শুক্রবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২২, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউনসেলর নিয়োগ জরুরি

আপডেট : ২৯ জুন ২০২২, ০৯:৩১

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটি, ড্রাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কয়েক জন শিক্ষার্থী প্রায় ধারাবাহিকভাবে আত্মহত্যা করেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কেন আত্মহত্যা করছেন?

গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, করোনা মহামারিকালে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার ১০১টি ঘটনা ঘটে। আর বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে (৬১ দশমিক ৩৯ শতাংশ)। অন্যদিকে মেডিক্যাল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে আত্মহত্যার হার ১১ দশমিক ৮৮শতাংশ এবং প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে এই হার ৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ। আর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার হার ছিল ২২ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

বিভিন্ন কারণে আগের তুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই অবস্থা বেড়েছে বলেই মনে হয়। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতাসহ আত্মহত্যা চেষ্টার প্রবণতা দিনে দিনে বেড়ে চললেও দেশের বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই নেই কোনো পেশাদার পরামর্শক বা কাউনসেলর। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হতাশা ও মানসিক অশান্িত থেকে উত্তরণের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পেশাদার পরামর্শদাতা বা কাউনসেলর নিয়োগ করা হলে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার চেষ্টা চালানো কিংবা আত্মহত্যা করার প্রবণতাসহ তাদের মানসিক অস্হিরতা ও হতাশা অনেকটাই কমে আসবে।

এ কথা সত্য, একজন শিক্ষার্থীকে স্কুল-কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আসতে তার অভিভাবকসহ অনেক ত্যাগ ও সংগ্রাম করতে হয় এবং পাড়ি দিতে হয় অনেক দুর্গম ও বন্ধুর পথ। অনেক আশা-ভরসা নিয়ে মা-বাবা তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়তে পাঠান। পাশাপাশি দেশ-জাতিও তাদের কাছ থেকে ভালো অনেক কিছু প্রত্যাশা করে। মানুষের জীবনেই সমস্যা আসে এবং নানা ধরনের সমস্যা আসবেই। আর এটিই স্বাভাবিক। তার মানে এই নয় যে, জীবনে সমস্যা এলে বা সমস্যায় পড়লে আত্মহত্যা করে জীবনকে শেষ করে দিতে হবে বা আত্মহত্যার চেষ্টা চালাতে হবে। বরং জীবনে কোনো ধরনের সমস্যা এলে বা সমস্যায় পড়লে শিক্ষার্থীসহ সবাইকে আবেগনির্ভর না হয়ে সুস্হ মস্তিষ্কে বাস্তবতার আলোকে সেই সমস্যার সমাধান করা উচিত অথবা সেই সমস্যা যে কোনোভাবে প্রতিহত করা উচিত। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা পেশাদার কোনো কাউনসেলরেরও শরণাপন্ন হওয়া যেতে পারে।

আত্মহত্যা হচ্ছে মানবজীবনের এক চরম অসহায়ত্ব। ক্ষণিক আবেগে একটি মহামূল্যবান জীবনের চির অবসান ঘটানো, যা কোনো কিছুর বিনিময়েই এবং কোনোভাবেই ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। আর আত্মহত্যার মাধ্যমে নিজের মূল্যবান জীবনকে যেমন একদিকে শেষ করে দেওয়া হয়, অন্যদিকে একটি সম্ভাবনারও চির অবসান ঘটে। মানবসভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অতি প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন দেশে ‘আত্মহত্যা’ নামক এই মহাপাপ সংঘটিত হয়ে আসছে। আর এটিকে কোনো দেশেই কিংবা কোনো সমাজেই ভালো চোখে দেখা হয়নি এবং ভবিষ্যতেও দেখবে না।

কোনো ব্যক্তির আত্মহত্যা করার পেছনে যেসব কারণ নিহিত থাকে, তার মধ্যে রয়েছে বিষণ²তা বা উবঢ়ত্বংংরড়হ, আর্থিক, সামাজিক, পারিবারিক সমস্যা কিংবা নিতান্ত ব্যক্তিগত মনোকষ্ট, বাইপোলার ডিজঅর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া (দীর্ঘদিন ধরে ব্যর্থতা, গ্লানি বা হতাশা এবং নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাসের অভাব, অনাগত ভবিষ্যত্ সম্পর্কে উদ্বেগ, নিঃসঙ্গতা, কর্মব্যস্ততাহীন দিন যাপন ইত্যাদি মানবমস্তিষ্ককে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত করে), পার্সোন্যালিটি ডিজঅর্ডার, অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার, অ্যালকোহল ব্যবহারজনিত ডিজঅর্ডার ইত্যাদি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডঐঙ) পরিসংখ্যানমতে, বর্তমান বিশ্বে প্রায় ১২১ মিলিয়ন মানুষ মাত্রাতিরিক্ত বিষণ²তার শিকার। (ডঐঙ)-এর বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, ২০২৩ সালের মধ্যে হূদ্রোগের পরেই বিষণ²তা মানবসমাজের বিপন্নতার দ্বিতীয় কারণ হিসেবে প্রতীয়মান হবে। তাদের জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে প্রতি ১ লাখ মানুষের মধ্যে বার্ষিক আত্মহত্যার হার ১১ দশমিক ৪ শতাংশ।

পরিসংখ্যানমতে, আত্মহত্যার ক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা অনেকাংশে এগিয়ে রয়েছে। আর এসংক্রান্ত খবরাখবর প্রায় সময়ই পত্রপত্রিকায় দেখা যায়। তবে আশ্চর্যের বিষয়, দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা ও আত্মহত্যা চেষ্টার প্রবণতা দিনে দিনে বেড়ে চললেও এবং তাদের অনেকেই মানসিক অশান্িত ও অস্হিরতায় ভুগলেও এখন পর্যন্ত দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই নেই কোনো পেশাদার পরামর্শক বা কাউনসেলর। বলা বাহুল্য, আত্মহত্যাজনিত মৃতু্যর বেশির ভাগই প্রতিরোধযোগ্য।

পাশাপাশি আত্মহত্যা প্রতিরোধে কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলো প্রটেকটিভ ফ্যাক্টর বা রক্ষাকারী বিষয় বলা হয়। যেমন: জীবনের খারাপ সময়গুলোতে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা জন্মানো, নিজের প্রতি শ্রদ্ধা ও আত্মবিশ্বাস জন্মানো, সমস্যা সমাধানে কার্যকর দক্ষতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনে অন্যের কাছ থেকে ইতিবাচক সহায়তা লাভের চেষ্টা করা ইত্যাদি। এসব ফ্যাক্টরকে আত্মহত্যার ক্ষেত্রে রক্ষাকারী বা প্রতিরোধী বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়। তাছাড়া সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিনীতি, অনুশাসন, ভালো বন্ধু, প্রতিবেশী ও সহকর্মীর সঙ্গে সামাজিক সুসম্পর্ক প্রভৃতি আত্মহত্যার প্রবণতা হ্রাসে সহায়তা করে। তা ছাড়া সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত নিদ্রা, নিয়মিত শরীরচর্চা, মাদকাসক্তি থেকে দূরে থাকা তথা স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং শারীরিক ও মানসিক যেকোনো অসুস্হতায় যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা লাভের সুযোগ আত্মহত্যার প্রবণতা কমায়।

সুতরাং, শিক্ষার্থীদের হতাশা ও মানসিক অশান্িত থেকে উত্তরণের জন্য এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দ্রুত পেশাদার কাউন্সেলর নিয়োগ করা প্রয়োজন। আর তা সম্ভব হলেই শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার চেষ্টা চালানো কিংবা আত্মহত্যা করার প্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা যায়। সর্বোপরি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে আত্মহত্যার বিভিন্ন নেতিবাচক দিক তুলে ধরে নিয়মিতভাবে তার প্রচার-প্রচারণারও ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সর্বোপরি শিক্ষার্থীসহ সবাইকে জীবনের গুরুত্ব ও মূল্য সম্পর্কে বুঝতে হবে। তাদের বুঝতে হবে, জীবন একটিই এবং তা মহামূল্যবান। জীবন একবার হারালে আর কোনো কিছুর বিনিময়েই ফিরে পাওয়া সম্ভব নয় এবং আত্মহত্যা কোনো সমাধান হতে পারে না। সবার স্মরণে রাখা প্রয়োজন, জীবনকে যদি সুন্দরভাবে সাজানো যায়, তাহলে একে সুন্দরভাবে উপভোগও করা যায়। তাই সবার উচিত হবে আত্মহত্যার পথ পরিহার করে জীবনকে ভালোবাসতে শেখা, জীবনটাকে সুন্দরভাবে সাজাতে শেখা।

লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, আইন বিভাগ, ড্রাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন