১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভক্ত হলো। প্রায় ২০০ বছরের বেশি সময় ইংরেজরা ভারতবর্ষ শাসন-শোষণ করেছে। রক্তপাতহীন বিভক্ত ভারতবর্ষের স্বাধীনতা এলো দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে। ভারত-পাকিস্তান নামক তিন খণ্ডে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের একটি অংশ পূর্ব পাকিস্তান বাঙালি অধ্যুষিত ভূখণ্ড। এই ভূখণ্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বাঙালি হলেও এদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ চলতে থাকে। নতুন করে ভাবিয়ে তোলে বাঙালি জাতিকে। তদুপরি পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে তাদের শাসনকার্য পরিচালনা করতে থাকে। ভারতবর্ষ বিভক্তির মাত্র দুই বছরের মধ্যেই এ অঞ্চলের রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তিবর্গ বুঝতে পারে এ স্বাধীনতা তাদের জন্য নয়।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের নেতৃত্বে তত্কালীন প্রাদেশিক মুসলিম লীগের একাংশের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন টিকাটুলির কে এম দাস লেন রোডের রোজ গার্ডেন প্যালেসে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। যার সভাপতি হন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও সাধারণ সম্পাদক হন মো. শাসমুল হক। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হন শেখ মুজিবুর রহমান। পরবর্তী সময়ে নাম হয় নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের জন্মসূত্রের সঙ্গে ১৫০ নম্বর মোগলটুলিস্থ পূর্ববঙ্গ কর্মী শিবিরের উদ্যোগের সম্পর্ক অনস্বীকার্য।
২৩ জুনের সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন শওকত আলী। শওকত আলীর ১৫০ নম্বর মোগলটুলিস্থ বাসভবনে এবং কর্মী শিবির অফিসকে ঘিরে বেশ কয়েক মাসের প্রস্ত্ততিমূলক তত্পরতা পর ২৩ জুনের কর্মী সম্মেলনে দলের ঘোষণা দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, কলকাতা থেকে একটি মামলা পরিচালনার জন্য হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ঢাকায় আসেন। ঢাকা এসে তিনি শওকত আলীকে মুসলিম লীগ ছেড়ে একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল গঠনের পরামর্শ দেন। তরুণ শেখ মুজিবও কর্মীশিবিরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সাম্প্রদায়িক ভেদনীতির বিরোধিতায় শেখ মুজিবই ছিলেন প্রথম কাতারের সৈনিক। অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ ভাবধারা প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
স্বাধীন সার্বভৌম পাকিস্তানে তখনকার অধিকাংশ বাঙালি সাম্প্রদায়িকতা প্রশ্রয়ের বিপক্ষে। সহজ সরল বাঙালি ধর্মপরায়ণ হলেও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে লালন করে আসছে আবহমানকাল থেকে। জনগণের এই সাধারণ বোধ থেকেই নেতৃবৃন্দ একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কর্মী শিবিরে প্রধান নেতা ছিলেন শামসুল হক।
অন্যান্যের মধ্যে কামরুদ্দীন আহমদ, মো. তোয়াহা, অলি আহাদ, তাজউদ্দীন আহমদ, আতাউর রহমান খান, আব্দুল আওয়াল, মুহম্মদ আলমাস, শামসুজ্জোহা প্রমুখ। উল্লেখ করতে হচ্ছে যে, মুসলিম লীগের অন্যায় কাজকর্মগুলোর বিরোধিতার লক্ষ্যেই কর্মীশিবিরকর্মী শিবির গড়ে তোলা হয়েছিল। কর্মীশিবির কর্মীদের উদ্যোগেই আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন হয়। আওয়ামী মুসলিম লীগের পথ চলা শুরু হয় বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। ২৪ জুন ১৯৪৯ সনে মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে ঢাকায় আরমানিটুলার ময়দানে প্রকাশ্যে জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই জনসভায় প্রায় ৪ হাজার লোক উপস্থিত ছিল। রাজনৈতিক নানা সমীকরণের মধ্য দিয়ে ১৯৫২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান মাত্র ৩২ বছর বয়সে সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব লাভ করেন। সংগঠনের গতি ত্বরান্বিত হয় শেখ মুজিবের নেতৃত্বে।
শেখ মুজিব দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেই তিনি অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে দলের দর্শন হিসেবে গ্রহণ করেন। ১৯৫৩ সালে ‘মুকুল, প্রেক্ষাগৃহে পূর্ব-পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ১৯৫৩ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত একটানা ১৩ বছর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে ১৯৫৫ সালে তৃতীয় সম্মেলনে দল থেকে ‘মুসলিম, শব্দটি বাদ দেওয়া হলে একটি সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগ।
১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে শুরু হয়। আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের ওপর বিশেষ গুরুত্বসহ ৪২ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। শুরুর দিকে দলটি প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে ছিল রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার স্বীকৃতি, এক ব্যক্তি এক ভোট, গণতন্ত্র, সংবিধান প্রণয়ন, সংসদীয় পদ্ধতির সরকার। আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং তৎকালীন পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের মধ্যে বহুমুখী বৈষম্যের অবসান।
১৯৫৩ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর দলটি কৃষক শ্রমিক পার্টি, পাকিস্তানি গণতন্ত্রী দল ও নেজামে ইসলামের সঙ্গে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে। ১৯৫৪ সালের মার্চের ৮ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি আসন পায়, এককভাবে আওয়ামী মুসলিম লীগ পায় ১৪৩টি আসন। যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করলে তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান প্রাদেশিক মন্ত্রী পরিষদের সদস্য হন।
১৯৫৭ সালে পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে মতপার্থক্যের কারণে আওয়ামী লীগে ভাঙন সৃষ্টি হয়। এ বছরই ৭ ও ৮ ফেব্র‚য়ারি টাঙ্গাইলের কাগমারী সম্মেলনে দলের বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি নামে একটি নতুন দল গঠন করেন। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) জনমনে তেমন প্রভাব ফেলতে পারে নাই। সব অন্যায় অপরাধ ও অপশাসনের বিরুদ্ধে শেখ মুজিব তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলতে থাকেন।
উল্লেখ করার বিষয় যে, ১৯৬৬ সালের ১ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব লাভ করেন। তার সাংগঠনিক যোগ্যতাই আওয়ামী লীগের শীর্ষ পদ তার জন্যে নির্ধারিত হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ যেন নতুন করে চাঙ্গা হয়ে ওঠে। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে বিবেচিত। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বাংলার মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার আধার হয়ে ওঠে আওয়ামী লীগ।
এ বিষয়টি খুবই তাত্পর্যপূর্ণ যে, পাকিস্তানি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে কোনো বিরোধী দল গঠন করা খুব সহজ কাজ ছিল না। তার কারণ হচ্ছে জন-মন অপজিশন দলের জন্য তেমন প্রস্তুত ছিল না, তা নয়, বরঞ্চ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় একাধিক পার্টি থাকার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সাধারণ মানুষ বিশেষত পূর্ব বাংলার জনগণ খুবই সচেতন ছিল।
বিরোধী দল গঠন করতে গিয়ে পাকিস্তানের অনিষ্ট হয় এ ব্যাপারেও সচেতন থাকার চেষ্টা করত। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাংলার জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে আসছিল সব সময়। শেখ মুজিবুরের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থা। পাকিস্তানিদের শোষণ নীতির বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে চেষ্টা চালিয়ে যান। সরকারের ভেদনীতির বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে সংগ্রাম করতে গিয়ে অসংখ্য বার কারাগারে যেতে হয়েছে। একটা সময় কারাগারই হয়ে উঠে তার দ্বিতীয় আবাসস্থল। যৌবনের সিংহভাগ সময় তাকে কারাগারেই কাটাতে হয়েছে। ’৬৯-এর গণ অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
এরপর ’৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে পাকিস্তানের আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয় লাভ করে। শেখ মুজিবের রাজনৈতিক কর্মকুশলতা ও বাঙালির শোষণমুক্তির আন্দোলনের নেতৃত্বের গুণাবলি তাকে বঙ্গবন্ধুতে রূপান্তরিত করে। তিনি দেবদূতে পরিণত হন। আওয়ামী লীগের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ইতিহাসে খুবই সমৃদ্ধ। এ রকম ইতিহাস সৃষ্টিকারী দল পৃথিবীতে খুবই কম। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়। বঙ্গবন্ধুর নামের জাদুতে দেশ স্বাধীন হয়। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে ঘাতক কর্তৃক নিহত হলে দলটি বিপন্ন হয়ে পড়ে। তার কন্যা শেখ হাসিনা বেঁচে থাকায় আওয়ামী লীগ আবার ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়। আওয়ামী লীগের উত্থানপতন নানা ইতিহাস কমবেশি সবারই জানা। আজ আওয়ামী লীগের এই ৭৩ বছরে এ কথা বলতে দ্বিধা নেই যে, বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষার একমাত্র প্রতীক বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। এ জাতির আত্মমর্যাদার জায়গা শক্তিশালী করতে পেরেছে একমাত্র আওয়ামী লীগ।
ত্যাগ-সংগ্রাম ও গৌরবের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। এ জাতির অগ্রগতি উন্নয়নের গৌরব ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্ব দরবারে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে।
লেখক: খাদ্যমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
