সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

পাশের সিটের মেয়েটি

আপডেট : ২৪ জুন ২০২২, ১২:৫৮

তিলোত্তমা এই শহরটাকে যে যার মতো নষ্ট করছে। যে মায়াবতী শহরটা দেড় কোটি মানুষকে কোলে নিয়ে জেগে থাকে দিন-রাত, সেই শহরকেই মানুষ ক্রমেই গলা টিপে খুন করছে! পাবলিক বাসে বসে তপুর মগজে কথাগুলো যেন কুটকুট করে চিমটি কাটছে। প্রায় বিশ মিনিট ধরে বাসের ড্রাইভার চেষ্টা করছেন সায়েদাবাদ বাসডিপো থেকে বের করতে। কিন্তু দু’পাশের হকারদের রামরাজত্ব, পার্কিং করা গাড়িগুলোর কোথাও মাথা আবার কোথাও পেছনটা বের হয়ে আছে, শার্টের কলার খাড়া করা পাতিমাস্তানের বীভত্স গালকাটা মুখ, শরীর ঘেঁষা মানুষের চিত্কার চেঁচামেচি, হাজারো গাড়ির প্যাঁ-পু হর্নের আওয়াজ— এ যেন এক অসহ্য নগরীর নরকের খণ্ডচিত্র!

গত রাতে তার ছাত্রাবাসের একই ছাত্রসংগঠনের দুই গ্রুপের মধ্যে সারা রাত ধরে রক্তক্ষয়ী সংর্ঘষ হয়। ভোরে পুলিশ এসে পরিস্হিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। রাতে একটু ফোঁটাও ঘুমাতে পারেনি তপু। তবুও ষষ্ঠ সেমিস্টারের পরীক্ষাটা শেষ করেই সে সিলেটে বোনের বাসায় যাওয়ার জন্য বের হয়েছে। বোন-জামাই জাহিদ খুবই ‘মাই ডিয়ার’ টাইপের লোক। তপুর বাস শিশুর মতো সবে চলতে শুরু করেছে। সে জানালায় মুখ বাড়িয়ে বসে আছে। গত রাতে না-ঘুমানোর প্রতিক্রিয়া চোখে জানান দিচ্ছে বেশ। তার চোখ দুটো জ্বলছে খুব। বিধি মোতাবেক তপু তন্দ্রায় ডুবে গেল।

‘ওস্তাদ, ব্রেক। পুনম সিনেমা হলের সামনে একটু রাইখেন। মহিলা উঠবো একজন।’ বাসের দরোজায় সজোরে আঘাত করে চেঁচিয়ে উঠল বাসের হেলপার। হঠাৎ বাসটি জায়গায় ব্রেক কষার ঝাঁকুনিতে তপুর চোখের তন্দ্রা কেটে গেল। চোখ খুলে জানালা দিয়ে বাইরে তাকায় সে। হঠাত্ বাসের দরোজার সামনে তার চোখজোড়া আটকে যায়। যেন সাক্ষাত্ স্বর্গ থেকে নেমে আসা হুর পরী। বাসের সবাই হাঁ করে মেয়েটাকে যেন গিলছে। সহযাত্রীদের ওপর তপুর খুব রাগ হচ্ছে। একটা মেয়ে রূপসী হলেই এভাবে নির্বোধের মতো তাকিয়ে থাকতে হয়! ছাইরঙা গ্যাবাডিন প্যান্ট, নীল ফতুয়া, পায়ে চটি জুতা আর কপালে ছোট্ট কালো টিপ—এক কথায় মেয়েটা অনিন্দ্য সুন্দরী। সুপারভাইজার তপুর পাশের ই-টু সিটটি দেখিয়ে মেয়েটাকে বলল—আফা, এইটা আপ্নের সিট। এইখানে আরাম কইরা বহেন।

সর্বনাশ এ তো মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি! মেয়েটি যখন তার পাশের সিটে বসল তখন তার সুরভি যেন নাকে এসে বিমোহিত করে দিল তপুকে। মেয়েটা ইয়ারফোন কানে গুঁজে একমনে গান শুনতে লাগল। মাঝেমধ্যে গুনগুনিয়ে নিজেও গান গাইছে। বাসের স্টিয়ারিংয়ে মনে হয় আজ কোনো জাদুর ছোঁয়া লেগেছে। রেসিং কারের মতোই এঁকেবেঁকে এগিয়ে চলছে বুলেট বাস সিলেটের পথে। এত গতিতে কেউ গাড়ি চালায়!

—এক্সকিউজ মি, ভাইয়া। আপনার সিটটা কি আমাকে ছেড়ে দিবেন, প্লিজ? আমার মাথাটা খুব ধরেছে। বমি বমি লাগছে। জানালার পাশে বসলে হয়তো ভালো লাগত।
—ইট্স ওকে। আপনি জানালার পাশেই বসুন।
—আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ, ভাইয়া।

পাশের সিটে বসার সময় মেয়েটা ভারসাম্যহীন হয়ে গেলে তার কনুইয়ের আঘাত লাগে তপুর কপালে। কপালটা চেপে কুঁকিয়ে ওঠে সে। মেয়েটার চোখেমুখে একরাজ্যের অপরাধবোধ মিছিল করছে তখন। তা স্পষ্টতই দেখতে পায় তপু। শরীরের ব্যথার চেয়ে বরং তার মনে আনন্দটা দোলা দিচ্ছে বেশি। যেন বর্ণিল প্রজাপতিরা খেলা করছে। কত সিনেমা নাটকে এমন টুকটাক ধাক্কাধাক্কি দৃশ্যের পর নায়ক-নায়িকার মধ্যে প্রেম হতে দেখেছে সে। মেয়েটা কিছুটা বিচলিত হয়ে হাতের টিসু্যটা পানিতে ভিজিয়ে তপুর আঘাতপ্রাপ্ত কপালে ধরে আছে। আহ! কী সুখ। চোখজোড়া বুজে আসে তপুর।

—আ’ম এক্সট্রিমলি সরি।
—কী বলছেন! আপনি তো আর আমাকে ইচ্ছে করে আঘাত করেননি। তাহলে সরি বলার কী আছে?
—না। আসলে আঘাতটা বেশ লেগেছে আপনার। আচ্ছা আপনি যাচ্ছেন কোথায়?
—উপশহর। বোনের বাসায়। দিন কয়েক থাকব সেখানে আর টুটু করে সিলেটকে ঘুরে দেখব। আপনিও ঘুরতে যাচ্ছেন বুঝি?
—না। আমি সাস্টে আছি। পলিটিক্যাল সাইন্সে সেকেন্ড সেমিস্টারে পড়ছি।

এভাবেই কথার পিঠে কথা হাঁটে দুজনের। তপুর আরক্তিম গালের লজ্জা রঙেও ক্রমেই ভাঁটা নেমে আসে। দুজনই এখন খুব সাবলীলভাবে গল্প করছে। শৈশব থেকে শুরু করে ক্যাম্পাসজীবন, সমকালীন রাজনীতি, নিজেদের ভালোলাগা, মন্দলাগা—এসবের ইতিবৃত্ত। প্রিয় রং, প্রিয় কবি, প্রিয় খাবার—এসব নিয়েও কথা হচ্ছে খুব। তপুর বেশ কিছু ভালোলাগার বিষয় মেয়েটার পছন্দের সঙ্গে মিলে গেছে। এটা মনে করতেই তার মনে দারুণ এক অনুভূতি খেলা করছে গোপনে।

‘হোটেল হাইওয়ে-ইন’-এ ২০ মিনিটের বাস যাত্রাবিরতি। যাত্রীরা একে একে নেমে গেল। তপু তার হাতের বইটা ব্যাগে তুলে রাখতে রাখতে বলল
—নামবেন না? চলুন কফি খেয়ে আসি।
—কফি হলে মন্দ হতো না। থ্যাঙ্কস এ লট। আসলে আমি যাত্রাপথে বাইরের কিছু খাই না। প্রায়ই মলম পার্টি, অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়ে সর্বসাধারণের জানমাল লুটের খবর পড়ি পত্রিকায়। আর বাইরের খাবার আনহাইজেনিক ফর হেলথ। সরি এগেইন।
—নো সরি। আপনি? ঠিকই বলেছেন। বাইরের খাবার না-খাওয়াই ভালো।
—আসার সময় আম্মু কিছু পিঠা ও নুডুলস সঙ্গে করে দিয়েছেন। আপনার আপত্তি না থাকলে আমরা শেয়ার করতে পারি।
—কী বলছেন। আপত্তি থাকবে কেন! আর আপনার আম্মুর হাতের পিঠা খাব—এটা তো আমার সৌভাগ্য।

হায় রে! অনিন্দ্য সুখের অপর নামই জীবন। যাত্রাবিরতি শেষ করে বাস আবার হাওয়াই বেগে চলতে শুরু করেছে। মেয়েটা বাসের জানালায় মুখ বের করে বাতাস গিলছে। বাতাসে এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুলের দুষ্টুমি দেখতে তপুর ভালো লাগছে খুব। মেয়েটা তার দিকে একটু ঝুঁকে বলল

—তিন ঘণ্টা ধরে আমরা একটানা গল্প করছি। অথচ কেউ কারো নাম জানি না! কী অদ্ভুত না। আমি পারভীন চৌধুরী। মা-বাবা আদর করে ডাকেন—পরী।
—আমি রাফাত আল মামুন। দাদুর দেয়া তপু নামটাই মার্কেটে বেশি জনপ্রিয়। যদিও বন্ধুরা ডাকে তপ্পা নামে।
—হা হা। আপনি খুব মজা করে কথা বলেন। শুনতে বেশ লাগে।
—কী যে বলেন! আপনার কথা তো আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছি। আচ্ছা, যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে আমাদের এই মুহূর্তের একটা সেলফি তুলতে পারি? মুহূর্তটাকে ফ্রেমে বাঁধার লোভ আমি সংবরণ করতে পারছি না।
—মোবাইলের ফ্রেমে বাঁধতে চাচ্ছেন! মনের ফ্রেমে জায়গা হবে না বুঝি! ওকে, জাস্ট কিডিং। তবে শর্ত আছে।
—কী শর্ত?
—ছবি তুললে সেটা ফেসবুকে আপলোড করা যাবে না।
—ওকে ফেসবুকে পোস্ট করব না।

সেলফি তোলার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাস চলছে। পরী আর তপুর কথার এক পর্যায়ে দুজনের মোবাইল নাম্বার দেওয়া নেওয়া করে। তপু হঠাৎই পরীর কাঁধে মাথা রেখে ঘুমাতে থাকে। বিভোর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে সে...।

সবেমাত্র আড়মোড়া দিয়ে ওঠে তপু। গত পাঁচদিন পর চোখ খুলল সে। তার বেডের চারপাশে বোন, বোন-জামাই জাহিদ, সদর থানা ওসিসহ ডাক্তার নার্স সবাই তার দিকে নিবিড়ভাবে তাকিয়ে আছেন। সে বিচলিত হয়ে ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করল—আমি এখানে কেন?

—তুমি অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়েছিলে। তুমি বড় বাঁচা বেঁচে গেছ, বাবা। দ্রুত তোমাকে হাসপাতালে না নিয়ে আসলে তোমাকে বাঁচানো কঠিন হয়ে যেত।
—আপু, আমার মোবাইলটা দাও। আমি একজনকে কল করব।
—আরে বোকা, তোর মোবাইল, ম্যানিব্যাগ, ল্যাপটপের ব্যাগ সবই নিয়ে গেছে। থাক ওসব। তুই ভালো আছিস তাতেই আমরা আল্লাহর কাছে শোকরিয়া।

ওসি সাহেব এসে জিগ্যেস করলেন, ‘কীভাবে আপনি অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়েছেন, কিছু মনে পড়ছে না? কাউকে সন্দেহ হচ্ছে আপনার?

—না। তেমন কারো কথা তো মনে পড়ছে না।
—ওকে। আপনি রেস্ট নিন। পরে একবার আমি আসব।

তপু কী যেন মনে করে একা একা মুচকি হাসতে থাকে। হাসপাতালের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে সে দেখে দূরের একটা টিলার ওপর চলছে উত্সব। বর্ণিলভাবে সাজানো সবকিছু। ঢাক-ঢোল বাজছে। উত্সবের রঙে আরো গাঢ় হয়েছে সবুজ চায়ের পাতাগুলো।

 

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

রস 

পরম্পরা 

বঙ্গবন্ধু ও চলচ্চিত্রের একটি অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থ

তামাশা 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

কালো সূর্য

থাই মহাকাব্য রামাকীইন-কথা

পথের শেষ কোথায়? ঘৃণার শেষ কোথায়?

বাংলাদেশপ্রেমিক একজন কবি