শনিবার, ২০ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

কক্সবাজারে পাহাড়ধস আতঙ্কেও সরছে না বাসিন্দারা

আপডেট : ২১ জুন ২০২২, ২২:১৭

কক্সবাজারে সপ্তাহখানেক ধরে থেমে থেমে ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। এতে গত শুক্রবার থেকে সোমবার পর্যন্ত অনেকটা তলিয়ে গেছে শহর ও গ্রামের রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন এলাকা। হাঁটু কিংবা তার চেয়েও উচ্চতায় পানি উঠেছে কক্সবাজার, টেকনাফ, উখিয়া ও মহেশখালীর বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। একই সঙ্গে পুরো জেলাজুড়েই বিরাজ করছে পাহাড় ধস আতঙ্ক। তবে শত মাইকিং করেও সরিয়ে নেওয়া যাচ্ছে না ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষদের।

রবিবার মহেশখালীতে ধসে পড়া পাহাড়ি মাটির নিচ থেকে এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এমন আরও অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর আশঙ্কায় মাইকিং করে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বা পাদদেশে বাসকরা মানুষগুলোকে নিরাপদে সরে আসতে আহ্বান জানাচ্ছে প্রশাসন। কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি কক্সবাজার পৌরসভা, মহেশখালী, টেকনাফ, উখিয়া, উখিয়া-টেকনাফের ৩৩ রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ পাহাড় বেষ্টিত উপজেলা ও পৌরসভা যৌথ বা পৃথকভাবে মাইকিং করে লোকজনকে সচেতন করছে।

সোমবার (২০ জুন) ও মঙ্গলবার (২১ জুন) বিকালেও কক্সবাজার পৌরসভার ৫ ও ৬ নং ওয়ার্ডের সাহিত্যিক পল্লী, গরুর হালদা এলাকার পাহাড়কাটার কয়েকটি দৃশ্য পরিদর্শন করেছে জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত মেয়র হেলাল উদ্দিন কবির। বর্ষণমুখর দিনে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসে থাকা লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে তাগাদা দেন পৌরসভার প্রধান নির্বাহী তরিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সার্বিক জাহিদ ইকবাল, কক্সবাজার পৌরসভার (ভারপ্রাপ্ত) মেয়র হেলাল উদ্দিন কবির, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান, পৌর কাউন্সিলর ওমর ছিদ্দিক লালু ও শাহাবুদ্দিনসহ সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু সেভাবে কারো সাড়া মিলেনি বলে জানান মাইকিংকারীরা।

আবহাওয়া অধিদফতরের কক্সবাজার অফিসের সহকারি আবহাওয়াবিদ আবদুল হামিদ মিয়া জানান, গত শুক্রবার হতে মঙ্গলবার পর্যন্ত ৫ দিনে কক্সবাজারে গড় বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে ৮২ মিলিমিটার। ১৮ ও ২০ জুন ১০০ মিলির উপর বৃষ্টিপাত হয়। মাঝারি ও ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। বৃষ্টির সঙ্গে ধমকা হাওয়া প্রবাহিত হবার সম্ভাবনাও রয়েছে। এতে ঘটতে পারে পাহাড় ধসের ঘটনা।

সমিতিপাড়ার বাসিন্দা মোস্তফা সরওয়ার বলেন, কক্সবাজার পৌরসভার এক নম্বর ওয়ার্ডে দেশের সর্ববৃহৎ নাজিরারটেক শুঁটকি মহাল। এখানে রয়েছে সমিতি ও কুতুবদিয়াপাড়ার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। কিন্তু টানা বৃষ্টি হলেই এলাকাটি তলিয়ে গিয়ে এখানকার চলাচলের একমাত্র রাস্তাটি নালায় রূপান্তর হয়। বৃষ্টি ও জোয়ারের পানি এক হলে এই অঞ্চলগুলোর সঙ্গে শহরের গাড়ি যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এতে মারাত্বক দুর্ভোগে পড়েন পৌর ১নং ওয়ার্ডের প্রায় ২৫ হাজার মানুষ।


 
এদিকে, টানা মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টির কারণে কক্সবাজারে পাহাড় ধসের আশঙ্কা করছে জেলা প্রশাসন ও আবহাওয়া অধিদপ্তর। তাই জেলা ও উপজেলা শহরের বিভিন্ন পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানরত লোকজনকে নিরাপদে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে। কিন্তু থেমে থেমে বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। পানিবন্দি হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অনেকের ঘরবাড়িও। অনেক স্থানে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে সড়ক যোগাযোগ। এরপরও জেলার পাহাড়ে ঝুঁকি নিয়ে বাস করা অন্তত কয়েক লাখ মানুষকে সরিয়ে আনা যাচ্ছে না। দিন-রাত মাইকিং করা হলেও স্বেচ্ছায় কেউ সরে যেতে সাড়া দিচ্ছে না বলে অভিমত ভলান্টিয়ারদের।

তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার পৌরসভার অন্তত ১২টি পাহাড়ে বাস করছে আড়াই লাখের বেশি মানুষ। এর মধ্যে পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে আছে অন্তত ৪০ হাজার। ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকলে প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। কক্সবাজার শহরতলীর ফাতেরঘোনা, বৈদ্যঘোনা, মোহাজেরপাড়া, লাইটহাউস, ঘোনারপাড়া, কলাতলীর উত্তর আদর্শগ্রাম, দক্ষিণ আদর্শগ্রাম, চন্দ্রিমার ঘোনা, বখতিয়ার ঘোনা, লারপাড়া, বাসটার্মিনাল এলাকা, বাদশাঘোনা, পাহাড়তলী ও খাজামঞ্জিল পাহাড়ে ও পাহাড়ের খাদে রয়েছে অসংখ্য ঝুঁকিপূর্ণ বসতি। 

জেলা প্রশাসন ও কক্সবাজার পৌরসভা সূত্র মতে, পৌরসভার অভ্যন্তরে ডজনাধিক পাহাড়ে ভূমিধস ঝুঁকিতে আছে অন্তত ৪০ হাজার মানুষ। এসব পাহাড়ে বসতঘর রয়েছে প্রায় ১২ হাজারের বেশি। 

সেভ দ্য নেচার অব বাংলাদেশ'র চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম রিয়াদ বলেন, বৃষ্টি শুরু হলেই কেবল মাইকিং করে পাহাড় ধসের ক্ষতি থেকে ঝুঁকিতে বাসকারীদের সরানোর উদ্যোগ চলে। এভাবে ঝুঁকি ঠেকানো অসম্ভব। কক্সবাজারের স্বার্থে পাহাড়ে অবৈধ বাসকারীদের সরিয়ে নিতে হবে। উচ্ছেদ করতে হবে অবৈধ স্থাপনা। পাহাড়ে বাসকারিদের মাঝে অধিকাংশই মিয়ানমার থেকে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা।

পরিবেশবাদি সংগঠনগুলোর মতে, গত একদশকে কক্সবাজারে একাধিক পাহাড়ধসের ঘটনায় ছয় সেনাসদস্যসহ অন্তত ৯৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ রবিবার (১৯ জুন) পাহাড় ধসে মহেশখালীতে এক শিশু মারা যায়। ভারী বর্ষণে পাহাড়ের বিভিন্ন অংশে ফাটল ধরে ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। 

পরিবেশবীদরা বলেন, পাহাড় কাটার কারণে পাহাড় ধসের ঝুঁকি বাড়ছে। পাহাড় কাটা রোধ করলেই ধসের ঘটনা কমে যাবে। পাহাড়ে অভিযানের পর ফলোআপ করে না পরিবেশ অধিদফতর বা জেলা প্রশাসন। বর্ষা এলেই মাইকিং করে দায়িত্ব শেষ করে। শুষ্ক মৌসুমেই পরিকল্পনা নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের সরাতে হবে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. জাহিদ ইকবাল বলেন, গত সপ্তাহখানেক ধরে মাঝারি ও ভারী বর্ষণ চলছে। এতে ভূমিধসে প্রাণহানির সম্ভাবনা রয়েছে। তাই লোকজনকে পাহাড় ছাড়তে অনুরোধ জানিয়ে এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে। স্বেচ্ছায় তারা সরে না এলে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র (ভারপ্রাপ্ত) হেলাল উদ্দিন কবির বলেন, পাহাড় কাটার মাটি বৃষ্টির পানির সঙ্গে নেমে শহরের নালা-কালভার্ট ভরাট হচ্ছে। এতে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে সয়লাব হয় শহরের অলিগলি। দুর্ভোগ বাড়ছে মানুষের। তাই ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের সরিয়ে নিতে পৌরসভার পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে। কিন্তু পাহাড়ে বসবাসরত লোকজনের ভেতর এ নিয়ে কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে যেকোনো মুহূর্তে পাহাড় ধসে প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।

মহেশখালী উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, গত ২০০৭, ২০০৮ ও ২০১২ সালে ভারি বর্ষণে পাহাড়ধসে একই পরিবারের আটজনসহ ১২ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। এরপরও ছোট মহেশখালী, শাপলাপুর, কালারমারছড়া ও হোয়ানক ইউনিয়নে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে ও টিলায় বাস করছে।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি