ইন্দুরকানী আশ্রয়ণ প্রকল্প : বদলে গেছে পাঁচ শতাধিক প্রান্তিক মানুষের জীবন

আপডেট : ২৮ জুন ২০২২, ০৩:৩০

নিজের ঘরের পাশে নিজের চায়ের দোকানে কাজ করেন রুমা বেগম। যা আয় হয় তা দিয়ে দুই সন্তান নিয়ে ভালোই আছেন বিধবা রুমা। রুমার মতোই বদলে গেছে ইকবাল সেপাইর জীবনও। আগে নদীতে বালু তোলা শ্রমিকের কাজ করতেন। এখন নিজেই একজন বালু ব্যবসায়ী। জীবন বদলে যাওয়া এই মানুষের বসবাস ইন্দুরকানী আশ্রয়ণ প্রকল্পে। ইন্দুরকানী আশ্রয়ণ প্রকল্পে রুমা-ইকবালের মতো ৫৪৪টি পরিবারকে মুজিববর্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে জমিসহ টেকসই ঘর।

আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর পাওয়ার পর জীবন বদলে যাওয়ার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে রুমা বেগম বলেন, ‘মোর স্বামী মইরা যাওয়ার পরে কেউ মোরে জিগায় নাই। মাইয়া পোলা লইয়া কোতায় যামু কোনো দিশা পাইতে ছেলাম না। প্রধানমন্ত্রী মোরে দুই শতাংশ জমিসহ একখান ঘর দেছেন। এহোন পোলা মাইয়া লইয়া আর থাকতে-খাইতে কষ্ট নাই।’

ইকবাল সেপাই বলেন, ‘আমি দুই বছর আগে সরকারি ঘর বরাদ্দ পাই। তখন আমার ঘর-জমি কিছুই ছিল না। বাবার দানে পাওয়া জমিতে সরকার থেকে বরাদ্দকৃত ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। রাতদিন পরিশ্রম করে আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন হওয়ায় এখন আমি সচ্ছল। বালু ব্যবসাসহ মাটি কাটার কাজ ঠিকাদারি নিয়ে ভালো আয় করছি। কিস্তিতে একটি এসিও কিনেছি।’

নিজের ঘরের পাশে নিজের চায়ের দোকানে কাজ করছেন আশ্রয়ন প্রকল্পে বসবাসকারী রুমা বেগম। ছবি : ইত্তেফাক

একইভাবে ইন্দুরকানীতে ঘূর্ণিঝড় সিডরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা চণ্ডিপুর ইউনিয়নের কলারন গ্রামে খাসজমিতে ৬৩টি পরিবারকে আশ্রয়ণের ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে একটি ঘরে বাস করেন রাশিদা বেগম। তিনি এই ঘরে থেকেই দর্জির কাজ করেন। তিনি একটি সেলাই মেশিন চালিয়ে জামাকাপড় তৈরি করেন, যা আয় হয় তা দিয়ে সংসারের ব্যয়ের একটি বড় অংশের জোগান দিচ্ছেন। তার স্বামী দিনমজুরের কাজ করেন। অথচ একটি সময় তাদের মাথা গোঁজার কোনো ঠাঁই ছিল না।

মোতালেব জোমাদ্দারের বয়স এখন ৬৫ বছর। জন্ম থেকে পঙ্গু মোতালেব। স্ত্রী সালেহা বেগমও গোদ রোগে আক্রান্ত। মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে তাদের জীবনে আসে ঘূর্ণিঝড় সিডর। সিডরে সব হারিয়ে নিঃস্ব হন তারা। দীর্ঘ কয়েক বছরের কষ্টের জীবনের পর শেষ বয়সে এসে মোতালেব ও স্ত্রী পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া আশ্রয়ণের ঘর পেয়ে এখন তাদের পরিবারে আনন্দের কোনো শেষ নেই। একটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে একটি চায়ের দোকানও দিয়েছেন।

এছাড়া তারা দুটি গাভি পালন করেন। প্রধানমন্ত্রীকে দোয়া করে মোতালেব বলেন, ‘আগে ধাবার (ঝড় বাতাস) ছোডলে (ছুটলে) কোতায় যামু ম্যালা ভয়তে থাকতাম। এহোন যে ঘর পাইছি এ ঘরে মরলেও শান্িত। আল্লায় শেখ হাসিনারে বাঁচাইয়া রাখুক।’

পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আশ্রয়ন প্রকল্প-২ এর সাবেক উপ-প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ জাহেদুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বদান্যতায় অসহায় দরিদ্র মানুষ মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছে। ঘর পেয়ে অতিদরিদ্র মানুষ পেয়েছে সম্মান, নতুন পরিচয়, নতুন ঠিকানা। প্রধানমন্ত্রীর এই মহান উদ্যোগ বিশ্বে বিরল। এই জন্য প্রধানমন্ত্রীকে মানুষ দোয়া করে। বাসস্থান পেয়ে আশ্রয়হীন মানুষের জীবনমানের যে পরিবর্তন ঘটছে তা অত্যন্ত তৃপ্তিদায়ক।

ইন্দুরকানী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোসাম্মৎ লুত্ফুন্নেছা বলেন, ইন্দুরকানীতে রুমা, রাশিদা, মোতালেব, ইকবালদের মতো ৫৪৪টি পরিবারকে আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় জমিসহ ঘর দেওয়ায় মাত্র দুই বছরে তাদের জীবনমানের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। প্রত্যেকের ঘরে এখন বিদ্যুৎ সংযোগ। সুপেয় পানির জন্য প্রকল্পে পর্যাপ্ত গভীর নলকূপের ব্যবস্থা রয়েছে। এর বাইরে প্রতিটা ঘরে ৩ হাজার লিটার পানি সংরক্ষণের ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে। অনেকে সিলিন্ডার গ্যাসও করেন। আশ্রয়ণের বাসিন্দাদের নানা ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনা হয়েছে।

ইত্তেফাক/ইআ