মঙ্গলবার, ০৯ আগস্ট ২০২২, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বন্যাদুর্গত এলাকায় শিশুখাদ্যের সংকট রোগাক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা

আপডেট : ২৫ জুন ২০২২, ০৬:৩০

সিলেট-সুনামগঞ্জের বন্যাদুর্গত এলাকায় সরকারি- বেসরকারি ত্রাণ পৌঁছালেও শিশুখাদ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। বিশুদ্ধ পানি ও খাবার না পেয়ে অনেক শিশু রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ছে। গত তিন দিন বন্যাদুর্গত এলাকা ঘুরে মানুষের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। ছোট ছোট শিশুরা এখন আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বড়দের খাবার খাচ্ছে। এতে তাদের হজমের সমস্যা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, শিশুদের একটু একটু করে বড়দের খাবার দিতে হয়। একবারে খাবার পরিবর্তন করলে তাদের পেটের সমস্যা দেখা দেবে এটাই স্বাভাবিক। যেটা দেখা যাচ্ছে দুর্গত এলাকাগুলোতে।

সিলেট শহরের মীরাবাজারের কিশোরী মোহন (বালক) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুটি বিল্ডিংয়ে ১২০টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। সিলেট শহরের যতনপুর এলাকা থেকে এসে দুই সন্তান নিয়ে ঠাঁই নিয়েছে ৩৮ বছরের সুফিয়া বেগম। ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে এই নারী বললেন, আমার ছেলেটার বয়স ১১ মাস আর মেয়েটার আড়াই বছর। গত ৯ দিনে ওদের মুখে এক ফোঁটা দুধও দিতে পারিনি। আমরা যে খিচুড়ি খাচ্ছি, সেটাই ওদের খাওয়াচ্ছি। প্রথম দু-এক দিন তো খেতেই চাইনি, পরে খিদের জ্বালায় খেয়ে নিচ্ছে। এখন পর্যন্ত কেউ আমাদের শিশুদের খাবার দেয়নি।

শাহজালাল জায়েয়া ইসলামিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের আশ্রয়কেন্দ্রেও ঠাঁই হয়েছে প্রায় দেড় শ পরিবারের। এখানকার অধিকাংশ মানুষ এসেছেন যতনপুর থেকেই। ৪৬ বছরের আয়েশা খাতুন বললেন, ছেলের দুইটা বাচ্চা নিয়ে মহাসংকটে পড়েছেন তিনি। নিজেরা ভাত-খিচুড়ি যা খাচ্ছেন এক বছর বয়সি বাচ্চাকেও তাই খাওয়াতে হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কেউ বাচ্চাদের কোনো খাবার দেয়নি। হাতেও কোনো টাকা নেই, যে বাচ্চাদের জন্য কিছু কিনবেন। তিনি বলেন, এই আশ্রয়কেন্দ্রে অন্তত ৫০টি বাচ্চা আছে। তাদের সবারই খাওয়ার কষ্ট হচ্ছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি বাচ্চার পেট খারাপ হয়েছে।

দুর্গত এলাকা ঘুরে একই চিত্র দেখা গেছে। অধিকাংশ আশ্রয়কেন্দ্রে খাবার জোটে একবেলা-আধাবেলা। পানিসংকট তীব্র। বড়রা বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা রান্না করা খাবারের পাশাপাশি শুকনো খাবার খেয়ে বেঁচে থাকলেও শিশুসন্তানদের নিয়ে পড়েছেন বিপাকে। তাদের দুধ জোগাড় করতে পারছেন না। শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের আশ্রয়কেন্দ্রে পানি নেই। আশ্রয়কেন্দ্রের জুলেখা বেগম জানান, এখানে কোনো পানি নেই। কেন্দ্রে এসে কেউ গোসল করতে পারেনি। গোসল করতে না পেরে চুলকানি হয়ে গেছে। বাচ্চাদেরও গোসল করানো যাচ্ছে না। ফলে ওদের শরীরেও চুলকানি হয়ে যাচ্ছে। এই কেন্দ্রে আট মাস বয়সি ছেলে কামরান ও ২৩ মাস বয়সি এমরানকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন রাহেলা আক্তার। তিনি বলেন, বন্যার পানিতে তার সব ভেসে গেছে। দুই সন্তান নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। এখানে একবেলা রান্না করা খাবার দেওয়া হয়। সন্তান অল্প বুকের দুধ পেলেও এখন নিজের খাবার খেতে না পারায় সেটিও বন্ধ হয়ে গেছে। হাতে কোনো টাকাপয়সাও নেই। রান্না করা খাবার নিজে খান এবং শিশুসন্তানদের সেই খাবারই দেন। এক সপ্তাহ পর গত বুধবার একজন দুধ কিনে দিয়েছিল। সেটিই দুই সন্তানকে ভাগ করে দিয়েছেন।

সিলেটের সাহেবের বাজার হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজে আশ্রয় নিয়েছে শতাধিক বানভাসি। সেখানে আশ্রয়কেন্দ্রের নিচতলায় কথা হয় সাবিত্রী রানী বালোর সঙ্গে। তিনি বলেন, সিলেটের মোটরঘাট এলাকায় তাদের বাসা। স্বামী রক্তিম দাস আর তিনি খেয়ে না খেয়ে সংসারের ফার্নিচারসহ আসবাবপত্র বানিয়েছিলেন। বানের পানিতে এখন আর কিছুই নেই। আশ্রয়কেন্দ্রে আছেন প্রায় সাত দিন। দেড় বছর বয়সি মেয়েটাকে নিয়ে চরম সংকটে পড়েছেন। মেয়েটির মুখে কোনো খাবার তুলে দিতে পারছেন না। এখন পর্যন্ত কেউ তাদের মেয়েটার জন্য কোনো খাবার দেয়নি। বড়দের খাবার খাওয়ার কারণে মেয়েটার পেট খারাপ হয়েছে। একজন ডাক্তার এসেছিলেন, তিনি ওষুধ দিয়ে গেছেন। কিন্তু মেয়েটা কিছু খাচ্ছে না।

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কৃষকদের ১১ কোটি টাকার সহায়তা

২ জেলায় নতুন বই পাচ্ছে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত লক্ষাধিক শিক্ষার্থী

বন্যার পরও আমরা ভালো অবস্থানে আছি: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আপনাদের দেখতে এসেছি: সুনামগঞ্জে নিক্সন চৌধুরী

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

পুরো বর্ষাকাল জুড়ে বন্যা থাকতে পারে

বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৮২, একদিনে ৯ জনের মৃত্যু

৩ জেলায় আরও নগদ অর্থ, চাল ও শুকনো খাবার বরাদ্দ

বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭৩