বুধবার, ১৭ আগস্ট ২০২২, ১ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

আত্মমর্যাদায় এগিয়ে গেলো বাংলাদেশ

আপডেট : ২৫ জুন ২০২২, ০৪:০০

‘বাজলো তোমার আলোর বেণু-মাতলো যে ভুবন’—কবিগুরু রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের এই কাব্যিক ভাষায় আজ যেন বাংলাদেশ আলোর বেণু বাজিয়ে বিশ্বকে ঝলমল করে দিল। উচ্ছ্বাস-আবেগে ভরিয়ে বিশ্বকে উপহার দিল নতুন এক বাংলাদেশ। সবাই স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে, এই সেতু নির্মাণ করে আত্মমর্যাদায় এগিয়ে গেল বাংলাদেশ।

আমাজনের পর দ্বিতীয় খরস্রোতা নদী পদ্মার ওপর দ্বিতল সড়ক ও রেলসেতু নির্মাণ, তাও আবার নিজস্ব অর্থায়নে। এ কারণেই পদ্মা সেতু এখন কেবল একটি স্থাপনা নয়, সারা বিশ্বের বিস্ময়। দুর্নীতির অপবাদ আর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিবাদের নাম পদ্মা সেতু।

প্রধানমন্ত্রীর যোগ্য নেতৃত্ব আর সময়োপযোগী সাহসে ভর করে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ ও চক্রান্ত ভেদ করে নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছে আজকের বাংলাদেশ। এই সেতুটি অপেক্ষাকৃত অনুন্নত অঞ্চলের সামাজিক অর্থনৈতিক ও শিল্প বিকাশে উল্লেখযোগ্যভাবে অবদান রাখবে। জনজীবনে স্বস্তির পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনবে, বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

সমীক্ষা অনুযায়ী, চালুর পর জিডিপি ১ দশমিক ২৩ শতাংশ বাড়াতে ভূমিকা রাখবে এই স্বপ্নের সেতু। একইভাবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিডিপি বাড়বে ২ দশমিক ৩ শতাংশ। পদ্মা সেতুর ফলে দেশের পরিবহন নেটওয়ার্ক এবং ভূ-আঞ্চলিক যাতায়াতের সুযোগ সহজতর হবে, পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলের ৪৫০ কিলোমিটার রাস্তা আবার প্রশস্তকরণের কাজ হাতে নিয়েছে সরকার। কারণ পদ্মা সেতু চালু হলে ঐ অংশে চাপ বাড়বে। এই সেতু চট্টগ্রাম বন্দর, পায়রা বন্দর, বেনাপোল স্হলবন্দর, মোংলা নৌবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ দূরত্ব কমিয়ে ভারতসহ আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ সহজতর করবে।

পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদিত হয়েছিল ২০০৭ সালের আগস্টে। ২০০৭ থেকে ২০১৫ মেয়াদে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রকল্পটি অনুমোদন করেছিল তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার। নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকা। 

আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১১ সালে প্রকল্পটি প্রথম বার সংশোধন করা হয়। নকশা পরিবর্তন ও সেতুর সঙ্গে সংযোজন করা হয় রেলপথ। এতে প্রকল্পটির ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। মেয়াদ ২০১৫ সাল পর্যন্তই রাখা হয় প্রথম সংশোধনীতে।

পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) দ্বিতীয় বার সংশোধন করা হয় ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে। নির্মাণ ব্যয় বাড়িয়ে ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত। তবে ২০১৭ সালের দিকে সেতুর ১৪টি পিলারের (খুঁটি) নকশায় ত্রুটি দেখা দিলে বিলম্বিত হয় নির্মাণকাজ। নতুন করে নকশা করতে প্রায় ১৫ মাস পার হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে ২০১৮ সালের জুনে তৃতীয় বার ডিপিপিতে সংশোধন আনা হয়। এতে সেতুর ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। মেয়াদ ধরা হয় ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত। পরে করোনা মহামারিতে কাজে ধীরগতির জন্য পদ্মা সেতুর মেয়াদ ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত বাড়িয়ে নেওয়া হয়। সেতুটি চালুর পরবর্তী এক বছর ধরা হয়েছে ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড (ডিএলপি) হিসেবে। এ সময়ে সেতুতে কোনো ত্রুটি ধরা পড়লে ঠিকাদার নিজ খরচে তা ঠিক করে দেবেন।

৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে। একে একে তৈরি হয় ৪২টি পিয়ার। ৩৭ ও ৩৮ নম্বর পিলারের ওপর প্রথম স্প্যান বসানো হয় ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর সর্বশেষ স্প্যান বসানোর মাধ্যমে পদ্মা সেতুর পুরো কাঠামো দৃশ্যমান হয়। ২০২১ সালের আগস্টে সম্পন্ন হয় সেতুর সড়কপথ তৈরির কাজ।

দ্বিতল পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে চলবে যানবাহন। নিচে স্প্যানের ভেতর দিয়ে চলবে ট্রেন। এজন্য ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত নির্মাণ করা হচ্ছে ১৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্রড গেজ রেলপথ। এতে খরচ হচ্ছে ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে মাওয়া হয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত তৈরি করা হয়েছে ৫৫ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়ে। ২০২০ সালের মার্চে উদ্বোধন করা হয় এক্সপ্রেসওয়েটি, যেটি তৈরিতে খরচ হয়েছে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। পদ্মা সেতু ও এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহারের জন্য যানবাহনগুলোকে আলাদাভাবে টোল দিতে হবে।

ইত্তেফাক/এএইচপি