মঙ্গলবার, ০৯ আগস্ট ২০২২, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সুনামগঞ্জে বন্যার্তদের পাশে 'মনুষ্যত্ব ফাউন্ডেশন'

আপডেট : ২৯ জুন ২০২২, ১৫:২৬

পাহাড়ি ঢল ও বিরামহীন বৃষ্টিপাতে টানা দুই দফা বন্যায় বিপর্যস্ত সিলেট ও সুনামগঞ্জ অঞ্চল। ডুবে গেছে সিলেট ও সুনামগঞ্জের প্রায় নব্বুইভাগ এলাকা। অনেকে বলছেন, ১৯৮৮ ও ২০০৪ এর বন্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে এবারের বন্যার ভয়াবহতা। পানিবন্দি হয়ে অসহায় সময় পার করছেন লাখ লাখ মানুষ, অনেকের ঘরেই খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। বন্যার প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখনো পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি ঘটেনি। এই অবস্থায় শুরু থেকেই বন্যাদুর্গতদের পাশে দাঁড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে সামাজিক সংগঠন মনুষ্যত্ব ফাউন্ডেশন। কখনো শুকনা খাবার বিতরণ, কখনো রান্না করা খাবার পৌঁছে দেওয়া, কখনো বিশুদ্ধ পানি বা বাজারের ব্যাগ হাতে মানুষের বাড়ি বাড়ি ছুটে যাচ্ছেন তারা। কাজ করছেন শহরের বাইরের দুর্গম এলাকাগুলোতেও।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মনুষ্যত্ব ফাউন্ডেশনের এমন কার্যক্রমের কথা জানতে পেরে এর পাশে দাঁড়িয়েছে দৈনিক ইত্তেফাক। ইত্তেফাকের পক্ষ থেকে মনুষ্যত্ব ফাউন্ডেশনের কাছে বন্যার্তদের জন্য আর্থিক সহায়তা পাঠিয়েছেন ইত্তেফাক সম্পাদক তাসমিমা হোসেন। জবাবে ধন্যবাদ জানিয়ে মনুষ্যত্ব ফাউন্ডেশনের অন্যতম সমন্বয়কারী আল মাহমুদ রাহী এক চিঠিতে লিখেন, পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টির কারণে গত ১৫ জুন, বুধবার থেকেই ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ে সুনামগঞ্জের মানুষ। অসংখ্য মানুষ এখনো পানিবন্দি। বন্যাদুর্গতদের পাশে দাঁড়াতে প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ খাদ্যসামগ্রী ও উদ্ধার তৎপরতা। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন মনুষ্যত্ব ফাউন্ডেশন নিজেদের সাধ্যমতো এ কাজে অংশগ্রহণের চেষ্টা করছে। আমরা শুকনো খাবারের পাশাপাশি রান্না করা খাবারও বিতরণ করছি।  আমাদের এই কার্যক্রমে দৈনিক ইত্তেফাক থেকে পাঠানো আর্থিক সহায়তার জন্য ধন্যবাদ। আপনারা দুর্গত এলাকা নিয়ে নিয়মিত সংবাদ পরিবেশন করছেন, এবং আমাদের পাশে আছেন; তাই অর্থ-সহায়তার চাইতে মানসিক শক্তিটিই আমাদের জন্য বড়। আমাদের সদস্যরা এতে অনুপ্রাণিত বোধ করছে। এজন্য আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

কোমড়সমান পানি মাড়িয়ে বন্যার্তদের জন্য খাবারর ব্যাগ পৌঁছে দিচ্ছেন মনুষ্যত্ব ফাউন্ডেশনের এক সদস্য

২০২০ সালের মার্চে যখন করোনা মহামারী ক্রমশ খারাপ দিকে যাচ্ছিলো, সেসময়টায় যাত্রা শুরু করে মনুষ্যত্ব ফাউন্ডেশন। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার লকডাউনের পদক্ষেপ নেয়। এতে দুর্ভোগে পড়েন নিম্নআয়ের বহু মানুষ। খাবারের সংকট দেখা দেয়। মনুষ্যত্ব ফাউন্ডেশন তাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করে এগিয়ে আসে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি দল গঠন করে কাজে নেমে পড়েন একদল স্বেচ্ছাসেবী তরুণ। তাদের মধ্যে ছিলেন আফসার পাপ্পু, রনি, জাহেদ, পরাগ, মহসিন, সালাম, মরম আলী, জীবন, আম্মার, মান্না, রাহী সহ আরও অনেকে। প্রাথমিকভাবে নিজেদের সংগ্রহ করা টাকা থেকেই তারা খাবার বিতরণে নামেন। এসময় তারা শুনতে পান, একজন সবজি ব্যবসায়ী তার আড়তের সবজি বিক্রি করতে পারছেন না। লকডাউনে সব সবজি নষ্ট হচ্ছে। মনুষ্যত্বের সদস্যরা ট্রাক ভরে সব সবজি কিনে নেন। পরে খাবার বিতরণের সময় তা কাজে লাগান। মূলত এটিই ছিল তাদের প্রথম সাংগঠনিক কাজ।

এরপর একটা হটলাইন নাম্বার চালু করা হয়, যেখানে কারোর ঘরে খাবার না থাকলে ফোন পেলে তারা ছুটে যেতেন খাবারের ব্যাগ নিয়ে। বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হতো খাবার। রমজান মাসেও তা ইফতার ও সেহেরি বিতরণের মাধ্যমে চালু থাকে। এসব কাজের ফাঁকেই রান্নাবান্না করার জন্য একটা আলাদা দল তৈরি হয়ে যায়। ঈদকে সামনে রেখে দুঃস্থদের জন্য কিছু করারও প্রস্তুতি নিতে থাকেন তারা। শুরু করেন ঈদ উপহার কার্যক্রম, যার মাধ্যমে অন্তত ৩০০-৪০০ দুঃস্থ পরিবারকে ঈদবস্ত্র দেওয়া হয়।

বন্যার্তদের জন্য রান্না করা খাবার নিয়ে যাওয়া হচ্ছে

২০২০ সালের বন্যায়ও মানুষের পাশে ছিল মনুষ্যত্ব ফাউন্ডেশন। ৬ হাজার পরিবারকে রান্না করা খাবার ও ২২ হাজার পরিবারকে শুকনা খাবার দিয়েছেন সংগঠনটির স্বেচ্ছাসেবীরা। এরই মাঝে শুরু হয় রক্তদান কর্মসূচি। এজন্যও বিশেষভাবে চালু করা হয় আরও একটি হটলাইন নাম্বার। সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাসপাতালের দেয়ালে ওই নাম্বারটি সেটে দেওয়া হয়। রক্তদানের অনুরোধে ফোনকল এলেই তারা ছুটে যান। এভাবে অন্তত শতাধিক রক্তদাতা তৈরি হয়েছেন, যারা প্রায় সবসময়ই প্রস্তুত থাকেন বলা চলে। এসব নানা কার্যক্রমের মাধ্যমেই মনুষ্যত্বের পথচলা সামনে এগোতে থাকে। আয়োজন করা হয় বিভিন্ন মেডিক্যাল ক্যাম্প। এমনকি করোনার সময়টায় বিনামূল্যে দাফন-কাফনের কাজও করেছেন তারা।

করোনার ধাক্কা সামলে নেওয়ার জন্য অনেকেকে সহায়তা করেছে মনুষ্যত্ব ফাউন্ডেশন। ঠেলাগাড়ি, সেলাই মেশিন, রিকশা সহ নানা জিনিস কিনে দিয়েছেন। এককালীন অনুদান দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ঘুরে দাঁড়াতে সহযোগিতা করা হয়েছে। এরই মাঝে আরেকটি ব্যতিক্রম কাজ করে আলোচনায় আসে মনুষ্যত্ব। ইসরাইলের লাগাতার হামলায় বিপর্যস্ত ফিলিস্তিনিদের জন্যও সহায়তা পাঠানোর ব্যবস্থা করেন তারা। জর্ডান ও অন্যান্য দেশে বসবাস করা ফিলিস্তিনের তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ১৪ ট্রাক খাবার সেখানে পাঠানো হয়। এই পুরো খরচ বহন করেছেন মনুষ্যত্বের সদস্যরা।

এবারের বন্যা পরিস্থিতি এতোটা ভয়াবহ হতে পারে বলে ধারণা ছিল না মনুষ্যত্বের সদস্যদের। তবে আবহাওয়া পূর্বাভাস ও নদীর পানি ক্রমেই বাড়তে থাকায় তারা উদ্ধারকাজে নামার আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। শহরে পানি ওঠার আগেই আশপাশের বিভিন্ন নিচু এলাকায় তারা খাবার বিতরণ ও শুকনা খাবার পৌঁছে দেওয়া শুরু করেন। ইতোমধ্যেই কয়েক হাজার মানুষের বাড়িতে শুকনা ও রান্না করা খাবার পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। যাদের রান্নাঘরে বন্যার পানি ওঠেছে, তারাও মনুষ্যত্বের রান্নাঘর ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছেন।

এই মুহূর্তে ৪টি প্রকল্প পরিচালনা করছে সংগঠনটি। মধ্যবিত্ত অনেকেই লোকলজ্জার কারণে অন্যদের কাছে সহায়তা চাইতে হীনমন্যতায় ভোগেন, তাদের জন্য খোলা হয়েছে দোকান। মধ্যবিত্তের দোকান নামের এই দোকানে প্রতীকি মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বিক্রি করা হচ্ছে। পানিবন্দি থাকা মানুষের ঘরে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বাজার সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী। দুঃস্থ পরিবারগুলো পাচ্ছে শুকনা খাবার। ছোট ছোট কিছু সংগঠনকেও সাহায্য করে ভালো কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।

বন্যাকবলিত এলাকায় নৌকায় করে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করছে মনুষ্যত্ব ফাউন্ডেশন

মনুষ্যত্ব ফাউন্ডেশনের সমন্বয়কারী আল মাহমুদ রাহী জানান, যখনই কোনো দুর্যোগ দেখা দেয় তখনই ঝাঁপিয়ে পড়েন মনুষ্যত্বের সদস্যরা। এর বাইরেও সমাজসেবামূলক নিয়মিত নানা কার্যক্রম রয়েছে। যেমন সুনামগঞ্জের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার খরচ যোগানোরও চেষ্টা চলছে। বেতন, বইখাতা ও অন্যান্য শিক্ষাউপকরণ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে তাদের। বর্তমানে মনুষ্যত্বের সদস্য সংখ্যা ৫০ এর বেশি। তারা সাধারণত এমন এলাকাগুলোতে পৌঁছাতে চেষ্টা করেন, যেখানে অন্যরা যাওয়ার সুযোগ পায়না। বিশেষ করে দুর্গম এলাকাগুলোতে যাওয়ার চেষ্টা করেন। প্রবাসীরাও এসব কার্যক্রমে অর্থ দিয়ে সহায়তা করেন। ভবিষ্যতে মনুষ্যত্ব ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমকে সুনামগঞ্জ ও সিলেট অঞ্চলের বাইরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রসারিত করতে চান তারা।

ইত্তেফাক/এসটিএম