নড়াইল সদরে ভারতের বিতর্কিত বিজেপি নেত্রী নূপুর শর্মাকে সমর্থন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার অভিযোগের ঘটনায় কলেজের অধ্যক্ষ ও অভিযুক্ত ছাত্রকে জুতার মালা গলায় পরিয়ে দেওয়ার ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। এ ঘটনায় দু’টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন নড়াইলের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান।
অভিযুক্ত ছাত্র রাহুল দেব সদরের মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। এ ঘটনায় ১৮ জুন (শনিবার) বিকেলে তাকে আটক করে নড়াইল সদর থানার পুলিশ। পরদিন তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করে জেলহাজতে পাঠানো হয়।
ওই ভিডিওতে দেখা গেছে, অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাস ও ছাত্র রাহুল দেবের গলায় জুতার মালা দিয়ে কলেজ থেকে বের করার সময় তার (অধ্যক্ষ) দু’পাশে কয়েকজন পুলিশ প্রহরায় ছিলেন। এদিকে এ ঘটনার পর সোমবার (২৭জুন) জেলা প্রশাসনের আয়োজনে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে নড়াইলের বিভিন্ন মসজিদ ও মাদরাসার ইমাম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খৃষ্টান ঐক্য পরিষদের নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও শ্রেণি-পেশার মানুষদের নিয়ে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন-পুলিশ সুপার প্রবীর কুমার রায়, নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. রবিউল ইসলাম, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুবাস চন্দ্র বোস, নড়াইল পৌরসভার মেয়র আনজুমান আরা, মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজের সভাপতি অ্যাডভোকেট অচীন চক্রবর্ত্তী, নড়াইলের শাহাবাদ কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মো. আনোয়ার হোসেন, হিন্দু বৌদ্ধ খৃস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি মলয় কুমার নন্দী প্রমুখ।
সভায় জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপার বলেন, ঘটনার দিন আমাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল সহিংসতা এড়িয়ে সবাইকে নিরাপদে বাঁচিয়ে আনা। আমরা পুলিশের সামনে অধ্যক্ষের গলায় মালা দেওয়ার বিষয়টি দেখিনি, এ সময় গেটের কাছে ছিলাম। ঘটনাটির প্রকৃত তদন্তের জন্য অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুবায়ের হোসেন চৌধুরীর নেতৃত্বে এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রিয়াজুল ইসলামের নেতৃত্বে পৃথক দু’টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তের পর সার্বিক বিষয়ে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তারা জানান। আগামী ৩০ জুনের মধ্যে তদন্ত কমিটির রিপোর্ট দেওয়া জন্য বলা হয়েছে।
সভায় আইন হাতে তুলে নিয়ে ৩ শিক্ষকের মোটরসাইকেল পোড়ানো এবং নিরপরাধ অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা পরানোর ব্যাপারে দোষীদের শাস্তির দাবি করা হয়। এদিকে কয়েকজন আলোচক সহিংসতা চলাকালীন সময়ে মির্জাপুর কলেজের শিক্ষক আক্তার হোসেন টিংকুর বিরুদ্ধে ছাত্র ও জনতাকে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে শ্লোগান ও উস্কে দেওয়ার অভিযোগ আনেন।
এদিকে সরেজমিনে সদরের সিঙ্গাশোলপুর ইউনিয়নের বড়কুলা গ্রামে ওই অধ্যক্ষের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, অধ্যক্ষ বাড়িতে নেই। বাড়িতে অধ্যক্ষের মা বনলতা বিশ্বাস এবং তার ন্সাতক পড়ুয়া বড় মেয়ে শ্যামা বিশ্বাস রয়েছেন।
শ্যামা বিশ্বাস বলেন, ‘বাবা নড়াইল শহরে এক আত্মীয়ের বাসায় আছেন।’ তিনি জানান, তার বাবা সম্পূর্ণ নির্দোষ। এরপর তিনি আর কিছু বলতে চাননি। এদিকে অভিযুক্ত ছাত্রের বাড়ি পার্শ্ববর্তী বিছালী ইউনিয়নের আড়পাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়-এ ঘটনার পর বাবা বাড়িতে নেই। তার মা ও অপর এক ভাই বাড়িতে রয়েছেন।
মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলেজের কয়েকজন শিক্ষক বলেন, ‘অধ্যক্ষ কোনো অন্যায় না করলেও তাকে এভাবে অপমান করায় তারা মুষড়ে পড়েছেন।’ কলেজের শিক্ষকদের মধ্যে গ্রুপিং এবং অধ্যক্ষের পদ দখলের অভিপ্রায়ের কারণে তাকে এই চরম অপমান সইতে হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তারা।
মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও শিক্ষক নেতা রওশন আলী বলেন, ‘যা ঘটেছে তা জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক ও হতাশাজনক। এ ঘটনায় শিক্ষক সমাজকে হেও করা হয়েছে। ঘটনার আরও ভালো সমাধান হতে পারতো।’
মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাস ঘটনার পর থেকে তার ব্যবহৃত ফোন বন্ধ রেখেছেন।
এদিকে মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক আক্তার হোসেন টিংকু তার বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘ঘটনা শুরুর আগে একটি ক্লাস নেই। পরে অপর ক্লাস নেওয়ার সময় অধ্যক্ষ আমাকে ডাকলে সেখানে যাই এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করি। এখানে অধ্যক্ষ হওয়ার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। যারা এসব কথা ছড়াচ্ছেন তারা জামায়াত-বিএনপির সমর্থক।’
মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ও সদর উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট অচিন কুমার চক্রবর্তী বলেন, ‘ঘটনার দিন আমি ঢাকায় ছিলাম। শুনেছি কলেজের অধ্যক্ষকে জুতোর মালা দেওয়া হয়েছে, যা অতি দুঃখজনক।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ ঘটনার পর কলেজ বন্ধ রয়েছে। প্রশাসনের নির্দেশে পরিস্থিতি বিবেচনায় ঈদের পর কলেজ খুলবে।’
উল্লেখ্য, মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র রাহুল দেব রায় নিজের ফেসবুক আইডিতে নূপুর শর্মার ছবি দিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয় বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় গত ১৮ জুন রাহুল কলেজে আসার পর তার সহপাঠীরা বিষয়টি কলেজ অধ্যক্ষকে জানালে তিনি উপস্থিত শিক্ষকদের পরামর্শক্রমে রাহুলকে স্থানীয় বিছালী পুলিশ ফাঁড়ির পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এরইমধ্যে শিক্ষার্থীসহ স্থানীয়রা বিক্ষুব্ধ হয়ে ক্যাম্পাসে শিক্ষকদের ৩টি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে ফেলে। একপর্যায়ে পুলিশের লাঠিচার্জ ও এলাকাবাসীর ইটপাটকেল নিক্ষেপে কলেজ শিক্ষক, পুলিশসহ ১২জন আহত হন। এ ঘটনার পরে নড়াইলের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান ও পুলিশ সুপার প্রবীর কুমার রায়সহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং এ সময় অভিযুক্ত রাহুল দেব রায় ও অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে পুলিশ উদ্ধার করে সদর থানায় নিয়ে আসে। পরদিন রাহুলের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করে তাকে জেলহাজতে পাঠানো হয়।
