ্রিষ্টাব্দে ষ্টপূর্ব :২২০০-১৭০০) পর্যন্ত আধ্যাত্মিকতাই যোগের মূল লক্ষ্য ছিল। অর্থাত্ জগত্ ও জীবের উত্পত্তি, কারণ ইত্যাদি। আধুনিককালে দেহমনের সুরক্ষা, উন্নতি ও প্রশান্তিই মূল লক্ষ্য। সর্বশেষে আসে মানুষের উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধি। এজন্য আজকাল পাশ্চাত্যে করপোরেট অফিসগুলোয় যোগ ম্যানেজার বা কোচ নিয়োগ করতে দেখা যায়।

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা সময়ের সঙ্গে লক্ষ্য পূরণের। বিভিন্ন সফটওয়ার তৈরি হচ্ছে—কার আগে কে লক্ষ্য অর্জন করবে সেজন্যই। চোখের সামনে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি বা অ্যাপস দেখলেও এই অ্যাপস তৈরির পেছনে আছে একজন মানুষ আর তার মেধা ও শ্রম। এই মেধা ও শ্রমের যথার্থ প্রয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন নিয়ন্ত্রণ ও নির্দেশনা (গাইডেন্স ও কন্ট্রোল) পদ্ধতি। আর যোগাভ্যাস হলো এই প্রাকৃতিক উপায়ে সৃষ্ট নিয়ন্ত্রণ ও নির্দেশনা পদ্ধতি। আমরা বলি—সুসুস্থ দেহে সুসুস্থ মন। আর যোগ বলে—স্থির দেহে স্থির মন। একসময় এই অভ্যাসই আপনাকে গতিময় দেহেও স্থির মন উপহার দেবে। আমাদের অনেকের মনে হয়—যোগাভ্যাস একটা নির্দিষ্ট ধর্মের। অন্য ধর্মের এটা করা উচিত নয়। বিষয়টি একেবারেই অমূলক।

যোগ ব্যায়ামের উপকারিতার কথা বলতে হলে প্রথমেই বলতে হয় দেহ ও মনের প্রশান্তির কথা। মস্তিষ্কের বিশ্রামের মাধ্যমে আপনাকে শরীর ও মনকে সতেজ, সবল ও সুসুস্থ রাখতে হবে। যোগের বিশেষ অঙ্গ ধ্যান, ধ্যান আপনাকে পরিবেশবান্ধব ও সহনশীল হতে সাহাঘ্য করবে। মানুষের সবচেয়ে খারাপ বৈশিষ্ট্য রাগ। ধ্যান আপনার রাগ প্রশমিত করে আপনাকে সদা হাস্যময় এক সুন্দর ব্যক্তিত্বে পরিণত করবে। নিয়মিত যোগাভ্যাস অনিদ্রা দূর করে। সর্বোপরি ধ্যান আপনাকে মানবিক ও ঐশী ভাবনায় যুক্ত করবে।

কীভাবে শুরু করবেন? শিথিল পোশাক পরুন, যাতে রক্ত চলাচলে কোনো বাধা না হয়। যে কোনো আলো-বাতাসযুক্ত স্থান বেছে নিন। একদম খালি পেটে বা ভরা পেটে যোগ ব্যায়াম করা ঠিক নয়। যোগাভ্যাসের আগে কোনোরূপ তামাক বা অ্যালকোহল জাতীয় খাবার বা পানীয় গ্রহণ একেবারেই নিষিদ্ধ। আপনার সুবিধা মতো দিনের একটি সময় ঠিক করে যোগাসন করুন। তবে সূর্যাস্ত বা সূর্যোদয়ের মুহূর্ত আদর্শ সময়। আপনার শারীরিক সক্ষমতার বাইরে যোগাসন করতে যাবেন না। প্রাণায়াম প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে শুরু করুন। জোর করে যোগাভ্যাস বিশেষত প্রাণায়াম করবেন না। এতে ক্ষতির আশঙ্কা আছে।

২১ জুন বিশ্ব যোগদিবস। ২০১৫ সাল থেকে সারা বিশ্বে এই দিবস পালিত হচ্ছে। জ্যোতির্বিদ্যা অনুযায়ী, এই দিনটি উত্তর গোলার্ধে সবচেয়ে দীর্ঘ আর সবচেয়ে কম দক্ষিণ গোলার্ধে। যোগ বিশ্বশান্তি স্থাপনে রাখতে পারে বিশেষ অবদান। একজন বিবেকবান মানুষ হিসেবে আসুন, আমরা যোগ অনুশীলন করে একে অপরকে বোঝার চেষ্টা করি এবং বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব ও বিশ্বকল্যাণে অংশগ্রহণ করি, যাতে আমাদের সবারই কল্যাণ হয়।

লেখক: যোগ অনুশীলনকারী

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন