সিনেমার সময় খারাপ যাচ্ছে দীর্ঘকাল। উত্তরণের পথ একমাত্র ভাল সিনেমা ও সিনেমার পরিবেশ তৈরি। চিত্রনায়ক উজ্জ্বল বলেছিলেন, ‘ভাল সিনেমা দিলেই দর্শকেরা হলে ফিরবে। আমরা আমাদের সময়ে তো বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে সিনেমা দেখতে হলে আসুন এটা বলিনি। বরং লুকিয়ে থেকেছি। যাতে দর্শকেরা আমাদের দেখে মোহভঙ্গ না হয়। ভাল সিনেমা’ই একমাত্র ফেরাতে পারে দর্শকদের। দর্শকেরা কখনও ভুল করে না।’
তবে সিনেমার এই মন্দাবাজরের চেয়েও বিভ্রান্তিকর ও বিব্রতকর বিষয় হলো সিনেমা নিয়ে ভুল প্রচারণা। এর একমাত্র কারণ সিনেমা হলগুলোর বক্স অফিস রিপোর্ট এখনও সম্ভব হয়নি এদেশে। পুর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সিনেপ্লেক্স প্রতি জেলায় গড়ে উঠলেই বক্স অফিস রিপোর্ট অনায়াসেই প্রকাশ সম্ভব হবে। তখন কেউই ফাঁকা আওয়াজ করতে পারবে না। কিন্তু সেই স্বপ্নের বাড়ির পথ অনেকদূর!
এখন যে কোনো ছবি রিলিজের প্রথম সপ্তাহে ছবির কলাকুশলীরা ঢাকা ও ঢাকার বাইরে হল পরিদর্শন করেন। তাদের সেলফি বা ফেসবুক লাইভে হলের বাইরে ভক্তদের ভীড় দেখা গেলেও পরের শো থেকে আবারও সেই দর্শক শূন্য হবার দৃশ্য। বিষয়টা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, সিনেমা হলে নায়ক নায়িকা না গেলে আর দর্শকদের হলে ফেরানো যাচ্ছে না! এই অবস্থায় তারকারা নিজেদের ফেসবুকে নিজেদের ছবিকে বলছেন সুপারহিট! অন্যদিকে সরেজমিন রিপোর্টে সিনেমা হলমালিকেরা বলছেন ‘ছবি চালালে এসরি বিলটাও ওঠে না।’
এই বৈরি অবস্থায় চলছে ইন্ডাস্ট্রি। চলতি সপ্তাহে মুক্তিপ্রাপ্ত দুটি সিনেমা ‘অমানুষ’ ও ‘তালাশ’ সিনেমা হলে কোনোরকম ব্যবসা করতে পারেনি মুক্তির পর থেকে। দুটি সিনেমায় দর্শকদের মধ্যে সাড়া পড়েনি। মুক্তির দিন থেকেই বৃষ্টি। সেই সঙ্গে সিলেটের বন্যা বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সবার জন্য। বন্যার পরিপ্রেক্ষিতে ‘অমানুষ’ সিনেমার প্রযোজক ঘোষণা দিয়েছেন, মুক্তির প্রথম সপ্তাহের টিকেটের টাকা থেকে হল বানভাসিদের জন্য ব্যয় করা হবে। একইসাথে তারা বলেছেন ছবি মুক্তির আগেই নাকি ডিজিটাল প্লাটফর্মে তাদের লগ্নি উঠে গেছে। প্রযোজক পরিচালকের এই কথা নিয়ে ট্রলও করেছে কেউ কেউ। কিন্তু সত্যাসত্য প্রমাণের কোনো উপায় নেই।
আর ‘তালাশ’ সিনেমার আয়ের একটা অংশসহ ব্যক্তিগতভাবে সিনেমার টাকা দিয়ে একটি তহবিল সিলেটের বানভাসিদের জন্য দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন। মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা দুটির হল ও সিনেপ্লেক্সগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো ভিন্নচিত্র। তালাশ-অমানুষ সিনেমার মুক্তিতে ব্যবসা ফেরেনি হলে।
স্টার সিনেপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ গনমাধ্যমকে জানায়, মুক্তিপ্রাপ্ত দুটি নতুন বাংলা সিনেমা ‘তালাশ’ ও ‘অমানুষ’ সিনেমা দুটি হতাশ করেছে। আশা ছিল দর্শক দেখবে। কিন্তু তা হচ্ছে না।
শ্যামলী সিনেমার কর্মকর্তা আহসান উল্লাহ বলেন, ‘এখানে’ ‘অমানুষ’ সিনেমার অবস্থা খুব খারাপ যাচ্ছে। রাতের শোতে ১২ জন দর্শক আছেন। সারাদিন প্রতিটা শোতে এমনই দর্শক আসছেন। ঈদের পর ভেবেছিলাম অন্য সিনেমাগুলো ব্যবসা করবে। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। সিনেমার নায়ক একটা বিষয় এটা মানতে চান না অনেকেই।’
তবে চলতি সপ্তাহের দুটি ছবির ব্যবসায়িক ধ্বসের কারণ হিসেবে সিলেটের বন্যাকে অনেকেই মূল কারণ বলে জানাচ্ছেন। মধুমিতা হলের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ বলেন, ‘হলের অবস্থা খুবই খারাপ। আমাদের চেয়ে পান বিক্রেতা- এর চেয়ে বেশি আয় করে। আজকের সব কয়টা শো মিলিয়ে ৫ হাজার টাকা আয় করেছি। এভাবে চলতে থাকলে সিনেমা হল বন্ধ করে দিতে হবে।’
এর জবাবে চিত্রনায়ক নিরব বলেন, ‘আমরা সবাই জানি দেশে এখন এই বন্যার সময়ে একটা মন্দাসময় পার করতেই হবে। তাই প্রত্যাশার মাপে না হলেও দর্শকদের যে বিপুল সাড়া পেয়েছি তা অভাবনীয়।’
‘অমানুষ’ সিনেমার পরিচালক অনন্য মামুন বলেন, ‘আমার সিনেমা নিয়ে আমি খুশি। ভালো ফিডব্যাক পাচ্ছি। এখন তো কেউ সিনেমা হল থেকে টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় সিনেমা করে না। আমার সিনেমার টাকা তো মুক্তির আগেই উঠে গেছে।’
এদিকে তালাশ ছবির পরিচালক সৈকত নাসির জানিয়েছেন আমরা কোনো নেগেটিভ রিভিউ পাইনি। এটিই আমাদের বড় অর্জন বলে মনে করি। কারণ এই বন্যার সময়েও আমরা যে সাড়া পেয়েছি। সত্যিই তা অসাধারণ। সবচেয়ে বড় কথা হলো আমরা আমাদের প্রযোজক লগ্নিকারীদের টাকা উঠিয়ে নিয়ে আসতে হবে। সেই চেষ্টাটাই আমরা করছি। ’
এদিকে আর কদিন বাদেই ঈদ উল আজহায় মুক্তি পাচ্ছে অনন্ত জলিলের ‘দিন দ্যা ডে’ চলচ্চিত্রটি। ছবিটি প্রসঙ্গে অনন্ত এরই ভেতরে শতকোটি টাকা বাজেটের ছবি বলেছেন। তিনি বলেছেন এদেশের সর্বোচ্চ বাজটের ছবি এটি। এছাড়া বলেছেন ছবিটি টম ক্রজের ছবির স্বাদ পাবেন দর্শকেরা। প্রযোজকদের নিজের ছবি নিয়ে উচ্ছ্বাস, প্রত্যাশার পারদ বাড়িয়ে রাখাটা স্বাভাবিক। প্রতিটি ছবিতেই প্রত্যেক প্রযোজক নিজের ছবি নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেই মুক্তি দেন। সেই ধারাবাহিকতায় অনন্তর এই প্রত্যাশার মাপে ছবিটি প্রকৃত অর্থেই ব্যবসাসফল হোক। কিংবা সিনেমা হলে দর্শক ফিরুক সেটিই সকলের একমাত্র চাওয়া এখন

