সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

গ্রেট মাইন্ড থিংক অ্যালাইক

আপডেট : ২৪ জুন ২০২২, ১২:৩৭

একটি অল্পবয়সি মেয়ে একটি যুবকের প্রেমের টানে ঘর ছেড়েছিল। পরে সেই মেয়েটিকে অনেক অসম্মানের মধ্যে রেখে ছেলেটি তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। অর্থাৎ ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে গিয়েছিল। কিন্তু মেয়েটির ফিরে যাবার সব পথ রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। তখনকার সমাজও বড় নিষ্ঠুর ছিল, বিশেষ করে মেয়েদের প্রতি। ফলে মেয়েটি অন্ধকারের জগতেই হারিয়ে গিয়েছিল। এর অনেক বছর পর মেয়েটিকে তার একটি তথাকথিত অপরাধের বিচার করার জন্য আদালতে নিয়ে আসা হয়েছিল। বিচারকের আসনে বসেছিল সেই লোকটি, যে তাকে ঘর ছাড়া করেছিল, যে মেয়েটির ঐ দুরবস্থার জন্য দায়ী। লোকটি মেয়েটিকে যখন চিনতে পারল, গল্প সেখানেই শেষ। গল্পটি লিখিত প্রকাশিত হয়েছিল জানুয়ারি, ১৮৯৩ সালে।

রবীন্দ্রনাথের বিচারক গল্পটা অনেকেই পড়েছেন। সকলেই বলেন ওটা টলস্টয়ের রেজারেকশন গল্পের ছায়ায় লেখা। কিন্তু আমি তা মনে করি না। তিনি সেসময় প্রচুর ছোটগল্প লিখেছিলেন। তাঁর প্রতিটি গল্পই এক একটি হীরক খণ্ডের সঙ্গে তুলনীয়। কোনোটিই অন্য কোনো লেখকের গল্পের ছায়ায় লিখিত নয়। বরং তাঁর গল্পের ছায়ায় অনেক লেখক গল্প লিখেছেন। তাঁর লেখা নাটক বৈকুণ্ঠের খাতার সঙ্গে সুকুমার রায়ের ঝালাপালা নাটকের অনেক মিল পাওয়া যায়।

এবার আসা যাক টলস্টয়ের রেজারেকশন- এর প্রসঙ্গে; গল্পের নায়ক নেখলিউদভ ঠিক ঐভাবেই একটি মেয়ের সঙ্গে প্রণয় করে তাকে একরাশ অসম্মানের মধ্যে রেখে চলে গিয়েছিল। ফলে মেয়েটিকে তার ‘ব্যভিচারের’ জন্য আশ্রয়চ্যুত হতে হয়। কোথাও গিয়ে সে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারেনি। তার অতীত ‘কীর্তি’ না অন্যরা ভুলেছে না তাকে ভুলতে দিয়েছে। এর ফলে তার পক্ষে ভদ্রভাবে কোনো কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করা অসম্ভব হয়ে পড়ল। সে বাধ্য হলো পতিতা বৃত্তি গ্রহণ করতে। এর কয়েক বছর পর তাকে কোনো কারণে বিচারকের সামনে আনা হলো, বিচারক হলো নেখলিউদভ। টলস্টয়ের গল্প এখানে শেষ নয়, বরং শুরু বলা যায়। বহুবছর আগে টলস্টয়ের রেজারেকশন বইটি পড়েছিলাম আমি। পুরো কাহিনিও আর মনে নেই। তবে নেখলিউদভের আত্মশুদ্ধির বিষয়টি মনে দাগ কেটেছিল খুব।

টলস্টয় এই উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে রাশিয়ার একটি মাসিক পত্রিকায় লেখা শুরু করেন ১৮৯৩ সালেই। উপন্যাসটি শেষ হয় ১৮৯৫ সালে। এর পরিবর্ধিত সংস্করণ পুস্তক আকারে প্রকাশিত হয় সম্ভবত ১৮৯৭ সালে। কিন্তু টলস্টয় নিজের সৃষ্টিতে নিজে ঠিক সন্তুষ্ট ছিলেন না। এই বইটি কিছু সংশোধন সংযোজন করে আবারও লেখেন এবং সেটি প্রকাশ হয় ১৮৯৯ সালে। এরপর এর ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয় ও বইটি বিখ্যাত ও জনপ্রিয় হয়ে যায়। এর পর বইটি পৃথিবীর সমস্ত প্রধান ভাষায় ও বাংলাতেও অনূদিত হয়।

তাহলে রবীন্দ্রনাথ যখন ১৮৯৩-এর জানুয়ারিতে বিচারক গল্পটি লেখেন, টলস্টয় গল্পটি লেখাই শুরু করেননি। আর যদি করতেনও, রবীন্দ্রনাথের পক্ষে রাশিয়ান শিখে তাঁর গল্প ‘নকল’ করা সম্ভব ছিল না।

তবে কি টলস্টয় রবীন্দ্রনাথের গল্পের প্লট ‘নকল’ করেছেন? না, তাও করেননি। তিনিও বাংলা জানতেন না বলেই আমি মনে করি। যারা মূর্খ, যাদের আত্মা মরে গেছে তারাই রবীন্দ্রনাথকে ছোট করবার জন্য এসব রটায়। তাঁর চিন্তার গভীরতা, জ্ঞান, জীবন দর্শন এবং সততা সম্পর্কে যাঁরা অবগত তাঁরা এরকম ভাবতে পারেন না। তাহলে এই অত্যাশ্চর্য মিলের কারণ কী। কারণ, উভয়েই জমিদার বংশের সন্তান, কাজেই উভয়ের অভিজ্ঞতায় মিল থাকাটাই স্বাভাবিক। আর একটা কারণ হলো, এটাই আসল কারণ, গ্রেট মাইন্ড থিংক অ্যালাইক।

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

রস 

পরম্পরা 

বঙ্গবন্ধু ও চলচ্চিত্রের একটি অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থ

তামাশা 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

কালো সূর্য

থাই মহাকাব্য রামাকীইন-কথা

পথের শেষ কোথায়? ঘৃণার শেষ কোথায়?

বাংলাদেশপ্রেমিক একজন কবি