সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

রামমোহন ও উপমহাদেশে পারস্যচর্চা

আপডেট : ২৪ জুন ২০২২, ১১:২২

ইসলামের প্রতি রাজা রামমোহন রায়ের শ্রদ্ধাবোধ ছিল অপরিসীম। খোদা এক ও অদ্বিতীয়— স্রষ্টা সম্পর্কে এই একত্ববাদ, যাকে বলা হয় আপসহীন একত্ববাদ, তাতে ছিল তাঁর সুগভীর আস্থা। আল্লাহর কোনো শরিক নেই— ইসলামের এই অনন্য তত্ত্বেও তাঁর প্রত্যয় ছিল গভীর। সে কারণে তিনি মূর্তি পূজায় বিশ্বাসী ছিলেন না। তাঁর এই আপসহীনতা তাঁর যুক্তিবাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একদিকে খোদা, অন্যদিকে যুক্তি— এ দুইয়ে মিলে ছিল তাঁর মৌল জীবনবোধ।

বিভিন্ন ধর্মের মূল্যবোধগুলোকে তিনি যুক্তির নিরিখে জীবনে প্রতিষ্ঠা দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। মূল্যবোধগুলো যদি হয় ফুল, তাহলে যুক্তি হলো সূত্র, যা দিয়ে মালা গাঁথা যায়। সূত্র ছিন্ন হলে মাল্যের মহিমাও আস্ত থাকে না— এই মনোভাবই তাঁকে জীবনের সব ক্ষেত্রে বিজয়ী করেছিল।

নিশ্চিত করে বলা যায়, ইসলামের প্রথম যুগের বিজ্ঞান চেতনা ও যুক্তিবাদ তাকে এই ধর্মের প্রতি প্রবল বেগে আকর্ষণ করেছিল। তারই সঙ্গে মিশেছিল ইউরোপের আধুনিক কালের বুদ্ধির মুক্তি আলোড়ন। মনীষী অন্নদাশঙ্কর রায় রামমোহনের ভাবনায় তিনটি সভ্যতার মিশ্রণ লক্ষ করেছেন। এই তিনটি সভ্যতাকে ‘তিনটি ধারা’ নামে চিহ্নিত করে সেই তিন ধারার একটি আশ্চর্য ত্রিবেণী সঙ্গম ঘটেছে রামমোহনের চরিত্রে ও চিন্তায়। এমনটিই অন্নদাশঙ্করের রামমোহন সম্পর্কিত সাংস্কৃতিক মূল্যায়ন, যা বাঙালি রেনেসাঁসের একটি অনন্য দৃষ্টিকোণকে আমাদের সামনে মেলে ধরেছে। সেই চিন্তার উত্তরসূরি আজকের বাংলায় পাওয়া যায় না। রামমোহনের পূর্বাপর কালেও তাঁর মতো কেউ ছিলেন না। যুগপুরুষ হিসেবে তিনি একা।

ভারতবর্ষে আজও তিনি একা। অন্নদাশঙ্কর ঠিক কী বলেছিলেন, হুবহু তুলে ধরা যাক। তিনি বলছেন, ‘রামমোহন রায়ের পরে দ্বিতীয় একজনকে দেখা গেল না, যিনি তিনটি ধারার ত্রিবেণী সঙ্গমের জন্য আজীবন ভাবনা করেছিলেন। সেই তিন ধারার নাম হলো—প্রাচীন যুগের ভারতীয়, মধ্যযুগের আরব্য-পারস্য ও আধুনিক যুগের ইউরোপীয়। তাঁর উত্তরসূরিরা ত্রিবেণী সঙ্গমের বদলে দ্বিবেণী সঙ্গমের ভাবনায় নিবিষ্ট হন। একটি হলো প্রাচীন ভারতের হিন্দু সভ্যতা বা প্রাচ্য সভ্যতা, অন্যটি আধুনিক যুগের পাশ্চাত্য সভ্যতা।’

অর্থাৎ প্রাচীন হিন্দু ভারত ও তার ভাবধারা আর আধুনিক ইউরোপীয় ভাবধারার মিশেলে যে পদার্থটি তৈরি হয়েছে, সেটাই ভারতের অবলম্বিত সংস্কৃতি! আরব্য-পারস্য ভাবধারাকে ছেঁটে ফেলার অভিপ্রায়ে ব্যস্ত আজকের বুদ্ধিজীবী সমাজের একাংশ। মধ্যযুগটিকেই এড়িয়ে চলতে চায়। কিংবা ছাঁটতে চায় বা বাদ দিতে চায়। দ্বিবেণী সঙ্গমে প্রভূত ‘নাফা’ আছে মনে করে তারা। এমন বুদ্ধিজীবীদের আমরা রামমোহনচর্চার যোগ্য মনে করি না। রামমোহন প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্ম সমাজের ধর্মচেতনা ও আদর্শকে বুঝে নেওয়াটা বাঙালি রেনেসাঁস চর্চার সূচক অভিমুখ বলা যেতে পারে।

অর্ধ প্রাসঙ্গিক একটি বিষয়ের এখানে উল্লেখ করি, যা মাঝে মাঝেই উল্লেখ করাটা আমার আপ্তবাক্য। আর তা হলো, আমাদের পাঁচ জন বড় কবির দুজন ব্রাহ্ম, একজন খ্িরষ্টান এবং একজন মুসলমান। পঞ্চমজন একজন আউলিয়া ফকির; বৌদ্ধ-ইসলাম মেশানো বাউল। তাঁরা হলেন মাইকেল মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ ও লালন।

বাংলাদেশ ও বাংলা কবি প্রেরণার দেশ—কবিকে বাদ দিয়ে এখানে কিছুই হয় না। কবিই বাক্য, কবিই গান। বৃহৎ কবি পঞ্চকের দুজনই ব্রাহ্ম। ভারি আশ্চর্যের এই বাংলায় তথা ভারতবর্ষে ধর্ম সমন্বয় ভাবনার উদ্গাতা হলো ব্রাহ্ম সমাজ। অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ যে কত অপরিমেয় হতে পারে তার দৃষ্টান্তস্থল ব্রাহ্মরাই; বাংলাভাষায় কোরআন শরিফের প্রথম যিনি অনুবাদ করেন, তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম ধর্মেরই মানুষ; ভাই গিরিশচন্দ্র সেন। কোরআনের অতি উচ্চমানের বঙ্গানুবাদ কোনো মুসলমান ভাইয়ের কীর্তি নয়—এ কথা মনে রাখলে বাংলার ভালো বই খারাপ হয় না।

ভারতীয় সংস্কৃতিতে আরব্য-পারস্য প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন কৃতী লেখক অসংখ্য আলোচনা করেছেন। ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা বিবেকানন্দ-নজরুল পর্যন্ত এক ব্যাপক পরিসরে প্রকাশ পেয়েছে। মধুসূদনের ফার্সি চর্চা এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। রবীন্দ্রপরিবার তো মরমিয়া ফার্সি কবি হাফেজ দ্বারা সমাচ্ছন্ন পরিবার। গল্প-উপন্যাস-নাটকে রবীন্দ্রনাথ ইউরোপীয়, কিন্তু কাব্যে ও গানের কথায় মূলত পারসিক। ‘গীতাঞ্জলি’ তো বিশ্বকে রবীন্দ্রনাথের পারস্য অঞ্জলি। তার মানে অবশ্য এ নয় যে, রবীন্দ্রনাথের কবিতায় ইউরোপ নেই। কিন্তু ফারসি সুফি কাব্যের মরমি প্রভাব রবীন্দ্রনাথে অকাট্য— এটাই আমাদের বলার কথা। সে যাক। কবি জীবনানন্দের হাজার বছরের পথ চলায় মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমি ও সাগর আশ্চর্য আন্দোলিত। এই কবির ইতিহাস ভাবনায় মিশর-বেবিলন-উর ইত্যাদি মিশে রয়েছে। তার ‘পথ হাঁটা’ কবিতাটি মনে পড়ে?

কবিতাটির শেষ পাঁচ লাইন এরকম:
‘আর কিছু দেখেছি কি; একরাশ তারা আর মনুমেন্ট ভরা কলকাতা?
চোখ নিচে নেমে যায়—চুরুট নীরবে জ্বলে—বাতাসে অনেক ধুলো খড়;
চোখ বুজে একপাশে সরে যাই—গাছ থেকে অনেক বাদামি জীর্ণ পাতা
উড়ে গেছে; বেবিলনে একা-একা এমনই হেঁটেছি আমি রাতের ভিতর
কেন যেন; আজও আমি জানি নাকো হাজার হাজার ব্যস্ত বছরের পর।’

সুতরাং কলকাতার রাস্তায় নির্জন পথে রাত্রিবেলা হেঁটে যেতে যেতে কবি তাঁর অবচেতনায় ইতিহাসের সরণি ধরে চলতে চলতে বেবিলন আর কলকাতাকে একই পথের সম্প্রসারণ মনে করেন— এই ইতিহাসবোধ কোথায় যেন রাষ্ট্রীয় কানাগলিতে আজ সেঁধিয়ে দিয়েছে ভারত। আর আমরা নাগরিক কবিরা বিশুদ্ধ ইউরোপীয় হয়েছি— এককালে ফার্সি আওড়াতাম— এখন শুধুই ইংরেজি আওড়াই।

রামমোহনে ফেরা যাক। তাঁর স্কুল শিক্ষা ছিল আরবি-ফার্সি ভাষা শিক্ষা। ৯ বছর থেকে শুরু। ১৬ বছরে পৌঁছে সংস্কৃত শিক্ষা। আর ইংরেজি শিক্ষা পরবর্তীকালে সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় শেখা। তাঁর যে বিশুদ্ধ যুক্তিবাদ, তা কিন্তু ইউরোপীয় ধ্যানধারণা পোক্ত হয়ে গড়ে ওঠার আগেই একপ্রকার শুরু হয়ে গেছে—সেই যে যুক্তিবাদিতার অনুরাগ, তা ধরা পড়েছে তাঁর লেখা প্রথম বইটিতেই। বইটি ফার্সি ভাষায় লেখা; ভূমিকাটি আরবিতে।

যুক্তিকে বাদ দিয়ে ধর্মসংক্রান্ত কোনো আলোচনায় রামমোহনের উত্সাহ ছিল না। বইটির নাম ‘তুহফত্-উল-মুহাদ্দিন’—যুক্ত আশ্রয়ী একেশ্বরবাদ তত্ত্বের আলোচনা। বইটির বাংলা নাম ‘একেশ্বরবাদীদের জন্য উপহার’।

বুদ্ধির মুক্তিই জাতি ও দেশের অগ্রগতি ও যাবতীয় উত্কর্ষের পথ। অন্ধ সমাজ এগোতে পারে না। কুসংস্কার ও গোঁড়ামি থেকে আমাদের চিন্তাকে মুক্ত রাখাটাই প্রধান সাংস্কৃতিক কর্তব্য। রামমোহনের যুক্তিনিষ্ঠাকে সেলাম জানাতেই এই ক্ষুদ্র রচনাটির অবতারণা।

রামমোহন তুহফৎ-এ কোরআনের বাক্যকে যুক্তির সমর্থনে ব্যবহার করেছেন। এই শিক্ষা আমাদের কোরআন চর্চায় ভিন্নতর দিশা দেখায়। তাঁর জন্মের ২৫০ বছর পেরোলাম আমরা। ভারতবর্ষ আজ যুক্তির পথ ভুলে গেছে। বস্ত্তত সবাই ভোলেনি। তাই রক্ষা।

তাঁর বইটি ফার্সি ভাষায় লেখা। বইটির ইংরেজি আছে এবং তা থেকে চমত্কার বাংলা তরজমা আছে। তার একটি বাক্য এরকম —‘সাংসারিক ব্যাপারে এক বস্ত্তর সঙ্গে অন্য বস্তুর কোনো কার্যকারণ সম্বন্ধ না জানলে মানুষ একটাকে কারণ, অন্যটাকে ফল বলে মেনে নিতে রাজি নয়।’

এই যে যুক্তি, সেটাকেই ধর্ম বিচারের বেলায়ও কাজে লাগাতে হবে। যে কোনো সংকট-পরিস্থিতির সামনে কোরআন মানুষকে চোখ খোলা রাখতে বলেছে। বলেছে, ‘যাদের চোখ আছে, তারা এ থেকে সাবধান হও।’ (কোরআন)। আমাদের বিচারেও কোরআন মানুষের পর্যবেক্ষণশক্তির আধার। এই লেখায় ইসলাম অনুসারীদের ৭২ ফেরকা বা উপদলে ভাগ হয়ে যাওয়ার নিন্দা করা হয়েছে। এই ফেরকাবাদীরা তর্ক ও ন্যায়শাস্ত্রের যুক্তিই মানেনি। সম্ভব-অসম্ভবের সীমা মানত না—রামমোহন মহাত্মা হাফিজের উক্তি তুলে ধরেছেন— ‘৭২টি সম্প্রদায়ের (ফেরকার) বিবাদ সহ্য করতে হবে, কারণ তারা সত্য না জেনে আজগুবি অর্থহীন গালগল্পের পথ মাড়িয়ে চলেছে।’ হা খুদা! আজো চলেছে।

 

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

রস 

পরম্পরা 

বঙ্গবন্ধু ও চলচ্চিত্রের একটি অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থ

তামাশা 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

কালো সূর্য

থাই মহাকাব্য রামাকীইন-কথা

পথের শেষ কোথায়? ঘৃণার শেষ কোথায়?

বাংলাদেশপ্রেমিক একজন কবি